যুগে যুগে বর্ণপ্রথার উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ


॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

সকল সমাজ ব্যবস্থাতে নির্দিষ্ট কিছু চলকযেমন সম্পত্তি, ক্ষমতা, মর্যাদা, প্রতিপত্তি ইত্যাদির ভিত্তিতে সমাজবাসীর ক্রমোচ্চ বিভাজনকে সামাজিক  স্তরবিন্যাস বলা হয়। এরূপ বিভাজন ছাড়া কোনো মানব সমাজ ছিল না বা ভবিষ্যতেও থাকবে না। তাই সমাজবিজ্ঞানী সরোকিন যথার্থই বলেছেন, “সদস্যদের প্রকৃত সমতাসম্পন্ন ও স্তরবিন্যাসহীন সমাজ একটি অতিকথন মাত্র, যা মানব জাতির ইতিহাসে কখনই ছিল না বা বাস্তবায়িত হবে না” (উদ্ধৃত, সেন, ১৯৮৫:১)। সামাজিক স্তরবিন্যাস সমাজবিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রত্যয়। সমাজে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান, কর্মকা-, পালিত ভূমিকা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে উচুঁ-নিচু স্তর বিভাজন সৃষ্টি করে। প্রতিটি সমাজেই বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দর্শন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে সমাজ কাঠামো গড়ে ওঠে। আর এই সমাজ কাঠামোকে ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থাও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।

   
সমাজ জীবনের আদি পর্যায়ে যখন মানুষ যূথ (ঐড়ৎফব) জীবনযাপন করত তখনও অতি স্থূল ধরনের স্তরবিন্যাস দেখা যেত। তবে তা সমাজ জীবনকে মৌলিকভাবে প্রভাবিত করত না। সেসব সমাজে সামাজিক সম্পর্ক ছিল সহজ-সরল প্রকৃতির। সেখানে লিঙ্গ, (নারী-পুরুষ), বয়স (বৃদ্ধ, যুবা, কিশোর) ভেদে শ্রমবিভাজন করা হত। সেখানে ব্যক্তিগত রূপ, গুণ, শক্তি, সামর্থ্য, সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা ইত্যাদির ভিত্তিতে স্থুলভাবে কিছু ভেদাভেদ করা হলেও তা সমাজকে মৌলিকভাবে প্রভাবিত করে উচুঁ-নিচু ভেদাভেদের ধারণা সৃষ্টি করেছে তা নয় (করিম, ১৯৯৭)। যূথ জীবন থেকে মাতৃপ্রধান কৌম  বিকাশ হলেও সেখানে পতির ধারণা সুস্পষ্ট নয়। মাতৃতন্ত্রে স্ত্রীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত এবং মেয়েদের থেকে দলপতি নির্বাচন শুরু হয়Ñযা সমাজে স্তরবিন্যাসের সূচনা করলেও আধিপত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তা ছিল মূলত সহযোগিতামূলক।


আদিম সমাজের তুলনায় আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক সম্পর্ক অধিকতর জটিল এবং স্তরবিন্যাস ব্যবস্থাও অধিকতর জটিল। আধুনিক সমাজ মূলত প্রতিযোগিতা এবং মুদ্রা অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সহযোগিতার মনোভাব অত্যন্ত মেকি। এ সমাজে যার অর্থ আছে তার সবই আছে, যার তা নাই তার কিছুই নাই। এভাবেই ক্রম বিবর্তনের ধারায় সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক সম্পর্ক যেমন সহজ-সরল অবস্থা থেকে জটিল হয়েছে, তেমনি সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থাতেও উচুঁ-নিচু ভেদাভেদ প্রকট রূপ লাভ করেছে। মূলত শ্রেণির আবির্ভাবের পর সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রকটতর হয়েছে।
প্রত্যেক সমাজে সম্পত্তি, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এবং মর্যাদা বা সম্মান তিনটি পরম আকাঙ্খিত সামগ্রী হিসেবে পরিগণিত হয়, যার সরবরাহ সীমিত কিন্তু সকলের কাছে বহুলভাবে প্রত্যাশিত ( ১৯৯৪)। অতীত বা বর্তমান সব সমাজেই সমাজবাসী এ তিনটি পরম আকাঙ্খিত সামগ্রী অসম মাত্রায় ভোগ করে। ফলত সমাজের সামাজিক অবস্থানগুলির ক্রমোচ্চ বিভাজন ঘটে সম্পত্তি, ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তির মাত্রানুপাত। সামাজিক অবস্থানগুলির এরূপ ক্রমোচ্চ বিভাজন সমাজে সামাজিক অসমতার সৃষ্টি করে এবং এ অসমতা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে তখন তা সামাজিক স্তরবিন্যাস হিসেবে স্বীকৃত হয়। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানীগণ সামাজিক স্তরবিন্যাসকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। ভিন্ন ভিন্ন এক বা একাধিক চলকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক স্তরবিন্যাসকে বিশ্লেষণ করার প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ সামাজিক স্তরবিন্যাসের একক কোনো সংজ্ঞার পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞার উপস্থিতি লক্ষণীয়। কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানী প্রদত্ত সংজ্ঞার আলোকে স্তরবিন্যাসকে বোঝানোর চেষ্টা করা হল।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (গধী ডবনবৎ) উপর্যুক্ত তিনটি কাঙ্খিত সামগ্রীর প্রাপ্যতা বা বণ্টন ব্যবস্থার অসমতাকে দিয়ে সামাজিক স্তরবিন্যাসকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে ''

''Social stratification is the division of man in society according to their property power and prestige''.


সমাজবিজ্ঞানী পিতিরিম সরোকিন (১৯২৮) প্রদত্ত সংজ্ঞা হল, '''Social stratification is a differentiation of a given population into hierarchically superimposed classes''''. অর্থাৎ সরোকিন তাঁর সংজ্ঞায় সমাজবাসীর মধ্যে ক্রমোচ্চ পার্থক্যকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ডেভিড ড্রেসলার তাঁর সংজ্ঞায় বলেন, ''''Social stratification is a system for ranking individuals in different levels, or strata, of prestige or status'' (Dresslar, 1969:377)|''। ড্রেসলার সামাজিক  স্তরবিন্যাসের সংজ্ঞায় সমাজে ব্যক্তির সম্মান মর্যাদাভিত্তিক বিভিন্ন স্তরকে বুঝিয়েছেন।


সমাজবিজ্ঞানী এইচ ররেন্স রসের (১৯৬৮) মতে সামাজিক স্তরবিন্যাস হল, '', ''Stratification refers to the differential ranking of status whereby some are considered higher and some are lowers.'' (Raurence Ross, 1968:393.'' (জধঁৎবহপব জড়ংং, ১৯৬৮:৩৯৩)
সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড (১৯৬৯) কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যে সংজ্ঞাটি দিয়েছেন তা হল, '' ১৯৬৯)।
অহঃযড়হু এরফফবহং সামাজিক স্তরবিন্যাস সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন, '

''Social stratification is a social pattern based on the ranking of the individuals and social positions in terms of the distribution of the desirable things, both material and emotional, which society has to offer'' (David Ropenoe, 1969)|

Anthony Giddens, ২০০১:৩০৪)
সামাজিক অসমতার প্রাতিষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে সামাজিক স্তরবিন্যাস। সমাজবিজ্ঞানী স্মেলসার বলেন, ''

''Social stratification refers to the division of society into layers or strata. When we talk of social stratification, we draw attention to the unequal positions occupied by individuals in society'' (Giddens, 2001:304)

'' (ঝসবষংবৎ, ১৯৮১:১৯৪)
উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে বলা যায় যে সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থা প্রতিটি সমাজেই সমাজবাসীকে কতিপয় ক্রমোচ্চ স্তর পর্যায়ে বিভক্ত করেছে যেখানে সমাজবাসী অসম মাত্রায় সমাজ-প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা, মর্যাদা ইত্যাদি ভোগ করে। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় দর্শন ও নীতি আদর্শকে ভিত্তি করে এ স্তরবিন্যাস এবং তৎসংশ্লিষ্ট অসম মাত্রার সামাজিক বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এ ব্যবস্থায় কিছু ব্যক্তি তাদের সামাজিক অবস্থানগত কারণে সুযোগ-সুবিধা অধিক মাত্রায় ভোগ করে এবং কিছু ব্যক্তি বঞ্চিত হয়। এ ব্যবস্থা নানাভাবে সমাজবাসীর জীবনকে প্রভাবিত করে।
সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল ঃ প্রাচীন (অহপরবহঃ) : সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রাচীনকাল থেকে সমাজে প্রচলিত আছে। ঐতিহাসিক এবং প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনাবলি থেকে প্রমাণিত হয় যে অতি প্রাচীন সমাজে বয়স এবং লিঙ্গভেদে সামাজিক স্তরবিন্যাসের উপাদান বিবেচিত হয়। এরূপ ব্যবস্থায় নারী, শিশু এবং দুর্বলরা ছিল নিম্ন মর্যাদাভুক্ত। হাজার হাজার বছর আগে ব্যাবিলন, পারস্য, গ্রিক ইত্যাদি সাম্রাজ্যে ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-অধীনস্থ, মুক্ত মানুষ-দাস এরূপ ক্রমোচ্চ স্তরবিভাগকে স্বাভাবিক মনে করা হত। এমনকি ২০০০ বছর আগেও চায়না, ভারত এবং আফ্রিকায় এরূপ ব্যবস্থাকে সমাজজীবনের অলঙ্ঘনীয় সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে মনে করা হত। প্রাচীন ইউরোপ এবং আমেরিকাতেও এরূপ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এরূপ ব্যবস্থায় সমাজের পরম কাঙ্খিত সামগ্রীগুলি স্বল্প সংখ্যক উচুঁ স্তরের ব্যক্তি ভোগের জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখত এবং অবশিষ্ট বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য থাকত স্বল্প পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী। তাই বলা যায় যে সামাজিক স্তরবিন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা প্রাচীন।
সর্বজনীন : সামাজিক স্তরবিন্যাস বিশ্বের প্রতিটি সমাজেই বিদ্যমান ছিল এবং আছে। অতিপ্রাচীন নিরক্ষর সমাজে লিঙ্গভেদে পুরুষ-নারী, বয়সভেদে কিশোর-যুবক-বয়স্ক, তাদের সামাজিক দাস-দায়িত্ব ও ভূমিকাভেদে প্রাথমিক পর্যায়ের (জঁফরসবহঃধৎু) সামাজিক স্তরবিন্যাস লক্ষণীয়। একইভাবে আধুনিক সমাজে ধনী-দরিদ্র জনগোষ্ঠী, এমনিক সমাজতান্ত্রিক সমাজেও স্তরবিন্যাস বিদ্যমান আছে। তাই যথার্থ অর্থেই এ ব্যবস্থাকে সর্বজনীন ব্যবস্থা বলা হয়েছে।
সামাজিক : সামাজিক স্তরবিন্যাসের মূল উপাদানগুলি হবে সামাজিক চলক। ব্যক্তির শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি চলক হবে সামাজিক স্তরবিন্যাসের নির্ধারক। এসব চলক ব্যকিতÍ অর্জিত গুণাবলির পরিমাণ বা মাত্রাভেদে সমাজে যে ভূমিকা পালন করে সে অনুপাতে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও সম্মান ভোগ করে। ফলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের ক্রমোচ্চ বিভাজন গড়ে ওঠে এবং ব্যক্তি সমাজে অসম মাত্রায় সম্পত্তি, ক্ষমতা ও মর্যাদা ভোগ করে। তাই যথার্থই বলা যায় যে সামাজিক স্তরবিন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এটা সামাজিক।
বিভিন্ন ধরনের : সামাজিক স্তরবিন্যাস বিভিন্ন ধরনে বিভক্ত। এটা সমাজভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন আদিম সমাজে দাসত্ব (ঝষধাবৎু), সামন্ত সমাজে সামন্ততন্ত্র (ঊংঃধঃব), ভারতীয় সমাজে বর্ণপ্রথা (ঈধংঃব) এবং ধনতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী ও মর্যাদা। সমাজভেদে নামকরণ ভিন্ন হলেও প্রতিটি ব্যবস্থা একই অর্থাৎ অসম মাত্রায় সম্পত্তি, ক্ষমতা, মর্যাদা ও সম্মান তথা সামাজিক সুযোগ-সুবিধার অসম বণ্টন ও ভোগ। যার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ক্রমোচ্চ বিভাজন। আদিম দাসপ্রথায় দাস মালিক ও দাস; সামন্ততন্ত্রে অভিজাত, যাজককুল ও সাধারণ মানুষ; জাতি-বর্ণপ্রথায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পুঁজিপতি এবং শ্রমিক বা বুর্জোয়া ও সর্বহারা। সমাজ ব্যবস্থাভেদে স্তরবিন্যাস ব্যবস্থায় সমাজবাসী এমন বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। মূলত তাদের অধিকারে থাকা সম্পত্তি, ক্ষমতা এবং সম্মানের মাত্রানুপাতে।
সম্পত্তি, ক্ষমতা, সম্মান ইত্যাদির অসম বণ্টনের ফলে যে ক্রমোচ্চ বিভাজন সৃষ্টি হয় সমাজজীবনে তার এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। সমাজজীবনে সামাজিক স্তরবিন্যাসের এ প্রভাবকে চারটি সাধারণ ভাগে দেখানো যায় :
 জীবন সম্ভাবনা : জীবন সম্ভাবনা হল সমাজপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগের সামর্থক্য অথবা ব্যর্থতা, যা ব্যক্তির সম্পত্তি, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি দ্বারা সচরাচর নির্ধারিত হয়ে থাকে। জীবন সম্ভাবনাগুলি হল বেঁচে থাকার সম্ভাবনা, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, শিক্ষালাভের সুযোগ, মূল্যবান ও উচ্চ আয় উপযোগী দক্ষতা অর্জন, প্রত্যাশিত পেশা এবং আয়, সামাজিক মর্যাদা ভোগ, বস্তুগত উন্নয়ন ইত্যাদি। এককথায় জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা অর্জন এবং অভিজ্ঞতা হল জীবন সম্ভাবনা। মূলত অসম সামাজিক বণ্টন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই উপর্যুক্ত জীবন সম্ভাবনাগুলো অর্জন অথবা অর্জনে ব্যর্থতা নির্ধারিত হয়। যার সম্পত্তি ও ক্ষমতা বেশি জীবন সম্ভাবনাগুলি অর্জনের দক্ষতা তার অধিক। পক্ষান্তরে যার সম্পত্তি ও ক্ষমতা কম জীবন সম্ভাবনা সংগ্রহের সামর্থ্যও তার কম।
প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের ধরন : সমাজের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে (পরিবার, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম ইত্যাদি) ব্যক্তির দৈনন্দিন আচরণ সম্পত্তি, ক্ষমতা ও সম্পদের অসম সামাজিক বণ্টন ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিভিন্ন সেবা এবং পরিষেবা সামাজিক স্তরবিন্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেমন সম্পদশালী ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে পারে সহজেই, সম্পদহীন ব্যক্তির পক্ষে তা সম্ভব নয়। একইভাবে দেখা যায় সম্পদশালী ব্যক্তি তার সন্তানের উপযুক্ত শিক্ষার জন্য ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে কিন্তু গরিব লোক তা পারে না।
জীবন প্রণালী : কর্মদক্ষতা, সময়, সম্পদ ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রক্রিয়া বুঝাতে জীবন প্রণালী প্রত্যয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ব্যক্তি কোথায় কীভাবে, কী পরিমাণে তার কর্মদক্ষতা, সময়, সম্পদ ব্যবহার করে তার ভিত্তিতে ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনযাপনের একটি ধরন তৈরি হয়। এ ধরনটি ব্যক্তির অন্যান্য সামাজিক আচরণ এবং অন্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ও আচরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, সম্পদশালী ব্যক্তির বাসস্থান, আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং অবসর সময় উপভোগের মাধ্যম ইত্যাদি ক্ষেত্রে সর্বাধিক পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করে কিন্তু সম্পদহীন বা স্বল্প সম্পদের মালিক তা করতে পারে না বিধায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তাই তাদের জীবন প্রণালীকে নির্দেশ করে। জীবনযাপনের এ ধরন সমাজে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করে।
মূল্যবোধ, মনোভাব এবং মতাদর্শ : সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে সমাজে ব্যক্তির মূল্যবোধ, মনোভাব এবং মতাদর্শ গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির জীবন সম্ভাবনা, প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের ধরন, দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরন ইত্যাদির মাত্রাগত পার্থক্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেভাবে এসব মূল্যবোধ, মনোভাব ও মতাদর্শ ধারণা করে ঠিক সেভাবেই সে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কে আবদ্ধ হবে বা একে অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে যাবে।
উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে দেখা যায় যে ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক ক্রমোচ্চ অবস্থানে থেকে যে মাত্রায় জীবন সম্ভাবনা ভোগ করে, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যে আচরণ করে, তা তার দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় বহিঃপ্রকাশ ঘটে; এবং সামাজিক বাস্তবতায় তার মূল্যবোধ, মনোভাব এবং মতাদর্শ বিকাশ লাভ করে তা মূলত সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থারই প্রভাব।
প্রতিটি সমাজেই সমাজবাসীকে তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়- (ক) কে কোন কাজ করবে? (খ) সমাজে কে কোন স্তরে বা মর্যাদায় স্থান লাভ করবে? (গ) জীবন পরিতৃপ্তকরণের প্রাপ্তব্য সুযোগ-সুবিধা কে কোন মাত্রায় ভোগ করবে? (কধৎ, ১৯৫৫:২৫)। উপর্যুক্ত প্রশ্ন তিনটির উত্তরদানে যে সামাজিক উদ্ভব হয় তা-ই সামাজিক স্তরবিন্যাস। সব মানুষ সমান হলেও দৈহিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। এ পার্থক্যের কারণেই সমাজে ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তার গুণাবলি ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে। ফলে ব্যক্তির জীবন পরিতৃপ্তকরণের প্রাপ্তব্য সুযোগ-সুবিধাদি প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও গড়ে উঠেছে অসম ব্যবস্থা, যা পরস্পরকে বিভিন্ন ক্রমোচ্চ স্তরে বিভক্ত করে এবং একে অপরকে নিজের উপরে বা নিচে স্থান নির্ধারণ করে। সমাজে ব্যক্তির অবস্থানের এ ক্রমোচ্চ বিন্যাসকে সমাজবিজ্ঞানীগণ সামাজিক   স্তরবিন্যাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। সমাজে স্তরবিন্যাস উদ্ভবের কারণ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীগণ কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন : (ক) সমাজের প্রয়োজনীয় ক্রিয়াজনিত স্তরবিন্যাস (ঋঁহপঃরড়হধষ ঘবপবংংরঃু ড়ভ ঝঃৎধঃরভরপধঃরড়হ), (খ) অর্থনৈতিক স্তরবিন্যাস (ঊপড়হড়সরপ ঝঃৎধঃরভরপধঃরড়হ), (গ) ধর্মীয় স্তরবিন্যাস (জবষরমরড়ঁং ঝঃৎধঃরভরপধঃরড়হ)।       
(ক) ডেভিস এবং মুর (করহমংষবু উধারং ধহফ ডরষনবৎ গড়ড়ৎব) শ্রমবিভাজনকেন্দ্রিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থার মূল প্রবক্তা (কর, ১৯৯২:২২৮)। মানুষ যুগ যুগ ধরে শ্রেণিহীন সমাজের কল্পনা করে এসেছে। এ নিয়ে কবি কাব্য লিখেছেন, গীতিকার লিখেছেন, গান, নাট্যকার লিখেছেন নাটক। বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও দার্শনিক অনেক মতবাদ দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের এ কল্পনা বাস্তবায়িত হয় নি। এর অন্যতম কারণ হল সমাজের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজকর্ম করার ব্যবস্থা এবং এসব কাজকর্মের গুরুত্ব ও দায়িত্ব পালনকারীর দক্ষতা-যোগ্যতা ইত্যাদি বিবেচনায় বিদ্যমান সম্মানী ও মজুরি ব্যবস্থা। সমাজের সব কাজ একই রকম গুরুত্বপূর্ণ (যেমন বিচারকের কাজ, সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা, সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন) ও ঝুঁকিপূর্ণ (যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কাজ করা, প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কাজ করা) নয়। সমান আয়াসসাধ্য বা কষ্টসাধ্যও নয়। সমাজবাসী প্রত্যেকেই যে কোনো কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলিসম্পন্ন নয়। কিন্তু সমাজ চার প্রতিটি কাজের গুরুত্ব ও ঝুঁকিভেদে উপযুক্ত দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে- যাতে করে সুষ্ঠুভাবে সমাজের কার্যাবলি সম্পন্ন হয়। এজন্য সমাজে কিছু ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। যেমন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য অধিকতর দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ করা। এমন লোক উচ্চশিক্ষিত, মেধাসম্পন্ন এবং বিশেষ কাজের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এদের দায়-দায়িত্ব বেশি। সমাজ এমন কাজের সঙ্গে অধিক সম্মানী ও কর্তৃত্ব সংশ্লিষ্ট থাকে যাতে করে অধিকতর মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিবর্গ এসব কাজের প্রতি আগ্রহী হয়। ফলে এমন ব্যক্তিবর্গ সম্পদশালী, ক্ষমতাবান উচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে এমন ব্যক্তিবর্গ সম্পদশালী, ক্ষমতাবান উচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা পায়। পক্ষান্তরে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য স্বল্পমেধাবী, স্বল্পশিক্ষিত লোকের প্রয়োজন হয় এবং সমাজে এরূপ জনশক্তির জোগান বেশি হওয়ায় এসব কাজে পারিশ্রমিক কম হয়। সমাজে এমন ব্যক্তিবর্গ তুলনামূলকভাবে কম সম্পদশালী, ক্ষমতাবান ও নিু মর্যাদার অধিকারী হয়। আবার এমন কিছু কাজ আছে যার জন্য তেমন কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয় না। এরূপ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতি সামান্য মজুরি পেয়ে থাকে এবং এদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই বললেই চলে। এদের সামাজিক মর্যাদাও সর্বনিু স্তরে।
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে প্রত্যেকটি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে উপযুক্ত লোকের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় এবং কাজের গুরুত্ব অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার সুযোগ-সুবিধা (জবধিৎফং) প্রদান করা হয়ে থাকে। তাই ডেভিস এবং মুরের মতামতের আলোকে বলা যায় যে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য প্রাপ্ত সুবিধার ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে সমাজে সামাজিক স্তরবিন্যাস গড়ে উঠেছে।
 (খ) ডেভিস ও মুরের মতবাদ যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত হলেও সামাজিক স্তরবিন্যাস উদ্ভবের অন্যান্য কারণের মধ্যে অর্থনৈতিক কারণও অধিকতর গুরুত্ববহ। এ মতবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হল: (১) বিজেতা এবং বিজিতের সম্পর্ক। মানব ইতিহাস অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনায় সমৃদ্ধ, যা বিজেতা এবং বিজিত দুটি পক্ষের সৃষ্টি করেছে। সর্বকালে এবং সর্বদেশে যুদ্ধে জয়লাভের সুযোগে বিজেতাগণ বিজিতদের সমাজ ব্যবস্থার নিুস্তরে মর্যাদা দেয় এবং অনেক রকম সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত করে। এরূপ স্তরবিন্যাসের প্রমাণ ইতিহাসে বিরল নয়। (২) জাতিগত পার্থক্যের ভিত্তিতেও (জবপরধষ ফরভভবৎবহঃরধঃরড়হ) সমাজে সামাজিক স্তরবিন্যাসের উদ্ভব হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে শ্বেতকায় জনগোষ্ঠী নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে কৃষ্ণকায় জনগোষ্ঠীকে প্রায় যাবতীয় ভারতবর্ষেও দেখা যায়। যেখানে বিজেতা আর্যগণ কৃষ্ণবর্গ এবং অনার্যদের পদানত করে সমাজ ব্যবস্থার নিুস্তরে স্থান দেয়। ফলে উপর্যুক্ত উভয় ক্ষেত্রেই অধিকতর আর্থিক সুবিধাভোগী উচ্চ মর্যাদার জনগোষ্ঠী এবং বঞ্চিত ও মর্যাদাহীন জনগোষ্ঠী- এ দুটি স্তরের সৃষ্টি হয়েছে। (৩) কৃষিভিত্তিক সমাজে ভূমি মালিকানার ভিত্তিতে ভূস্বামী ও ভূমিহীন শ্রেণি গড়ে ওঠে। ইউরোপীয় সামন্তপ্রথার ভিত্তি ছিল ভূমি মালিকানা। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের লেবানন, সিরিয়া, মিশরে ভূমি মালিকানাভিত্তিক স্তরবিন্যাস ছিল। (৪) উৎপাদনের উপকরণ নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী সমাজে কর্তৃত্ব করে এবং যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাভোগী নিু শ্রেণিভূক্ত। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণযেখানে মালিক বুর্জোয়া শ্রেণি এবং মালিকানাবঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণি বিদ্যমান। এ মতবাদে এটা লক্ষনীয় যে অর্থনীতিভিত্তিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থায় দুটি শ্রেণি বিদ্যমানযারা মালিক ও মালিকানাবঞ্চিত। মার্কসের মতে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত।
অর্থনৈতিক কারণে উদ্ভূত স্তরবিন্যাস ব্যবস্থায় বিজেতাগণ বিজিতদের, শ্বেতকায়গণ কৃষ্ণকায়দের, বুর্জোয়াগণ প্রলেতারিয়েতদের সামাজিক স্তরবিন্যাসের নিুস্তরে স্থান দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। এ ব্যবস্থায় উচ্চশ্রেণির ব্যক্তিবর্গ উৎপাদন উপকরণের মালিকানার বদৌলতে নিুশ্রেণির মালিকানা বঞ্চিতদের শোষণ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়। তাই বলা যায় যে সামাজিক স্তরবিন্যাস উদ্ভবের অর্থনৈতিক কারণও যথেষ্ট তাৎপর্যবহ।
(গ) অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও সামাজিক স্তরবিন্যাস উদ্ভবের আরো কিছু কারণ আছে যার মধ্যে ধর্ম অন্যতম। অতীতের সব সমাজেই যাজকগণ উচ্চ মর্যাদা এবং প্রাধান্য পেয়েছে। বর্তমানে অনেক সমাজে এ অবস্থা বিরাজমান। এর মূল কারণ হল ধর্ম অর্থাৎ ধর্মীয় মূল্যবোধ। অনুরূপভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়, ইসলাম ধর্মে পীর, সুফি, ওলেমা, মাশায়েখ, মওলানাবৃন্দ সমাজে মর্যাদা ও প্রাধান্য পেয়েছেন এবং পাচ্ছেন ধর্মীয় কারণে। প্রতিটি সমাজেই যাজক, পুরোহিত, মওলানা, ইমাম সম্প্রদায় তাদের নিজ নিজ সমাজে ধর্মীয় শিক্ষাদান, প্রার্থনা সভায় নেতৃত্বদান (ইমামতি, পৌরোহিত্য ইত্যাদি), ধর্মীয় বিষয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও মতামত দিয়ে থাকেনযা একমাত্র তাদেরই অধিকার এবং সমাজে তা মেনে নেয়। ফলে উপর্যুক্ত সম্প্রদায়গুলি নিজ নিজ সমাজে উচ্চ মর্যাদা ও প্রাধান্য ভোগ করেন। এ সম্প্রদায়গুলি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত না থেকেও তারা উচ্চতর সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তাদের অনুসারীদের প্রদত্ত গুরুদক্ষিণা, দান, নজরানা ইত্যাদির কল্যাণে। ধর্মভিত্তিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের সম্মুখীন হলেও এ ব্যবস্থা মূলত টিকে আছে ঐ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির কারণে (কর, ১৯৮৫)।
সামাজিক স্তরবিন্যাস উদ্ভবের ব্যাখ্যায় উপর্যুক্ত মতবাদগুলি যথেষ্ট তথ্যভিত্তিক ও যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হলেও এ ক্ষেত্রে তা চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া সঙ্গত হবে না। সামাজিক স্তরবিন্যাসের সঙ্গে জড়িত নানাবিধ আচার-ব্যবস্থা (শ্রমবিভাজন, সম্পত্তি ও স্বত্বাধিকার ব্যবস্থা, ধর্ম, যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনসমূহ) বিচার-বিশ্লেষণ করা অত্যাবশ্যক। এ ছাড়াও সমাজে বিদ্যমান সামাজিক মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক পটভুমি এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণগুলিও এক্ষেত্রে যথার্থ গুরুত্বের দাবিদার।
সমাজবিজ্ঞানীগণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে সামাজিক স্তরবিন্যাসের চারটি ধরনের কথা বলেছেন : (১) দাসপ্রথা (ঝষধাধৎু), (২) সামন্ততন্ত্র (ঊংঃধঃব), (৩) বর্ণপ্রথা (ঈধংঃব ঝুংঃবস), (৪) শ্রেণি ও মর্যাদা (ঈষধংং ধহফ ঝঃধঃঁং)। নিম্নে এ ধরনগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
দাসপ্রথা ঃ দাসপ্রথা হল অসম সামাজিক সম্পর্কের চরম নিদর্শন যেখানে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ প্রায় সব ধরনের অধিকার হতে বঞ্চিত। এরিষ্টটল গার্হস্থ্য জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি সামগ্রীর উল্লেখ করেছেনএকটি জড় সামগ্রী (যেমন বাসন-কোসন, আসবাবপত্র) এবং অপরটি সজীব সামগ্রী (যেমন দাস)। হব হাউজের মতে দাস হল সেই ব্যক্তি যে সামাজিক আইন ও প্রথামতে অন্যের সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃত। মূলত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করেই দাসপ্রথার সূচনা হয়। পৃথিবীর সব প্রাচীন সভ্যতাই দাসপ্রথার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল। অভিজাত শ্রেণির বিকাশ হয়েছিল মূলত দাসশ্রমের সহজলভ্যতার কারণে (ঞঁসরহ, ১৯৯৪)।
দাসদের সামাজিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ঐ.ঔ. ঘরবনড়বৎ বলেছেন যে(ক) দাস প্রভুর সম্পত্তি বিধায় একজন দাস সর্বদাই তার প্রভুর অধীনস্থ থাকবে এবং দাসের ওপর প্রভুর অধিকার সীমাহীন। প্রভু ইচ্ছামতো দাসদের ব্যবহার করতে পারত। যে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারত। এ ক্ষেত্রে সামাজিক বা আইনগত কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। (খ) মুক্ত মানুষের তুলনায় সমাজে দাসদের অবস্থান ছিল নিচু। তাদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না অর্থাৎ তারা ভোট দিতে বা প্রার্থী হতে পারত না। সামাজিকভাবে তারা ছিল করুণার পাত্র। (গ) দাসপ্রথা কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল বিধায় দাস তার প্রভুর যে কোনো কাজ করতে বাধ্য ছিল। নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না।
ইউরোপে দাসপ্রথা বিলোপের কারণগুলি হল(ক) অপেক্ষাকৃত উন্নততর উৎপাদন কৌশল বিকাশের ফলে দাসশ্রম অকার্যকর এবং অলাভজনক বিবেচিত হতে থাকে। (খ) দাসরা তাদের মালিকদের কাছ থেকে পালিয়ে গিল্ড মালিকদের কাছে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। (গ) দুটি বিষয়ে দাসপ্রথার যৌক্তিকতা নিয়ে নীতিগত আপত্তি দেখা দেয়(১) জড় পদার্থের ন্যায় দাসদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার; (২) অন্যদের মতো দাসরাও অধিকারসম্পন্ন মানুষ। প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে দাসপ্রথা সমর্থনযোগ্য হলেও আদর্শগতভাবে এ প্রথা সমর্থনযোগ্য নয়। অনেক মনীষীর লেখনীতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিবাদ লক্ষণীয় যা ধীরে ধীরে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটায়। (ঘ) সংস্কার প্রক্রিয়ায় দাসপ্রথার কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করা হয় (১) শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে দাস মালিকদের একচ্ছত্র ক্ষমতা রহিতকরণ; (২) বিবাহ করা, সম্পত্তি অর্জন করাসহ দাসদের কিছু অধিকার স্বীকৃত হওয়া; (৩) দাসদের মুক্ত করে দেয়ার বিধান (চৎড়রারংরড়হ ভড়ৎ গধহঁসরংংরড়হ) করা। ক্রিশ্চিয়ান চার্চ এ বিষয়টিকে অনুমোদন এবং উৎসাহিত করে। উপর্যুক্ত বিষয়গুলি ইউরোপে দাসপ্রথা বিলোপে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
ভারতবর্ষে দাসপ্রথা ছিল কি না এ বিষয়ে অনেক বিতর্ক আছে। মেগাস্থিনিস ভারতবর্ষে দাসপ্রথার অস্তিত্ব খুঁজে পান নি (কর, ১৯৮৫-১৮৯)। তবে এখানে দাসপ্রথা ছিল না তা জোরালোভাবে বলা যায় না। আর্যগণ ভারতবর্ষে এসে অনার্যদের দাস বলে গণ্য করতেন এবং যুদ্ধে পরাজিতদের দাস করে রাখতেন। যুদ্ধে পরাজিত হওয়া ছাড়াও আরো অনেক কারণে দাসপ্রথার প্রসার ঘটে। দাস পিতা-মাতার সন্তান দাস হত, অর্থাভাবে অনেকেই সপরিবারে দাসত্ব মেনে নিত; ঋণের দায়ে বা কোনো অপরাধমূলক কাজের শাস্তি হিসেবে অনেককে দাসে পরিণত করা হত। স্মৃতি এবং অন্যান্য গ্রন্থে এরূপ বিভিন্ন প্রকার দাসের কথা উল্লেখ আছে। এখানে উল্লেখ্য যে ভারতীয় এ দাসপ্রথা পাশ্চাত্যের একজন হিসেবে গণ্য হত, পরিবারের সদস্যদের ন্যায় দাসদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিত, বৃদ্ধ বয়সে দাসদের বিতাড়ন করা আইনবিরোধী বলে বিবেচিত হত। দাসের ওপর বল প্রয়োগের সীমা আইন দ্বারা নির্দিষ্ট ছিল। অপুত্রক অবস্থায় দাসের মৃত্যু হলে তার যাবতীয় পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করা হত। দাসের অধিকার সংরক্ষণে এরূপঅনেক উদার ব্যবস্থার কথা অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ করা আছে। আরো লক্ষণীয় যে পাশ্চাত্যের ন্যায় ভারতবর্ষে অর্থনীতি দাসপ্রথার ওপর নির্ভরশীল ছিল না।
ভূমিদাস ব্যবস্থা ঃ ভূমিদাস ব্যবস্থা হল কঠোতাবিহীন এক প্রকার দাস ব্যবস্থা যেখানে ভূমিদাসরা সামাজিক আইন অনুযায়ী নিুতর বিশেষ কিছু অধিকার ও মর্যাদা লাভ করে (খান, ১৯৭৩, ১১২)। ভূমিদাসরা মালিকের নির্দেশে কাজ করলেও তাদের দাস বলা যায় না কারণ তারা নির্দিষ্ট ভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, মালিকের সম্পত্তি নয়। মালিক ভূমিদাদের হস্তান্তর বা বিক্রয় করতে পারে না। তবে ঐ নির্দিষ্ট ভূমি অন্যের নিকট হস্তান্তর করলে ঐ ভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভুমিদাসরাও ভূমির সাথে হস্তান্তরিত হয়ে যেত। এ ব্যবস্থায় ভূমিদাসরা উত্তরাধিকারসূত্রে ভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকত।
দাসপ্রথা ও ভূমিদাস ব্যবস্থার মধ্যে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান যা নিম্নরূপ (১) দাসপ্রথায় দাসরা পুরোপুরি অধিকারবঞ্চিত কিন্তু ভূমিদাস ব্যবস্থায় দাসরা কিছু সীমিত অধিকার ভোগ করে থাকে। (২) রোমান আইনে দাসরা অধিকারবঞ্চিত। দাসমালিক সদয় হয়ে কিছু অধিকার দিতে পারত না। কিন্তু ভূমিদাসরা আইনের মাধ্যমে অধিকারপ্রাপ্ত। (৩) দাসপ্রথায় দাসরা মালিকের ইচ্ছায় শ্রম দিতে বাধ্য কিন্তু ভূমিদাস মূলত কৃষি প্রজা বা বন্দোবস্ত চাষি। (৪) দাসদের আইনানুগ অবস্থা ভুমিদাসদের চেয়ে নিুতর এবং দাসমালিক দাসকে বিক্রয় করতে পারত। পক্ষান্তরে ভূমিদাস কতিপয় অধিকারভোগকারী যাদের বিক্রয় করা যেত না। তবে নির্দিষ্ট ভূমি হস্তান্তরের মাধ্যমে ভূমিদাসরাও হস্তান্তরিত হতে পারত। তবে তারা ভূমি থেকে উচ্ছেদ হত না। (৫) দাসপ্রথায় দাস ক্রয়-বিক্রয় ব্যবস্থা ছিল বিধায় একজন বা একাধিক দাসকে জীবদ্দশায় একাধিক মালিকের কর্তৃত্বে থাকতে হত। কিন্তু ভূমিদাস ব্যবস্থায় ভূমিদাস ও তার সন্তানরা আজীবন ভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকত বিধায় ভূমি হস্তান্তর হলেও তারা ভূমি থেকে উচ্ছেদ হত না।
সামন্ততন্ত্র ঃ মধ্যযুগের ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থা সামন্ততন্ত্র নামে পরিচিতযার তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল। সামন্ততন্ত্র মূলত ভূমি মালিকানা স্বত্ব ও চাষাবাদভিত্তিক একটি সমাজ ব্যবস্থা। সেখানে তিনটি স্তর বিদ্যমান ছিল। স্তর তিনটি হল(১) অভিজাত (ঘড়নষব); (২) যাজক (ঈষবৎমু); (৩) সাধারণ (ঈড়সসড়হবৎং)। প্রতিটি স্তরের নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারিত হত সমাজের আইন দ্বারা। একজন যে স্তরে জন্ম নিত সে সেই স্তরের অঙ্গ বলে বিবেচিত হত। এ স্তর বিভক্তির একটি অন্যতম দিক হল দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি বিশেষ অঙ্গ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। এ এল কুবেরের মতে সামাজিক বিধিবিধানের দিক থেকে বিবেচনা করলে সামন্ততন্ত্র বর্ণপ্রথা থেকে অনেকাংশে শিথিল ছিল। এ ব্যবস্থায় প্রতিটি স্তরের ব্যক্তিবর্গই আইন দ্বারা নির্ধারিত অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত এবং দায়িত্ব পালন করত বিধায় এক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তনের সুযোগ ছিল (খান, ১৯৭৩:১১৪)।
সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ : (১) এ ব্যবস্থা ছিল আইনের দ্বারা সংজ্ঞায়িত অর্থাৎ প্রতিটি স্তরের জন্য তাদের নির্ধারিত অধিকার, দায়দায়িত্ব বিশেষ সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা ভোগ করত। (২) এ ব্যবস্থা ছিল মূলত ব্যাপক অর্থে শ্রমবিভাজন, যেখানে প্রত্যেকের কাজ নির্দিষ্ট করা ছিল : (ক) অভিজাত সম্প্রদায় সকলের জন্য নিরাপত্তা বিধান করত; (খ) যাজক সম্প্রদায় সকলের জন্য প্রার্থনা করত; (গ) সাধারণ মানুষ সকলের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করত। এ ব্যবস্থায় অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত ছিল। সাধারণ মানুষ ছিল রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত। অভিজাত সম্প্রদায় হল সামন্ততন্ত্রের প্রথম স্তর (ঋরৎংঃ ঊংঃধঃব)। খান (১৯৭৩) অভিজাত সম্প্রদায়কে দুটি ভাগে বিভক্ত করে, আলোচনা করেছেন- (ক) রাজা, (খ) রাজন্যবর্গ।
(ক) রাজা : সামন্ততন্ত্রে রাজকীয়তা সুনির্দিষ্ট বিশেষ স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরের বিধান থাকে। এ কারণে রাজার পদমর্যাদায় আইনগত অধিকার জন্মে যা সরকারি কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা হতে ভিন্নতর। রাজকীয়তা সংখ্যালঘু হলেও অন্যান্য গোষ্ঠী হতে এর অস্তিত্ব আলাদা এবং স্তর হিসেবে বিশেষ কিছু সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধাভোগকারী। রাজার প্রকৃত ক্ষমতা ও নীতিই অন্যান্য সকল স্তরের প্রাপ্তব্য সুযোগ-সুবিধার মাত্রা নির্ধারণ করত। মধ্যযুগে রাজা ছিলেন ব্যক্তির সামাজিক গতিশীলতার উৎস; তিনি রাজন্য সৃষ্টি করতে পারতেন বা রাজন্য মর্যাদা ফিরিয়ে নিতে পারতেন। রাজা ছিলেন ভূমি দান বা বাজেয়াপ্ত করা, সুযোগ-সুবিধা মঞ্জুর করার একচ্ছত্র অধিকারী।
(খ) রাজন্যবর্গ : প্রাচীন রাজন্যবর্গ ছিল মূলত জন্মগতভাবে রাজার নিকট হতে দান হিসেবে প্রাপ্ত ভূমি (জমিদারি) মালিক (সামন্ত)। যারা সর্বদাই বিশেষ সম্মান পেতেন এবং বৃহৎ আকারের জমিদারির মালিক ছিলেন। নতুন উদ্ভূত রাজন্যবর্গ ছিল মূলত অস্ত্রশক্তিতে শক্তিমান। তবে অল্প সময়েই তারা উচ্চপদস্থ চাকরিতে সংশ্লিষ্ট মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। এ নতুন রাজন্যবর্গ তাদের দক্ষতাগুণে তাদের পূর্ববর্তীদের ছাড়িয়ে যায়। এভাবে রাজকীয় স্তরের পরবর্তী স্তরটি (রাজন্যবর্গ) বহুবিধ ক্ষেত্রে পার্থক্যসহ ক্রমোচ্চ পর্যায়ে বিন্যস্ত তিনটি স্তরে রূপ নেয়। যেসব সামন্ত সরাসরি রাজার নিকট হতে ভূমি পেতেন তারা পরিচিত হতেন লর্ড বলে। আবার সামন্ত লর্ড তার ভূমি কয়েক খ-ে বিভক্ত করে কয়েকজনকে দিতেন, নতুন ভূমিমালিকগণ সামন্ত লর্ডের ভ্যাসেল বলে স্বীকৃত হতেন। আবার এসব ভ্যাসেল তাদের ভূমিকে কয়েক খ-ে বিভক্ত করে কয়েক জনকে দিতেন, নতুন ভূমিমালিকগণ ভূমিদাতা ভ্যাসেলের অধীনস্থ ভ্যাসেল বলে স্বীকৃত হতেন এবং লর্ড হিসেবে স্বীকৃত হতেন তাদের ভূমিদাতা ভ্যাসেলগণ। এভাবে উপর্যুক্ত প্রক্রিয়ায় ভূমিমালিকগণ তাদের ভূমিকে খ-িত করে ক্রমাগতভাবে অধীনস্থ ভূমিমালিক সৃষ্টি করতেন যারা পর্যায়ক্রমে লর্ড ভ্যাসেল সম্পর্কে আবদ্ধ হতেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ভ্যাসেলগণ লর্ডদের অধীনস্থতা ও আনুগত্য স্বীকার করত। প্রত্যেকের দায়িত্ব, কর্তব্য, সম্মান, সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হত ভূমিমালিকানার পরিমাণের ভিত্তিতে। এসব লর্ড ও ভ্যাসেলের পর্যায়ক্রমিক পদবি ছিল কাউন্ট, ভাইস কাউন্ট, নাইট, ব্যারন ইত্যাদি। অপরপক্ষে অস্ত্রধারী রাজন্যবর্গ শুধু যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমেই তাদের পদ, পদমর্যাদা অধিষ্ঠিত পেতেন (খান, ১৯৭৩:১১৮)। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য তাদের রাজন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করত এবং ভূমির মালিকানা ও ক্ষমতা পেতেন। এভাবেই বৈষয়িক সম্পদ এবং মানুষের ওপর কর্তৃত্ব-এ দ্বৈতবাদ সামাজিক স্তরগুলির মধ্যে চিরস্থায়ী রূপ পেত। সাম্রাজ্যের প্রাথমিক গঠনরূপ ছিল প্রদেশ, অঞ্চল ও সমাজ হিসেবে বিভক্তি। কাউন্টির প্রশাসনভার ন্যস্ত হত কাউন্টের ওপর। কয়েকটি কাউন্টি নিয়ে গঠিত হত প্রদেশযার শাসনভার ন্যস্ত থাকত ডিউকের ওপর। এছাড়াও রাজা কর্তৃক নিযুক্তি পেতেন বিভিন্ন কর্মকর্তা (ঙভভরপবৎ)। কাউন্টরা ছিলেন মূলত প্রশাসক ও বিচারপতি; অপরপক্ষে ডিউকরা ছিলেন সামরিক অধিনায়শান্তি রক্ষা ছিল তাদের মূল দায়িত্ব।
ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের সমসাময়িক সময়ে ভারতবর্ষে সেরূপ সমাজ ব্যবস্থার বিকাশ বা উপস্থিতি ছিল কি না তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। ভারতেও সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ছিলএ মতের পক্ষে অনেক মতামত থাকলেও ভারতের সামন্ততন্ত্র ইউরোপের সামন্ততন্ত্রের থেকে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে বহুলাংশে পৃথক ছিল। ইউরোপের সামন্ততন্ত্র চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজার নিকট হতে ভূমির ভোগদখল স্বত্ব নির্দিষ্ট শর্তযুক্ত ছিল। ভারতবর্ষে ভূমির ভোগদখল স্বত্ব এরূপ কোনো চুক্তিনির্ভর ছিল না (কর, ১৯৮৫:১৯২)। ভারতে যুদ্ধে পরাজিত রাজা বিজয়ী রাজার আনুগত্য স্বীকার করে সামন্ত হিসেবে সিংহাসন রক্ষা করত এবং এভাবেই ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ঘটে বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাজাকে পরাক্রমশালী রাজার নিকট স্বেচ্ছায় আনুগত্য স্বীকার করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিভিন্ন শাস্ত্রাদিতে ধর্মবিজয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে যে পরাজিত রাজার রাজ্য গ্রাস না করে বিজিত রাজাকে অধীনস্থ করাই বিধেয়। যদিও সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত ও অন্যান্য অনেক রাজাই এ অনুশাসন মানেন নি, কিন্তু তা ছিল রীতিবিরুদ্ধ কাজ।
ভারতবর্ষে অন্যভাবেও সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব লক্ষণীয়, যেখানে শাসক নৃপতিগণ তাদের প্রিয় রাজকর্মচারীবৃন্দকে নগদ অর্থ পুরস্কার না দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ভূখ-ে রাজত্ব আদায়ের অধিকার দিতেন। কালক্রমে এ অধিকারের সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও আয়ত্তে আসে। এভাবে মধ্যস্বত্বভোগীগণই সামন্ত রাজার মর্যাদায় আসীন হয়। রাজন্যবর্গের সঙ্গে সম্রাটের সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট রীতি অনুসরণ করত না। ফলে ভিন্ন ভিন্ন সামন্ত্রের সাথে সম্রাটের সম্পর্কের ভিন্নতা ছিল। কেউ সম্রাটকে নিয়মিত খাজনা দিত, কেউ যুদ্ধের সময় সৈন্য ও ধনসম্পদ দিয়ে সাহায্য করত। অনেক ক্ষেত্রে সামন্ত রাজাগণ সম্রাটের মন্ত্রী, কাজি (বিচারক), সেনাধ্যক্ষ এবং অন্যান্য উচ্চ মর্যাদার পদে আসন পেতেন। উল্লেখ্য যে, এমন ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ অস্থায়ী কারণ সম্রাটের অসন্তুষ্টি বা সিংহাসনচ্যুতি বা নতুন সম্রাটের সিংহাসন লাভের পরে রাজন্যবর্গের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটত। নতুন সম্রাট তাঁর পছন্দমতো এসব পদ ও পদমর্যাদায় সামন্ত রাজা অনুমোদন করতেন। অনেক সময় কোনো কোনো ক্ষমতাধর রাজন্য সম্রাটের জন হুমকি বলে গণ্য হলে তাকে পদচ্যুত করা হত। এমনকিও ঘটেছে যে ক্ষমতাধর রাজন্যবর্গ দুর্বল সম্রাটকে পদচ্যুত করে নিজেই সিংহাসনে আরোহণ করেছে। ভারতের দাক্ষিণাত্যে এবং উত্তর ভারতেও এরূপ ঘটনার দৃষ্টান্ত আছে (কর, ১৯৮৫)। পক্ষান্তরে দুর্বল রাজন্যবর্গের প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অতি সীমিত, যাদের সাধারণ জমিদার হিসেবে গণ্য করা হত, যদিও তারা রাজা বলে পরিচিত পেতেন।
যাজক ঃ ইউরোপীয় গির্জাসমূহ যাজক ও অযাজক এ দুয়ের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য গড়ে তুলেছিল। পদমর্যাদা নির্বিশেষে অযাজকদের ধর্মীয় যে কোনো ব্যাপারে যাজকদের অনুবর্তী ও আজ্ঞাবহ করা হয়েছিল। ধর্মীয় যে কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার পূর্ণ অধিকার ছিল গির্জার। গির্জার প্রতিপত্তি অধিক থাকায় সাধারণ অনুষ্ঠানদিতেও অযাজকদের উপর যাজকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি আইনগতভাবে রাজার অনুগত ধর্মীয় যাজকদের সম্মুখে রাজাকে নতজানু হতে হত। প্রতিটি মর্যাদা স্তর কতিপয় আইনানুগ অধিকার ও দায়িত্ব পালন করতযার ভিত্তিতে যাজক সম্প্রদায় নিজেদের মধ্যে স্তর ও মর্যাদার পার্থক্য ও বিভক্তি দৃষ্টি করেছিল। উচ্চতর স্তর ছিল ধর্মযাজক ও বিশপদের তবে পোপ হলেন সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রতিভূ। একইভাবে যাজকীয় ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রাইমেটস, আর্চ-বিশপ, পেট্টিয়ার্কগণ স্তর মর্যাদায় ছিলেন বিশপের উপরে। শুধু পদমর্যাদাতেই এ পার্থক্য সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট না থেকে সংশ্লিষ্ট অধিকার ও কর্তৃত্বেও তা বিদ্যমান ছিল। পদবি ও সম্বোধনের ভাষা, পোষাক ও মুকুট, অঙ্গুরির ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য থাকত (খান, ১৯৭৩)। ইউরোপীয় বিভিন্ন রাজ্যে যাজকীয় ব্যবস্থা শাসন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছিল যেখানে গির্জার যুবরাজগণ রাষ্ট্রীয় যুবরাজগণের মতোই সমান মর্যাদা ও প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। এভাবেই রাজ্যে ধর্ম যাজকদের উচ্চতর স্তর আইনগতভাবেই রাজন্যবর্গের সমতুল্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়।
সাধারণ নাগরিক ঃ সাধারণ নাগরিকদের অধিকাংশই কৃষক বলে পরিচিত। তারা মূলত পপার (গরিব লোক) নামে পরিচিত ছিল এবং এ নামের মধ্যেই তাদের দুর্গতির ও দুরবস্থার চিত্র সুস্পষ্ট হত। বিশেষভাবে ভূমির ওপর কর আরোপের ফলে তাদের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। ফলে ক্ষুদ্র জোতের মালিকানাতেও পার্থক্য ও বিভিন্নতা দেখা দেয়। অনেকে তাদের জোতের ওপর পূর্ণ মাত্রায় স্বত্বাধিকারী ছিল; আবার অনেকে, যদিও তারা আইনগভাবে মুক্ত সাধারণ নাগরিক, জোত মালিকের জমি চাষাবাদকারী। এ ব্যবস্থা অনেকাংশে বর্তমানের জোতদার কৃষিজীবী ও তাদের অধীস্থ প্রজা চাষির অনুরূপ। সে সময় জমিদার জোতদারদের প্রচ- প্রতাপের ফলে প্রজাচাষির দুরবস্থা প্রায় ভূমিদাসের পর্যায়ে ছিল।
উপর্যুক্ত আলোচনায় মধ্যযুগীয় ইউরোপের ও ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থায় সামন্ততন্ত্রের উপস্থিতি লক্ষণীয় হলেও অনেক মনীষী মনে করেন যে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে সামন্ততান্ত্রিক ছিল না। তারা তাদের এ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ইউরোপীয় ও ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করেন। নিুে এ বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা হল :
(১) ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্র ছিল ভূমি মালিকানা স্বত্ব ও চাষাবাদ স্বত্বকেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থা; পক্ষান্তরে ভারতীয় সামন্ততন্ত্র ছিল আর্থিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের ব্যবস্থা যেখানে সম্রাট শুধু খাজনা আদায়ের জন্য ভূমি দিতেন রাজন্য বা সামন্তদের। প্রশাসনে সামন্তগণ রাজাকে অর্থসম্পদ এবং যুদ্ধের সময় সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতেন। ভারতীয় এ ব্যবস্থায় ভূমির মালিকানা স্বত্ব প্রদানের সুযোগ ছিল না।
 (২) ইউরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা ভূমি দানের মাধ্যমে তার অধীনস্থ ভূমি মালিক সৃষ্টি করতে পারত। যেহেতু রাজা হল ভূমির চূড়ান্ত (ঝঁঢ়ৎবসব) মালিক; অপরপক্ষে ভারতীয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা তার অধীনস্থ ভূমি মালিক সৃষ্টি করতে পারত না। কারণ রাজা নিজে ভূমির চূড়ান্ত মালিক ছিল না। বিশেষ ব্যবস্থায় রাজা শুধু ভূমির খাজনা আদায়ের অধিকার দিতে পারত।
(৩) সমাজ বিবর্তনের ধারায় সামান্ততন্ত্রের পরে ধনতান্ত্রিক সমাজের উদ্ভব ঘটে ইউরোপে, ভারতে তেমনটি ঘটে নি। এর ব্যাখ্যায় মনীষীগণ যা বলেছেন তা হলইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রে ভূমির স্থায়ী মালিকানা স্বীকৃত থাকায় ভূমি মালিকগণ কৃষি উন্নয়নে মনোযোগী ছিলেন এবং কৃষিতে যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছিলেন। ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদের সঞ্চয় বাড়ে। এ সঞ্চিত সম্পদ পরবর্তীতে শিল্পপুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করে কলকারখানা স্থাপন করা হয়। পরিণতিতে শিল্পভিত্তিক ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায়। পক্ষান্তরে ভারতীয় সামন্ততন্ত্রে ভূমির মালিকানা স্থায়ী না হওয়ায় কৃষির উন্নয়নের লক্ষ্যে বিনিয়োগ হয় নি বিধায় কৃষি উৎপাদন বাড়ে নি। ভারতের কৃষি ছিল মূলত ভোগভিত্তিক বিধায় এখানে কৃষির উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়ে শিল্প বিকাশে অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়। কে এস শেলভাঙ্কর যথার্থই বলেছেন যে ভারতীয় সামন্ততন্ত্র ছিল আর্থিক এবং সামরিক বৈশিষ্ট্যের। এটা ভূমি মালিকানাভিত্তিক ছিল না।
সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থার মধ্যে বর্ণপ্রথা এক অনন্য বিশেষত্ব (উদ্ধৃত, খান, ১৯৭৩:৯৬)। বর্ণপ্রথা এক চরম অস্থিতিস্থাপক সমাজ ব্যবস্থা যা ভারত ও পারিপার্শ্বিক অঞ্চলে লক্ষণীয় হলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সমাজ ব্যবস্থাও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। হিন্দু সমাজের আচার, প্রথা ও উৎসব ইত্যাদি মূল্যায়ন করে অননর উঁননঁরং বলেন যে, বর্ণপ্রথা প্রাচীন সভ্যতাসমূহের ব্যাপক অংশে পরিলক্ষিত হয়। অনুরূপভাবে ম্যাক্স মুলার বর্ণপ্রথা সম্পর্কে বলেন যে মূল্যবোধের বিভিন্নতা, রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদিতা এবং পেশাগত বিশেষত্বই এ ব্যবস্থার মূলভিত্তি (উদ্ধৃত খান, ১৯৭৩)।
বর্ণপ্রথার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা পাওয়া বা দেয়া দুরূহ ব্যাপার। ‘জাতি’ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের হিন্দু প্রথাকে পর্তুগিজগণ এ নাম দিয়েছিল। বিভিন্ন মনীষী ও প-িতগণ বর্ণপ্রথার যে সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছেন তা মূলত বর্ণপ্রথার বিবরণ বা ব্যাখ্যা মাত্র। এঁরুড়ঃ-এর মতে “বর্ণপ্রথা মূলত বংশগত; এটা পরিস্থিতি ও সুপ্ত ক্ষমতাকে পিতার নিকট হতে পুত্রের নিকট হস্তান্তরের ব্যবস্থা। যেখানে বংশগত পরিস্থিতি নেই তথায় বর্ণপ্রথা অচল।” জরংষবু বর্ণপ্রথার তিনটি শর্তের উল্লেখ করেছেন : (ক) বাইরের কোনো পেশা গ্রহণ হতে বিরত থাকা; (খ) বাইরের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা হতে বিরত থাকা; (গ) পূর্বপুরুষের পেশায় অটল থাকা। খান (১৯৭৩) জেমস মিলের সংজ্ঞা উদ্ধৃত করে বলেন, “কোনো সমাজের সদস্যদিগকে শ্রেণি ও পর্যায়ে কতিপয় কাজ সম্পাদনের জন্য, কতিপয় সুযোগ ভোগের জন্য বা কতিপয় বোঝা বহনের জন্য বিভক্ত করা এবং এই স্তর বিভক্তিকে বংশগত রূপদান করা, পিতার নিকট হতেই পিতার অনুরূপ কাজ, সুবিধা লাভের অধিকার ও বোঝা বইবার দায় সন্তান ঘাড়ে নেয়, সে শুধু নিজের গোত্রেই বিবাহ করতে পারে, বর্ণ মিশ্রণ বা সংকর তথায় অচল, যুগে যুগে উত্তরাধিকারসূত্রে এই ধারা বয়ে চলবে।” ইষঁহঃ বর্ণপ্রথার সংজ্ঞায় বলেন যে এটা অন্তর্বিবাহ গ্রুপ, একই সাধারণ নামে পরিচিত, এই সদস্যপদ বংশগত; সামাজিক চলাফেরা এবং মেলামেশার ব্যাপারে সদস্যদের মধ্যে কতিপয় বিধিনিষেধ বলবৎ করে, হয় তারা একই সাধারণ ঐতিহ্যগত পেশায় নিয়োজিত অথবা একই মূল উৎসে সম্পর্কযুক্ত এবং তারা সকলে মিলে একটি সমজাতীয় বা সমপ্রকৃতির সমাজ গঠন করে (ব্লান্ট, ১৯৪৬; উদ্ধৃত খান, ১৯৭৩:৯৭)
ঈধংঃব শব্দটি একই সাথে স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজ ভাষা থেকে উদ্ভব ঘটেছে। স্প্যানিশ ভাষায় ঈধংঃধ অর্থ প্রজনন, জন্ম (ইৎববফ) প্রজাতি বা বংশ (খরহবধমব)। পর্তুগিজ ভাষার ঈধংঃব অর্থ বর্ণ বা জাতি বা প্রজনন, তথা বংশগত গুণাবলির ধারা। প্রথম হিন্দুস্তানি অর্থে বর্ণপ্রথা হিসেবে ঈধংঃব প্রত্যয়টি ব্যবহার করা হয় পর্তুগিজ ভাষাতেই। সংস্কৃত ভাষায় ‘বর্ণ’ বলতে বোঝানো হয় বর্ণ, জাতি, নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিবর্গের সমষ্টি। সাধারণভাবে বলা যায় যে বর্ণপ্রথা এমন একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থা যা হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে যেখানে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা (ংড়পরধষ ংঃধঃঁং) এবং পেশা জন্মসূত্রে নির্ধারিত হয় যা মোটামুটি অপরিবর্তনীয় বলে বিবেচিত হয়। ভারতীয় নৃতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ স্যার হারবার্ট রিজলে মনে করতেন, ‘‘ঈধংঃব রং ধ পড়ষষবপঃরড়হ ড়ভ ভধসরষরবং, নবধৎরহম ধ পড়সসড়হ হধসব, পষধরসরহম ধ পড়সসড়হ ফবপবহঃ, ভৎড়স ধ সুঃযরপধষ ধহপবংঃড়ৎ, যঁসধহ ধহফ ফরারহব, ঢ়ৎড়ভবংংরহম ঃড় ভড়ষষড়ি ঃযব ংধসব যবৎবফরঃধৎু পধষষরহম ধহফ ৎবমধৎফবফ নু ঃযড়ংব যিড় ধৎব পড়সঢ়বঃবহঃ ঃড় মরাব ধহ ড়ঢ়রহরড়হ ধং ভড়ৎসরহম ধ ংরহমষব যড়সড়মবহড়ঁং পড়সসঁহরঃু. (ঝযধহশধৎ, ২০০১:২৯০)। তিনি বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে বর্ণকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছেন। (ক) এমন কিছু পরিবারের সমষ্টি যাদের অভিন্ন পরিচিতিমূলক নাম থাকবে; (খ) যারা একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে বলে দাবি করে থাকে; (গ) উত্তরাধিকারসূত্রে একটি পেশার অধিকারী বলে মনে করে; (ঘ) তারা একটি অভিন্ন সম্প্রদায় বলে মত পোষণ করে থাকে।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার বর্ণপ্রথা সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন, ‘যখন ব্যক্তি এমন এক জনসমষ্টিতে জন্মগ্রহণ করে যেখানে তার সামাজিক মর্যাদা কঠোরতম রূপ। এ রকম স্তরবিন্যাসকেই বলা হয় বর্ণপ্রথা’ ‘‘ডযবহ ংঃধঃঁং রং যিড়ষষু ঢ়ৎবফবঃবৎসরহবফ ংড় ঃযধঃ সবহ ধৎব নড়ৎহ ঃড় ঃযবরৎ ষড়ঃ রিঃযড়ঁঃ ধহু যড়ঢ়ব ড়ভ পযধহমরহম রঃ, ঃযবহ ঃযব পষধংং ঃধশবং ঃযব বীঃৎবসব ভড়ৎস ড়ভ পধংঃব.” (গধপরাবৎ) তিনি মূলত দুইটি শর্তের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন- (১) এখানে ব্যক্তির মর্যাদা জন্মসূত্রের ওপর নির্ভরশীল; (২) ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা অপরিবর্তনীয়। অধ্যাপক এম এনশ্রীভিবাস অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে ‘বর্ণপ্রথা’ এই অর্থে একটি সর্বভারতীয় ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান জন্মসূত্রে নির্ধারিত। তবে এটা যে সর্বভারতীয় ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান জন্মসূত্রে নির্ধারিত। তবে এটা যে সর্বভারতীয় সে ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ আছে। কারণ ভারতের অনেক জাতির মধ্যে এটা নেই। যেমন শিখ, মুসলিম, বৈষ্ণব ইত্যাদি। আবার ভারতের বাইরে শ্রীলঙ্কা বা ইন্দোনেশিয়ার বর্ণহিন্দুরা এটা পালন করে থাকে।
অধ্যাপক ই এ এইচ ব্লান্ট মনে করেন, ‘‘ঈধংঃব রং ধহ বহফড়মধসড়ঁং মৎড়ঁঢ়ং, নবধৎরহম ধ পড়সসড়হ হধসব, সবসনবৎংযরঢ় ড়ভ যিরপয রং যবৎবফরঃধৎু, রসঢ়ড়ংরহম ড়হ রঃং সবসনবৎং পবৎঃধরহ ৎবংঃৎরপঃরড়হং রহ ঃযব সধঃঃবৎ ড়ভ ংড়পরধষ রহঃবৎড়পড়ঁৎংব, বরঃযবৎ ভড়ষষড়রিহম ধ পড়সসড়হ ঃৎধফরঃরড়হধষ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ড়ৎ পষধরসরহম ধ পড়সসড়হ ড়ৎরমরহ ধহফ মবহবৎধষষু ৎবমধৎফবফ ধং ভড়ৎসরহম ধ ংরহমষব যড়সবমবহড়ঁং পড়সসরঃু.” তিনিও কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে বর্ণকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছেন। সেগুলো নিম্নরূপ: (১) বর্ণ হল একটি অন্তর্বিবাহ গোষ্ঠী অর্থাৎ তাদের বিবাহ একই বর্ণগোষ্ঠীর মধ্যে হওয়া বাধ্যতামূলক; (২) যাদের একটি সাধারণ নাম রয়েছে যেমন উপাধ্যায়, ঠাকুর ইত্যাদি; (৩) দলের সদস্যপদ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত; (৪) সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে তাদের একটি দলগত নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে হয়; (৫) তাদের রয়েছে একটি গোষ্ঠীগত পেশা; (৬) তারা সাধারণত একটি একক জন্মসূত্র থেকে উদ্ভব বলে দাবি করে থাকে।
এন্ডারসন অ্যান্ড পারকার বর্ণপ্রথা বলতে বুঝিয়েছেন, ‘‘ঈধংঃব রং ঃযধঃ বীঃৎবসব ভড়ৎস ড়ভ ংড়পরধষ পষধংং ড়ৎমধহরুধঃরড়হ রহ যিরপয ঃযব ঢ়ড়ংরঃরড়হ ড়ভ রহফরারফঁধষং রং ঃযব ংঃধঃঁং যরবৎধপযু রং ফবঃবৎসরহবফ ফবংপবহঃ হধফ নরৎঃয.” (অহফবৎংড়হ ধহফ চধৎশবৎ)। তিনিও এটাকে অত্যন্ত কঠোরতম শ্রেণি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে এখানে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান অপরিবর্তনীয়রূপে উত্তরাধিকার এবং জন্মসূত্রে নির্ধারিত হয়। সমাজবিজ্ঞানী জি এ লুন্ডবার্গ মনে করতেন বর্ণপ্রথা হচ্ছে ‘‘অ পধংঃব রং সবৎবষু ধ ৎরমরফ ংড়পরধষ পষধংং রহঃড় যিরপয সবসনবৎং ধৎব নড়ৎহ ধহফ ভড়ৎস যিরপয ঃযবু পধহ রিঃযফৎধি ড়ৎ বংপধঢ়ব ড়হষু রিঃয বীঃৎবসব ফরভভরপঁষঃু.” (এঅ খঁহফনবৎম)। তিনি প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ বর্ণ ব্যবস্থার কড়াকড়ি এত বেশি অপরিবর্তনীয় যে দুএকটি চরম ক্ষেত্র ছাড়া যে যেই বর্ণে জন্মগ্রহণ করেছে সে বর্ণ পরিবর্তন করতে দেখা যায় না। অর্থাৎ যে একবার যে বর্ণের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়েছে অথবা জন্মেছে তার পক্ষে সেটাই তার ভাগ্যনির্ধারিত বলে ধরে নিতে হবে। এখান থেকে বের হবার বিশেষ কোনো পথ খোলা আছে বলে কারো জানা নেই। অনুরূপভাবে সমাজবিজ্ঞানী আরনল্ড গ্রিন একই মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে ‘‘ঈধংঃব রং ধ ংুংঃবস ড়ভ ংঃৎধঃরভরপধঃরড়হ রহ যিরপয সড়নরষরঃু, ঁঢ় ধহফ ফড়হি ঃযব ংঃধঃঁং ষধফফবৎ, ধঃ ষবধংঃ রফবধষুষু সধু হড়ঃ ড়পপঁৎ.” (অৎহড়ষফ এৎববহ)। তিনি মনে করেন অন্তত তত্ত্বগতভাবে কোনো প্রকার সামাজিক গতিশীলতার অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ অপরিবর্তনীয় যে সামাজিক স্তরবিন্যাস যেখানে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রায় কোনো সম্ভাবনা নেই সেটাকে বলা হয় বর্ণপ্রথা। বর্ণপ্রথা হৃদয়ঙ্গম করতে হলে হিন্দু ধর্মের কিছু প্রত্যয় সম্পর্কে ধারণা পেতে হবে। অধ্যাপক এম এন শ্রীনিবাস উল্লেখ করেছেন, ‘ধর্ম’ এবং ‘কর্মের’ ধারণার সাথে বর্ণের ধারণা যুক্ত। ধর্ম নির্ধারণ করে ব্যক্তির কর্মপ্রণালী এবং মর্যাদা। ব্যক্তি কর্ম করে। ধর্মের (অবশ্যই হিন্দু ধর্ম) ব্যাখ্যা হচ্ছে ভগবান তাঁর মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, আর বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য আর পা থেকে শূদ্র সৃষ্টি করেছেন তাই তাদের কর্মও হবে অনুরূপ। অর্থাৎ সর্বোচ্চ সম্মানজনক কাজ করবে ব্রাহ্মণ অর্থাৎ পঠন-পাঠন আর ধর্মচর্চা। আর বাহু মানুষকে প্রতিরক্ষা দেয় তাই ক্ষত্রিয় করবে যুদ্ধ আর রাজ্য শাসন। ঊরু এবং পা শরীরের উপরের দুই অংশকে ধারণ করে তাই নিচের দুই অংশের কাজ হবে উপরের অংশকে কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি দেওয়া। তাই সমাজের ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে নিচের দুই অংশের সকল শ্রমসাধ্য কাজের দায়দায়িত্ব নেওয়া। তাই উৎপাদন এবং শ্রম দানের কাজ করবে নিচের দুই শ্রেণি। এখানে পবিত্রতা এবং অপবিত্রতার ধারণাও বিদ্যমান। অর্থাৎ অপবিত্র কর্ম করে বলেই তিনি অপবিত্র বা নীচ জাতভুক্ত। একজন মেথর সে সমাজের সকল আবর্জনা পরিষ্কার করে তাই সে চার বর্ণের নিচে। আর একজন দেবতাদের মুখ নিঃসৃত বাণী পাঠ করেন তাই তিনি দেবতাদের মতোই উচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্ত। উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে বর্ণপ্রথায় প্রধান চারটি বর্ণের অস্তিত্ব লক্ষণীয়। এগুলি হল (১) ব্রাহ্মণ : এরা সমাজে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। এদের প্রধান পেশা হল পৌরোহিত্য এবং জ্ঞানচর্চা করা; (২) ক্ষত্রিয় : এরা হল সমাজের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী, যাদের কাজ মূলদ দেশরক্ষা এবং যুদ্ধ করা; (৩) বৈশ্য : এরা সমাজের তৃতীয় মর্যাদা স্তরের অধিকারী। যারা মূলত ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত; (৪) শূদ্র : এরা বর্ণপ্রথার সর্বনিু স্তরে অবস্থান করে। এদের প্রধান পেশা উপর্যুক্ত তিনটি বর্ণের সেবা করা। এছাড়াও সমাজে আরো একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে যারা অস্পৃশ্য (টহঃড়ঁপযধনষব) বলে পরিচিত। বর্ণপ্রথায় এদের কোনো সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতি নেই।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বিদ্যমান বর্ণপ্রথার কতিপয় বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়যা নিুরূপ:
(১) বর্ণপ্রথা ধর্মভিত্তিক : এ ব্যবস্থা ধর্মগ্রন্থ ও শাস্ত্রাদি অনুমোদিত;
(২) জন্ম জাতির নির্ধারক : অর্থাৎ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নিলে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ পরিবারে জন্ম নিলে কায়স্থ;
(৩) অন্তর্বিবাহ ব্যবস্থা : বিবাহ একই জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। উচুঁ-নিচু জাতির মধ্যে বিবাহ রীতিবিরুদ্ধ বলে গণ্য হয়।
(৪) জন্মসূত্রে পেশা নির্ধারিত হয় : অর্থাৎ যে জাতি বর্ণে জন্ম হবে সেই জাতি বর্ণের জন্য নির্ধারিত পেশা গ্রহণ করতে হবে।
(৫) সামাজিক আচার আচরণ : বিভিন্ন জাতির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানাবিধ বিধিনিষেধ বিদ্যমান। নিু জাতির লোকের রান্না করা খাবার উচ্চ জাতের গ্রহণ করা নিষেধ। এ ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনে ধরাছোঁয়া, কথা বলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরূপ অসংখ্য বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। যা ভঙ্গ করলে জাতিচ্যুত হবার সম্ভাবনা আছে।
(৬) বর্ণপ্রথা এক ধরনের বদ্ধ ব্যবস্থা : এখানে স্বঅর্জিত গুণাবলির দ্বারা জাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। নিুবর্ণের লোক ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে কিন্তু তারা তাদের জাতির নির্ধারিত সামাজিক মর্যাদার অতিরিক্ত উচ্চবর্ণের মর্যাদা পাবে না। অর্থাৎ এ ব্যবস্থায় সামাজিক গতিশীলতা নেই।
বর্তমানে ভারতবর্ষে জাতির সংখ্যা কত তার সঠিক সংখ্যা অজানা। প্রতিটি জাতি বহু উপজাতিতে বিভক্ত রয়েছে। জাতিভেদ প্রথার আচার আচরণ এবং বৃত্তিতে শুদ্ধি অশুদ্ধির মানদ-ে জাতিতে জাতিতে পার্থক্য করা হয়। ফলে নিু জাতির আচার আচরণ, রীতিনীতি অনুকরণে সচেষ্ট হয় এবং এ অনুকরণ মাত্রার সক্ষমতার ভিত্তিতে ব্যক্তি বা পরিবার বিশেষ স্বতন্ত্রতা অর্জন করে। এরূপ সম্ভাবনাপন্ন ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে উপজাতির সৃষ্টি হয়। যেমন নিরামিষ আহার করে নিজেদের পরিমার্জিত এবং পরিশুদ্ধ করে সমগোত্রীয়দের সঙ্গে বিবাহদি ও অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরূপ নানাবিধ শুদ্ধি অশুদ্ধিব্যঞ্জক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অনেক উপজাতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই বলা যায় যে বর্ণপ্রথা এমন এক জটিল ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের সমাজ ব্যবস্থা যা ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে বিদ্যমান আছে। এ নিয়ে পরবর্তীতে অল্পবিস্তর আলোচনা করা হবে।
সামাজিক শ্রেণি ও মর্যাদা ঃ সামাজিক শ্রেণি কার্যত এমন এক মানবগোষ্ঠী যা ধর্ম অথবা আইনের দ্বারা সংজ্ঞায়িত নয়। সামাজিক শ্রেণি ধনতান্ত্রিক শিল্প সমাজের বৈশিষ্ট্য যেখানে সম্পত্তি তথা উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা সামাজিক শ্রেণি নির্ধারকের একমাত্র চলক বা মানদ-। সম্পত্তির মালিকানা ও সামাজিক দূরত্বই (ঝড়পরধষ উরংঃধহপব) সমাজে ব্যক্তির অভিন্ন সামাজিক মর্যাদা ও তার শ্রেণি সামাজিক শ্রেণি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে। অভিন্ন পদমর্যাদার অধিকারী সকল সদস্যই এক শ্রেণিভুক্ত। প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (গধী ডবনবৎ) উপর্যুক্ত ধারণায় সামাজিক শ্রেণি চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেন যে একই ধরনের সামাজিক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত ও একই ধরনের জীবনমান সম্পন্ন লোকদের নিয়ে একটি শ্রেণি গড়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদের প্রবক্তা জার্মান মনীষী কার্ল মার্কস মনে করেন যে অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়া সামাজিক শ্রেণির অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না। কারণ আধুনিক শিল্প সমাজে মূলত অভিন্ন শ্রেণীস্বার্থ নিয়েই এক একটি সামাজিক শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। প্রত্যেক সমাজে পরস্পরবিরোধী দুটি শ্রেণি বিদ্যমান যারা নিজ নিজ স্বার্থে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। যেমন পুঁজিবাদী সমাজে বুর্জোয়া ও সর্বহারা এ দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। বুর্জোয়ারা উৎপাদন উপকরণসমূহের মালিক এবং সর্বহারাগণ এ মালিকানাবঞ্চিত। একমাত্র দৈহিক শ্রমই সর্বহারাদের প্রধান সম্বল যা তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য শোষক বুর্জোয়াদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। রাশিয়ার বিখ্যাত দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ বোখারিন মার্কসের মতবাদকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হিসেবে গণ্য করে দেখিয়েছেন যে আর্থিক ব্যবস্থা ছাড়াও সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক তথা সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থাতেই সামাজিক শ্রেণির অস্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। ম্যাক্স ওয়েবারের অনুসারী সমাজবিজ্ঞানীগণ মনে করেন যে মানুষ উত্তরাধিকারসূত্রে ও নিজ চেষ্টায় প্রতিষ্ঠা ও পদমর্যাদা লাভ করেযার ভিত্তিতে সমাজে সামাজিক প্রতিষ্ঠার একটা উচুঁ-নিচু ধরণের শ্রেণি কাঠামো গড়ে ওঠে। এ ব্যবস্থা মানুষের জীবনের সম্ভাবনাগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। শুধু বেঁচে থাকাই নয়, জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ এবং সমাজে বিদ্যমান সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগের সামর্থ্যও এর অন্তর্ভূক্ত। শ্রেণি কাঠামো অনুযায়ী ব্যক্তির আয় বৈষম্য রয়েছে, যা এসব সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করে। সকল শ্রেণির মানুষ এসব সুযোগ-সুবিধা সমভাবে ভোগ করতে পারে না।
সামাজিক শ্রেণির বৈশিষ্ট্য : সামাজিক শ্রেণির বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক শ্রেণিকে অধিকতর বোধগম্য করা যায় :
মুক্ত ব্যবস্থা : মুক্ত ব্যবস্থা বলতে বুঝানো হয় যে ব্যক্তি নিজ যোগ্যতায় প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জন করে সমাজের যে কোনো শ্রেণি মর্যাদায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে বা নিজ শ্রেণির অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। সামাজিক কোনো বিধিবিধান এক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না।
 অর্থনৈতিক ভিত্তি : অর্থনীতি হল শ্রেণির মূল ভিত্তি। শ্রেণি মূলত শিল্প সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা সপ্তদশ শতক থেকে ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে।
পেশার নির্ধারক : শ্রেণি ব্যবস্থায় সমাজে ব্যক্তির পেশা নির্ধারিত হয় তার নিজ প্রচেষ্টায় অর্জিত গুণাবলি ও যোগ্যতা দ্বারা। এক্ষেত্রে পৈতৃক বা পূর্বপুরুষের পেশা বা পদবি তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না।
সামাজিক গতিশীলতা : শ্রেণি ব্যবস্থা একটি মুক্ত ব্যবস্থা বিধায় এখানে ব্যক্তি নিজ যোগ্যতা ও অর্জিত গুণাবলির দ্বারা তার সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন করার সুযোগ পায়। নিু সামাজিক শ্রেণি মর্যাদার অধিকারী কোনো পরিবারের সন্তান উচ্চতর সামাজিক মর্যাদানুসারী শ্রেণির যোগ্যতা ও গুণাবলি অর্জন করে তার নিুতর সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন করে উচ্চতর সামাজিক অবস্থান অর্জন করতে পারে। যেমন কেরানি বা কৃষকের ছেলের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। একইভাবে কোনো ব্যক্তি তার পারিবারিক উচ্চতর মর্যাদার শ্রেণি অবস্থান অনুরূপ উচ্চতর যোগ্যতা ও গুণাবলি অর্জনে ব্যর্থ হলে তার উচ্চতর সামাজিক শ্রেণি অবস্থান নিুতর শ্রেণি অবস্থানে পরিবর্তিত হয়। যেমন ডাক্তার, উকিলের    সন্তানের কেরানির পেশা গ্রহণ।      
বহির্বিবাহ : শ্রেণি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কোনো বিবাহ রীতি বা বিধিবিধান নেই। এখানে মূলত বহির্বিবাহ ব্যবস্থাই প্রধান। ব্যক্তি নিজ ইচ্ছায় পছন্দমতো বিয়ে করতে পারে। বর-কনের পারিবারিক শ্রেণি অবস্থান তেমন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।
সামাজিক শ্রেণির শ্রেণিবিভাগ : কার্ল মার্কস সম্পত্তির মালিকানার ভিত্তিতে সামাজিক শ্রেণিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন-(১) মালিক শ্রেণি (ঙহিবৎ ঈষধংং) : এরা উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণের মালিক, যাদের মার্কস বুর্জোয়া নামে অভিহিত করেছেন। এ মালিকানার বদৌলতে মালিক শ্রেণি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত যাবতীয় পণ্য সামগ্রীর মালিক হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় নির্বাহের পরে যা অবশিষ্ট থাকে তা লভ্যাংশ (চৎড়ভরঃ) হিসেবে মালিক শ্রেণি নিজেদের পকেটস্থ করে নেয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত অন্যান্য ব্যক্তি (যারা মালিকানা বঞ্চিত) এ লভ্যাংশ হতে বঞ্চিত হয়। (২) মালিকানাবিহীন শ্রেণি (ঘড়হ ঙহিবৎ ঈষধংং) : এ শ্রেণি উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদন শক্তি তথা উপকরণসমূহের মালিকানা হতে বঞ্চিত। যারা মার্কসের ভাষায় সর্বহারা শ্রেণি। মালিকানার এ বঞ্চনার ফলে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর ওপর এদের কোনো অধিকার বর্তায় না বিধায় এক্ষেত্রে প্রাপ্ত লভ্যাংশ হতেও এরা বঞ্চিত। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার এরূপ সম্পর্কের কারণেই কার্ল মার্কস মালিক তথা বুর্জোয়াদের শোষক এবং মালিকানাবিহীন সর্বহারাদের শোষিত বলে উল্লেখ করেছেন।
ম্যাক্স ওয়েবার সামাজিক শ্রেণিকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন। এগুলি হল : (১) উচ্চবিত্ত শ্রেণি (টঢ়ঢ়বৎ ঈষধংং); (২) মধ্যবিত্ত শ্রেণি (গরফফষব ঈষধংং); (৩) নিম্নবিত্ত শ্রেণি (খড়বিৎ ঈষধংং)। ওয়েবার মূলত মার্কস বর্ণিত মালিক ও মালিকানাবিহীন শ্রেণিকে বোঝাতে যথাক্রমে উচ্চবিত্ত শ্রেণি ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি প্রত্যয় দুটি ব্যবহার করেছেন যা সম্পদের মালিকানার সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব এবং বিকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন। যে কারণে তিনি মার্কসের বিরুদ্ধবাদী সমালোচক বলে পরিচিতি পান। মার্কস মধ্যবিত্ত শ্রেণির অস্তিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে এক অবয়বহীন (অসড়ৎঢ়যড়ঁং) গোষ্ঠী বলে উল্লেখ করেছেন। মার্কসের মতে এ অবয়বহীন গোষ্ঠী বুর্জোয়া শোষক শ্রেণির শোষণের ফলে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। ফলে তারা তাদের পুঁজি হারিয়ে সর্বহারাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। স্বল্প সংখ্যক এ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারলেও তারা মধ্যবিত্ত না থেকে বুর্জোয়া শোষক শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত হয়ে শোষক শ্রেণিতে পরিণত হয়। যা হোক, নিুে ওয়েবার ও অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
প্রাগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল বিংশ শতাব্দীতে পেশাগত কাঠামোয় (ঙপপঁঢ়ধঃরড়হধষ ঝঃৎঁপঃঁৎব) পরিবর্তন এবং পেশা হিসেবে বাবুকাজের (ডযরঃব ঈড়ষষধৎ) উদ্ভব ও বিকাশ। নতুন উদ্ভাবিত এ পেশাটি ক্রমপ্রসারমাণ এবং ধীরে ধীরে তা এক বৃহৎ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, যাকে সমাজবিজ্ঞানীগণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সমাজে এ মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির অবস্থান হল উচ্চবিত্ত শ্রেণি এবং নিুবিত্ত শ্রেণির মধ্যবর্তী অবস্থানে। এ গোষ্ঠীকে কোনো কায়িক শ্রম দিতে হয় না বিধায় তাদের পেশাকে বাবুকাজ বলা হয়। মূলত পুঁজিবাদী শিল্প সমাজে শিল্প এবং ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটায় তা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনায় বিশেষ শিক্ষায় শিক্ষিত ও যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। একইভাবে বর্তমান কল্যাণ রাষ্ট্রে (ডবষভধৎব ঝঃধঃব) স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক জনকল্যাণকর সেবা দেয়া হয় (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, নিরাপত্তা, জনপ্রশাসন)। ফলে স্থানীয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যেমন ব্যাপক প্রসার ঘটেছে তেমনি তাতে জটিলতাও বেড়েছে। সুষ্ঠুভাবে এসব কাজ সম্পাদনের জন্য এক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং জ্ঞানসম্পন্ন বিজ্ঞ কর্মচারী ও কর্মকর্তা আবশ্যক। সামাজিক এ বাস্তবতায় কেরানিকুল, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশার পেশাজীবী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে- যাদের সম্মিলিতভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলে গণ্য করা হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে যা নিুরূপ।
(১) উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি : উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলতে মূলত পেশাজীবীগণকে বোঝানো হয় যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন। যেমন : (ক) ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার এবং এক্ষেত্রে জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত জ্ঞানের অধিকারী হিসাবরক্ষক কর্মকর্তার উদ্ভব ঘটে। একইভাবে এসব সংস্থার আইনগত জটিলতা এবং তা সমাধানের জন্য সেখানে আইনজীবীদের আগমন লক্ষণীয়। (খ) শিল্প-কারখানার প্রসার এবং তার সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞাননির্ভর দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রকৌশলীর প্রয়োজন হয়। (গ) স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রের সেবামূলক কর্মকা- প্রসারের ফলে ডাক্তার, শিক্ষকসহ প্রশাসনের আমলাতন্ত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।
পেশাজীবীগণ উচ্চ এবং নিম্নস্তরের পেশাজীবী হিসেবে দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত : (ক) বিচারপতি, আইনজীবী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, হিসাবরক্ষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ইত্যাদি পেশাজীবী হল উচ্চগোষ্ঠীভুক্ত। (খ) স্কুলশিক্ষক, নার্স, সমাজকর্মী, লাইব্রেরিয়ান ইত্যাদি পেশাজীবী নিু গোষ্ঠীভূক্ত।
(২) নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি : কেরানিকুল এবং বিক্রয় কর্মচারী এরা নিু মধ্যবিত্ত শ্রেণিভূক্ত। শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সেবামূলক কাজের প্রসার এবং আরো অন্যান্য কর্মকা- প্রশাসনিক কাঠামোকে ক্রমাগত জটিল করে তুলছে। ফলে সুষ্ঠু এবং গতিশীল কাঠামোর স্বার্থেই পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক সমাজে এরূপ নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
অ্যান্থনি গিডেন্সও ওয়েবারের ন্যায় পুঁজিবাদী সমাজে তিনটি শ্রেণির কথা উল্লেখ করেছেন- (১) উচ্চ শ্রেণি (টঢ়ঢ়বৎ ঈষধংং) : এরা মূলত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপাদন উপকরণের মালিক। (২) মধ্যবিত্ত শ্রেণি (গরফফষব ঈষধংং) : এরা হল মূলত সাধারণ ও প্রযুক্তিবিদ্যায় শিক্ষিত পেশাজীবী শ্রেণী। (৩) শ্রমিক শ্রেণি (ডড়ৎশরহম ঈষধংং) : এ শ্রমিক শ্রেণি হল দৈহিক শ্রমশক্তির অধিকারী যারা জীবিকা অর্জনের জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মজুরির বিনিময়ে তাদের শ্রম বিক্রি করে।
এছাড়াও বিভিন্ন সমাজে, বিশেষ করে কৃষিনির্ভর সমাজে যে ব্যাপক কৃষককুলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় তারা এ আলোচনায় সচরাচর অনুল্লিখিত থেকে যায়। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে শ্রেণি আলোচনার অন্তর্ভূক্ত করেছেন (ঞবড়ফড়ৎ ঝযধহরহ, ঐধসুধ অষধার)। কৃষিজীবী শ্রেণি বলতে মূলত কৃষক সমাজকেই (চষবধংধহঃ ঝড়পরবঃু) বোঝানো হয়ে থাকে। প্রযুক্তি এবং সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনের ফলে কৃষি উৎপাদনে মুনাফাকেন্দ্রিক উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। এখানে ভোগকেন্দ্রিক উৎপাদনের সমান্তরালে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্পর্কও বিকশিত হচ্ছে। ফলে এক্ষেত্রেও শ্রেণি সম্পর্কের উপস্থিতি লক্ষণীয় যেখানে ভূমি মালিক শ্রেণি এবং কৃষি শ্রমিক শ্রেণির বিকাশ ঘটছে। যারা জমিজমাসহ উৎপাদনের উপকরণ তথা পুঁজির মালিক তারা কৃষক বা মালিক শ্রেণি। আর যাদের জমি তথা কোনো উপকরণের মালিকানা নেই কিন্তু কৃষিতে শ্রম দেয় তারা কৃষি শ্রমিক বা শ্রমিক শ্রেণি হিসেবে পরিগণিত।
মর্যাদা গোষ্ঠী ঃ এ আলোচনার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছিল সামাজিক স্তরবিন্যাস আলোচনায় মর্যাদা গোষ্ঠী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় হিসেবে বিবেচিত। মর্যাদা গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায় তার আগে জানতে হবে মর্যাদা বলতে কী বোঝানো হয়। সমাজে ব্যক্তি যে ভূমিকা পালন করে তার থেকে ব্যক্তির মর্যাদা অর্জিত হয়। মর্যাদা বিষয়টি সমাজের গোষ্ঠীগত আচরণের সাথে সম্পর্কিত। গোষ্ঠীগত যে আন্তঃসম্পর্ক (ওহঃবৎধপঃরড়হ) তাই সমাজের সদস্য হিসেবে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ করে। ব্যক্তির কাছে সমাজের একটি কাঙ্খিত আচরণরীতি রয়েছে। যেটা সবাই তার কাছে আশা করে। এটি তার মর্যাদা থেকে উদ্ভূত। যেমন সমাজে বলা হয়, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে তার এ কাজ করা ঠিক হয়নি।’ হয়তো শিক্ষক না হয়ে অন্য কেউ হলে এরকম বলা হত না অর্থাৎ এখানে প্রত্যাশিত আচরণের ব্যত্যয় ঘটেছে। এটি ব্যক্তির মর্যাদার নির্দেশক। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বিয়ার্সটেড বলেন, ‘‘অ ংঃধঃঁং রং ংরসঢ়ষু ধ ঢ়ড়রংঃরড়হ রহ ধ ংড়পরবঃু ড়ৎ রহ ধ মৎড়ঁঢ়.....ঃযব ংঃধঃঁং রং ঃযব ঢ়ড়ংরঃরড়হ ধভভড়ৎফবফ নু মৎড়ঁঢ় ধভভরষরধঃরড়হ, মৎড়ঁঢ় সবসনবৎংযরঢ়, ড়ৎ মৎড়ঁঢ় ড়ৎমধহরুধঃরড়হ. ওঃ রং ংবঃ রহ ঃযব ংঃৎঁপঃঁৎব ড়ভ ঃযব মৎড়ঁঢ় ড়ৎ ড়ভ ঃযব ংড়পরবঃু নবভড়ৎব ধ মরাবহ রহফরারফঁধষ পড়সবং ধষড়হম ঃড় ড়পপঁঢ়ু রঃ” (ইরবৎংঃবফঃ, ঞযব ঝড়পরধষ ঙৎফবৎ).
পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছিল ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থান নির্ধারিত হয় সম্পত্তি বা সম্পদের মালিকানা থেকে। আর ব্যক্তির মর্যাদা অর্জিত হয় সমাজে সম্পদের ভোগ থেকে। অর্থাৎ কার কত সম্পত্তি বা সম্পদ আছে তা থেকে নির্ধারণ করা হয় ব্যক্তি কোন শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত। ব্যক্তি কী মাত্রায় বা কী পরিমাণে সম্পদ ভোগ করে তা থেকে নির্ধারণ করা হয় সে কোন মর্যাদাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। অর্থাৎ ব্যক্তির জীবন প্রণালী তার সামাজিক মর্যাদার প্রতিফলন ঘটায়। যদিও শ্রেণির সাথে মর্যাদার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কিন্তু শুধু সম্পদের মালিকানা দিয়ে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যায় না। কারণ কোনো সমাজে একজন ব্যবসায়ী সাধারণত যে পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে থাকে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমপরিমাণ সম্পদ ভোগ না করলেও সমাজে তার অবস্থান ভিন্নতর। এই ভিন্নতা তার মর্যাদাগত অবস্থান নির্দেশ করে। ব্যক্তির সামাজিক শ্রেণি নির্ধারিত হয় তার কী পরিমাণ সম্পত্তি তথা উৎপাদন উপকরণের মালিকানা আছে তার ভিত্তিতে আর ব্যক্তির জীবন প্রণালী দ্বারা (খরভব ঝঃুষব) তার সামাজিক মর্যাদা প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশে সামাজিক স্তরবিন্যাসের ধরন ঃ সমাজবৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি পরিষ্কার থাকা দরকার তা হল কোন তাত্ত্বিক কাঠামোতে স্তরবিন্যাস আলোচনা করা হবে। যদি মার্কসীয় (কধৎষ গৎী) শ্রেণি কাঠামোর আলোকে আলোচনা করা যায় তাহলে এক ধরনের ফলাফল পাওয়া যাবে আবার ওয়েবারিয়ান (গধী ডবনবৎ) তত্ত্বের আলোকে আলোচনা করা যায় তাহলে অন্য ধরনের ফলাফল পাওয়া যাবে। মার্কসীয় তত্ত্বে সামাজিক শ্রেণি বা সামাজিক স্তরবিভাগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকারে থাকা সম্পত্তি বা সম্পদকেই (চৎড়ঢ়বৎঃু) একমাত্র মানদ- বিবেচনা করে সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে ওয়েবারিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পদ বা সম্পত্তির সাথে সাথে ক্ষমতা (চড়বিৎ) এবং মর্যাদাকে (ঝঃধঃঁং) মানদ- বিবেচনা করে স্তরবিন্যাস সংজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে। বর্তমান সমাজের স্তরবিন্যাস আলোচনার ক্ষেত্রে একটি মিশ্র তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ অনুসরণ করা বাস্তবসম্মত হবে। কারণ বাংলাদেশ যেমন পূর্ণ শিল্পায়িত সমাজও নয় আবার পূর্ণ কৃষি সমাজও নয়। অথচ উপরে উল্লিখিত দুটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল ইউরোপের শিল্প সমাজের প্রেক্ষাপটে। সুতরাং এ আলোচনায় কয়েকটি বিশেষ মানদ-ের আলোকে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশি সমাজের সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আরো দুটি বিষয় স্মরণযোগ্য তা হল, (১) স্তরবিন্যাস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ আলোচনা করতে হবে এবং (২) বাংলাদেশের দুই প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠী মুসলিম এবং হিন্দু সমাজের স্তরবিন্যাস পৃথকভাবে আলোচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাসের উপাদান ঃ প্রথমে কোন কোন মানদ-ের আলোকে সামাজিক স্তরবিন্যাস নির্ণয় করা হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন প্রক্রিয়াও আলোচনা করতে হবে। কারণ কিছু জরুরি তথ্য জানা না থাকলে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান এবং মর্যাদা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের ২৮ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে যারা অকৃষি পেশানির্ভর আর গ্রামের ৭২ শতাংশ মানুষ যাদের এক বিরাট অংশ দ্রুত অকৃষিজ পেশাকে প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করছে (বিবিএস, ২০০৮)। বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনের ১৮.৮৮ শতাংশ আসে কৃষি থেকে অথচ কৃষিতে নিয়োজিত আছে মোট জনশক্তির ৬৪ শতাংশ। জিডিপির ৫১ শতাংশ আসে সেবা খাত থেকে এবং ১৯ শতাংশ শিল্প খাত থেকে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০)। সুতরাং অকৃষি খাত ক্রমাগত জোরদার হচ্ছে এবং শিল্প ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মোট ৫১.০ মিলিয়ন শ্রমশক্তির (১৫ + বয়স) প্রায় ৭ মিলিয়ন জনশক্তি বিদেশে কর্মরত আছে যারা বছরে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে থাকে। এই শ্রমশক্তির প্রায় ৮ মিলিয়ন তৈরি পোশাক রফতানি কারখানায় কর্মরত যাদের প্রঅয় ৮০ শতাংশ নারী। বাংলাদেশে ১৯৯১-৯২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮.৮ শতাংশ, ২০০৫ সালে এটা ছিল ৪০.০ শতাংশ আর ২০১০ সালে এটা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে সাধারণ দারিদ্র্য ২৮.৬ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্য ১৯.৫ শতাংশ। যাদের প্রতিদিন আয় ২ মার্কিন ডলারের নিচে তাদেরকে দরিদ্র আর যাদের প্রতিদিন গড়ে ১ মার্কিন ডলারের নিচে তাদেরকে চরম দরিদ্র বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৬৮ শতাংশ এবং স্কুল গমনযোগ্য শিশুদের ৯৭.৬ শতাংশ স্কুলে যায়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩১টি সরকারি শ্রমশক্তির ৫.১ শতাংশ বেকার যার মধ্যে নারী ৭.৫ শতাংশ এবং পুরুষ ৪.৩ শতাংশ (বিবিএস, ২০০৮)। শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধির হার ২.৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে ১.৩৭ মিলিয়ন মানুষ। শ্রমশক্তির ২৮.৭ শতাংশ জনশক্তি আবার পূর্ণকালীন কর্মে নিয়োজিত নয় (টহফবৎ ঊসঢ়ষড়ুবফ) অর্থাৎ হয় তারা যোগ্যতার চেয়ে নিু কাজে নিয়োজিত অথবা বছরের পূর্ণ সময় তাদের কাজ থাকে না। যারা কর্মরত আছে তাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ বাবু (বৃদ্ধিবৃত্তিনির্ভর বা ডযরঃব ঈড়ষষধৎ ঔড়ন) পেশায় নিয়োজিত আর বাকিরা দৈহিক শ্রমনির্ভর পেশায় (ইষঁব ঈড়ষষধৎ ঔড়ন) নিয়োজিত আছে। মোট কর্মজীবী মানুষের মাত্র ২.৪ শতাংশ উচ্চতর পেশাদারি দক্ষতাসম্পন্ন এবং মাত্র ০.৫০ শতাংশ প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন পেশায় নিয়োজিত (শ্রম জরিপ, বিবিএস ২০০৯)।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে কৃষির ওপর নির্ভরশীল জনসংখ্যা প্রায় ৬৪ শতাংশ অথচ কৃষি থেকে আসে জিডিপির মাত্র ১৮.৮৮ শতাংশ। এটা অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত বহন করে। এক সময় বলা হত বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে জমির পুঞ্জীভবন একটি মারাত্মক সমস্যা বা শোষণের কারণ। কোনো কোনো পক্ষ ধারণা পোষণ করতেন জমি পুর্নবণ্টন করলেই সমাজে স্বর্গীয় সাম্য কায়ৈম হবে। এখন দেখা যাচ্ছে মানুষের দখলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত জমিজমা নেই। বাংলাদেশে মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১৭৭৭১৩৩৯ একর (বিবিএস, ২০০৮)। কৃষি পরিবারপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১.৫ একর আর মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ .১৫ একর মাত্র। মনে রাখতে হবে মোট পরিবারের ৩৩.৮২ শতাংশ অকৃষিজীবী আর ৬৬.১৮ শতাংশ হচ্ছে কৃষিজীবী পরিবার। আর মোট পরিবারের ৩৫.৯১ শতাংশ আবার কৃষি শ্রমজীবী। বাংলাদেশের ৫২.৮৫ শতাংশ পরিবারের গড় জমিজমার পরিমাণ .৫-২.৪৯ একর, এদেরকে বলা হয় ক্ষুদ্র কৃষক। মধ্য কৃষক হচ্ছে ১১.৬৫ শতাংশ যাদের পরিবারপিছু জমিজিরাতের পরিমাণ ২.৫০-৭.৪৯ একর। আর বড় কৃষক রয়েছে ১.৬৭ শতাংশ যাদের গড় জমিজমার পরিমাণ ৭.৫০ একরের বেশি। এদের মোট সংখ্যা ২৯৭৬৬৫, এদের মালিকানাধীন মোট জমিজমার পরিমাণ ৩৩২৭০৫০ একর বা পরিবার প্রতি ১১.১৭ একর বা ৩৩/৩৪ বিঘা। এ জন্যই এরিক জেনসেন বাংলাদেশকে ক্ষুদ্র কৃষকের দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন এবং জনসংখ্যার চাপে খামারগুলো দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে ফলে কার্যত বাংলাদেশে ভূমি পুর্নবণ্টনের মাধ্যমে সামাজিক অসমতা হ্রাসের তত্ত্ব এখন কন্ঠকল্পনা তত্ত্ব (টঃড়ঢ়রধহ ঞযবড়ৎু) বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে সামাজিক স্তরবিন্যাসের উপাদান বা নির্ধারকগুলি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এগুলি নিুরূপ :
* সম্পত্তির মালিকানা (ঙহিবৎংযরঢ় ড়ভ চৎড়ঢ়বৎঃু) : এর মধ্যে আছে জমির মালিকানা, কলকারখানা, ব্যবসাবাণিজ্য, ব্যাংক, বীমা, ব্যবসা এবং সকল ধরনের কর্পোরেট মালিকানা, নগত বা অন্যকোনোভাবে জমানো অর্থ, অন্য যেকোনো বস্তুর মালিকানা যারা বিনিময় মূল্য রয়েছে যেমন স্বর্ণ, রৌপ্যের খনি বা খনিজ পদার্থ ইত্যাদি।
ক্ষমতা (চড়বিৎ) : এটা নানাভাবে অর্জিত হয় যেমন রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ, কোনো সরকারি পদ যেমন মন্ত্রী, এমপি ইত্যাদি, কোনো সরকারি প্রশাসনিক পদ যেমন জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, আমলা ইত্যাদি, কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার পদ যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ইত্যাদি, কোনো পেশাজীবী সংগঠনের পদ যেমন শিক্ষক সমিতি, আইনজীবী সমিতি, ব্যবসায় সংগঠন, শ্রমিক বা মালিকদের সংগঠন, কোনো স্থানীয় সংস্থার পদ যেমন ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান ইত্যাদি।
* সামাজিক মর্যাদা (ঝড়পরধষ ঝঃধঃঁং) : বিষয়টি পরিমাপ করা বেশ জটিল। আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজবিজ্ঞানীগণ এটা পরিমাপের জন্য জীবনযাত্রার ধরনকে (খরভব ংঃুষব) সূচক হিসেবে নির্ধারণ করে থাকেন। কিন্তু জীবনযাত্রা পরিমাপ করা হবে কী দিয়ে। বিষয়টি আরো জটিল। কোনো কোনো তাত্ত্বিক মনে করেন জীবনযাত্রার ধরন জানা যেতে পারে ব্যয় নির্বাহের প্রণালী দিয়ে। যেমন ব্যক্তি কোথায় কেনাকাটা করেন অর্থাৎ চেইন শপিংমলে নাকি কাঁচাবাজারে। তিনি গাড়ি ব্যবহার করেন কি না, করলে কোন ব্রান্ডের, ব্র্যান্ডের সাথে মডেল পরিবতৃন হলে তিনি পরিবর্তন কিনা, প্রয়োজনীয় সেবা পাবার ক্ষেত্রে তার স্বাভাবিক প্রবেশ আছে কি না, থাকলে মানসম্মত সেবা গ্রহণ করতে পারেন কি না ইত্যাদি। সামাজিক মর্যাদা বিষয়টির সাথে সম্পদের মালিকানা এবং ক্ষমতা জড়িত তবে এর সাথে আরো কিছু বিষয় জড়িত। যেমন শিক্ষা, সামাজিক মেলামেশা, সামাজিক যোগাযোগ, বংশ মর্যাদা ইত্যাদি।
* শিক্ষা (ঊফঁপধঃরড়হ) : শিক্ষা একটি মাত্র নির্ধারক হলেও এর বহুবিধ মাত্রা আছে। যেমন কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জন করা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল, ব্যক্তি কত প্রজন্মে শিক্ষিত, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের শিক্ষার মান ও স্তর, ডিগ্রির মাত্রা, দেশের বাইরের ডিগ্রি, দেশের বাইরের ডিগ্রি হলে সেটা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা বা অইউরোপীয় দেশ কি না, ডিগ্রি কোন বিষয়ে, সমাজে তার চাহিদা, মানুষের চোখে তার মূল্য ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার মাধ্যমেই শিক্ষা একটি পরিমাপক হিসেবে গণ্য হয়।
* বংশ মর্যাদা (খরহবধমং ঝঃধঃঁং) : যদিও শিল্পায়িত সমাজে বংশ মর্যাদার বিষয়টি ততটা দৃশ্যমান নয়। তবে ঐতিহ্যগত সমাজের মতো শিল্প সমাজেও ব্যক্তির মর্যাদা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব এখনো কমে নি। আমাদের সমাজে সৈয়দ, শেখ ইত্যাদির ন্যায় লর্ড, ব্যারন পদগুলো কেউ স্বেচ্ছায় বর্জন করছে না। এখানে মনে রাখতে হবে বংশ মর্যাদা কয়েকটি প্রজন্মের জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে অর্জিত। শুধু কিছু পদবির শাব্দিক অর্থ তেমন গুরুত্ব বহন করে না। বাংলাদেশে বরং কোনো বিশেষ আক্ষরিক পদবির চেয়ে একটি পরিবারের ঐতিহাসিক বিকাশকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
* পেশা (ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ) : পেশা বিষয়টি অনেকটাই মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত। পেশার সাথে পারিবারিক পেশাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত। তার পেশাটি সমাজে বাবু কাজ নাকি শ্রমনির্ভর পেশা হিসেবে পরিচিত। পেশার মধ্যে সমাজের চোখে তার গুরুত্ব, চাহিদা ইত্যাদিও এক্ষেত্রে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের শহর সমাজে সামাজিক স্তরবিন্যাস ঃ উপর্যুক্ত নির্ধারক উপাদানগুলোর সাহায্যেই শহর এবং গ্রাম সমাজের স্তরবিন্যাস আলোচনা করতে হবে। শহর সমাজের স্তরবিন্যাস শ্রেণির ভিত্তিতেই করতে হবে। অর্থাৎ
* ১. উচ্চবিত্ত (টঢ়ঢ়বৎ ঈষধংং);
* ২. মধ্যবিত্ত (গরফফষব ঈষধংং);
* ৩. নিুবিত্ত (খড়বিৎ ঈষধংং);
এই শ্রেণীগুলো আবার প্রতিটি তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন ১. উচ্চ উচ্চবিত্ত; ২. মধ্য উচ্চবিত্ত এবং ৩. নিু উচ্চবিত্ত। অনুরূপভাবে ১. উচ্চ মধ্যবিত্ত; ২. মধ্য মধ্যবিত্ত; ৩. নিু মধ্যবিত্ত। নিুবিত্তের ক্ষেত্রে ১. উচ্চ নিম্নবিত্ত; ২. মধ্য নিম্নবিত্ত; ৩. নিম্ন নিম্নবিত্ত।
বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক অধ্যাপক নাজমুল করিমও মনে করতেন শ্রেণির ভিত্তিতেই আধুনিক সমাজের স্তর বিভাগ আলোচনা করা উচিত। সামাজিক স্তর বিভাগ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি মত প্রকাশ করেন যে সামাজিক স্তর বিভাগ আলোচনা করতে হলে সামাজিক শ্রেণি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। সামাজিক শ্রেণি বিন্যাসের অন্যতম মূল সূত্র হল সামাজিক শ্রেণিসমূহের গতি, প্রকৃতি ও গড়নের বিশ্লেষণ (করিম, ১৯৯৯ : ১৩৪-১৫০)।
উচ্চবিত্ত শ্রেণি (টঢ়ঢ়বৎ ঈষধংং) ঃ আমাদের কাছে এরকম সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা তথ্য নেই যার সাহায্যে বলা যেতে পারে যে বাংলাদেশের কত ভাগ লোক উচ্চবিত্ত আর কত ভাগ মানুষ নিুবিত্ত। তবে সরকারি এবং   আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ যেসব তথ্য প্রকাশ করে থাকে তার সাহায্যে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
যদি বলা হয় যে যার একটি পারিবারিক গাড়ি আছে এবং শহরে একটি নিজস্ব বাড়ি রয়েছে আর সরকারকে আয়কর দিয়ে থাকে তারা উচ্চবিত্ত, আর যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে তারা নিুবিত্ত এবং যারা এ দুইয়ের মাঝখানে তারা মধ্যবিত্ত তাহলেও তা নির্ণয় করা সহজ নয়। কারণ অনেক মানুষ আছে যার গাড়ি কেনার সামর্থ্য আছে তারা গাড়ি ব্যবহার করে না আয়কর নিবন্ধিত হওয়ার ভয়ে। উন্নত দেশে সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের দফতরগুলোতে উপাত্ত থাকে যার ভিত্তিতে বলে দেওয়া যায় সমাজের কত ভাগ লোক কোন স্তরে অবস্থান করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের তথ্য তেমন থাকে না। থাকলেও তা নানা ভাবে বিভ্রান্তিকর। কে কত সম্পদের অধিকারী তা নির্ণয় করা বেশ জটিল। তবে কিছু তথ্য ব্যবহার করে আমরা ধারণা পেতে পারি। যেমন আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা, ব্যাংকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা, কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা ইত্যাদি। যাই হোক এসব ব্যাপারে নিখুঁত তথ্য পাওয়া যায় খুব দুরূহ বিষয়। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী ২০০৭-০৮ বছরে দেশে কর নিবন্ধিত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৬৪৫৬১৭ জন যা তৎকালীন জনসংখ্যার ০.৫৩ শতাংশ মাত্র। করদাতাদের মধ্যে ডাক্তার ছিল ৬৭৮৩ জন বা মোট করদাতার ১.০৫ শতাংশ; আইনজীবী ১৬৪১ জন মোট করদাতার ০.২৫ শতাংশ; ব্যাংকার ২৭০০৮ জন মোট করদাতার ৪.১৮ শতাংশ; বেসাময়িক কর্মকর্তা (কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ) ২১৬৫৭ জন মোট করদাতার ৩.৩৫ শতাংশ। এদের সবাই শহরে বাস করে। (গ্রামে কোনো ব্যক্তি কর নিবন্ধিত এমন তথ্য পাওয়া যায় নি)। এখানে সামরিক বাহিনীর মধ্য ও উচ্চ স্তরের কর্মকর্তাদের হিসাব পাওয়া নি) যদিও তারা উচ্চ আয় স্তরের অন্তর্ভূক্ত। সম্প্রতি সরকার, যাদের ঢাকা শহরে একটি বাড়ি রয়েছে এবং একটি পারিবারিক গাড়ি রয়েছে তাদের এক গুচ্ছভুক্ত করেছে, আর যাদের ঢাকা শহরে একটি বাড়ি রয়েছে আর ব্যবহারের জন্য একাধিক গাড়ি রয়েছে তাদের আলাদা গুচ্ছভুক্ত করেছে।
এখানে যাদের কথা উল্লেখ করা হল এরা সবাই উচ্চশিক্ষিত। তবে এর বাইরে যারা আয়কর দিয়ে থাকে তারা হচ্ছে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। তাদের সবাই উচ্চশিক্ষিত না হলেও বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিত। করদাতারা সবাই ব্যক্তিগতভাবে উচ্চ ক্ষমতার অধিকারী না হলেও গোষ্ঠীগতভাবে ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে একজন ডাক্তার রাজনৈতিক কারণে মারা গেলে প্রথমে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এমন তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে পরে সমাজের অন্যান্য শক্তি তাদের সমর্থন দেয়। ফলে অল্পদিনের মধ্যে একটি সরকারের পতন ঘটে। অর্থাৎ গোষ্ঠীগত ভাবে তারা তাদের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে জোরালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ১৯৮৮ সালে সরকার বিচার বিভাগ সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত নেয় যাতে ঢাকায় অবস্থানরত আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে তারা আন্দোলন শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ২০০৬ সালে সরকার আইনজীবীদের আয়কর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। মূল কথা হল আধুনিক রাষ্ট্রে পেশাজীবী গোষ্ঠীগুলো উচ্চ আয়ের অধিকারী, তাদের সঙ্ঘ শক্তি প্রবল এবং তারা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে ফলে তাদের সম্পদ এবং আয়ের উৎস নিরাপদ থাকে। এরাই রাষ্ট্রের সকল সম্পদ ও ক্ষমতা ভোগ করে এবং দকলে রাখে। তবে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং শিল্পপতিদের প্রায় সবাই নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে দাবি করে থাকে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে উচ্চবিত্ত কারা?
ক্ষমতার বিবেচনায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বল্পসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতা, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা, সামরিক এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্রের উচ্চ পর্যায়ের পদাধিকারীগণ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। রাজনীতিবিদদের মাঝে মন্ত্রী (প্রায় ৫০ জন), সংসদ সদস্য (৩৪৫ জন, এদের মধ্যে অনেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত), বড় তিন/ চারটি দলের ৭০/৮০ জন কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি হওয়ার মতো সামর্থ্য আছে কিন্তু এমপি নয় এরকম আরো ৩০০ জনকে উচ্চ শ্রেণির বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে রাজনীতিকদের ক্ষমতা খুবই নড়বড়ে। কারণ এখানে দলের প্রধান নেতা এবং তার পরিবারের সন্তুষ্টির ওপর ব্যক্তির দলীয় অবস্থান নির্ভরশীল, ব্যক্তির যোগ্যতা তেমন গুরুত্ব বহন করে না। একজন নেতা হয়তো গত ৪০ বছর ব্যাপী জাতীয় রাজনীতি প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন কিন্তু দলের প্রধান ব্যক্তি বা তার পরিবারের বিরাগভাজন হয়ে তিনি একেবারে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন। ফলে এখানে রাজনীতিকদের ক্ষমতা খুব ঝুঁকিবহুল (ঝযধশু ধহফ ঠঁষহবৎধনষব)। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থার (আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম বা বিএনপির স্থায়ী কমিটি) সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন। এদের মধ্যে আবার দলীয় প্রধানের বিশেষ পছন্দ হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে অধিক ক্ষমতা ভোগ করে আরো জ্জ জনের একটি ক্ষুদ্র (ঈষরয়ঁব) দল। এভাবে ক্ষমতার পিরামিড যত উচুঁ হতে থাকে তার অগ্রভাগ তত সুচালো হতে থাকে।
বেসামরিক আমলাতন্ত্রে মোট ২০টি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ৯টি স্তরকে ১ম শ্রেণির বলে উল্লেখ আছে। ৯ম স্তর হচ্ছে প্রবশে স্তর। ৪র্থ থেকে ১ম স্তর পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের সিনিয়র স্তর হিসেবে বিবেচিত। তবে ৭০/৮০ জন সচিব যারা সরকারের মন্ত্রণালয় এবং বিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোতে নেতৃত্ব দিয়ে তারা রয়েছে আমলাতন্ত্র নামক মইয়ের শেষ ধাপে। এরা হয়ে থাকে উচ্চ প্রশিক্ষিত, অনেকেরই বিদেশি ডিগ্রি রয়েছে, রয়েছে উচ্চতর রাজনৈতিক যোগাযোগ, অনেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মে একই রকম সামাজিক অবস্থান বজায় রেখেছে। এদের মধ্যে আবার অতি ক্ষুদ্র একটি দল ‘অভ্যন্তরীণ বৃত্ত’ (ওহহবৎ পরৎপষব) গড়ে তোলে এবং সরকারের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ভোগ করে। এদের ক্ষমতার মূল উৎস হচ্ছে পেশাগত দক্ষতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ, দেশি-বিদেশি করপোরেশনে ব্যাপক প্রবেশাধিকার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সামর্থ্য। সামরিক আমলাতন্ত্রের পিরামিডের ভিত্তিভূমি বেসামরিক আমলাতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি বি¯তৃত এবং সর্বোচ্চ শিখর দারুণভাবে সুচালো। সামরিক আমলাতন্ত্রে ১ম শ্রেণির মোট ৯টি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে কর্নেল পদমর্যাদা বা ৫ম স্তর থেকে সিনিয়র স্তর বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ তিনটি স্তর আরো বেশি সুচালো। ৩য় স্তরে ৫/৭ জন, ২য় স্তরে ২/৩ জন এভাবেই সামরিক আমলাতন্ত্রের পিরামিডটি নির্ধারিত হয়। তবে এখানেও দৃশ্যমান ক্ষুদ্র অংশের চেয়েও অতিক্ষুদ্র একটি অংশ বলয় তৈরি করে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে থাকে। আমলাতন্ত্রের ক্ষুদ্র প্রভাবশালী অংশ সমাজের সম্পদের গতি প্রবাহের দিক নিয়ন্ত্রণ করার এক অসম্ভব প্রভাব অর্জন করে। ফলে সমাজের সম্পদ যেসব স্থানে পুঞ্জীভূত থাকে সেসব স্থানের সাথে তাদের একটি সহজ, সংক্ষিপ্ত এবং মসৃণ যোগাযোগের রাস্তা তৈরি হয়।
ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পেশাজীবীদের সমাজের উচ্চ স্তরের বলেই গণ্য করা হয়। বিশেষ করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী এদের মধ্যে যারা পেশাগত দক্ষতার কারণে সামাজিক পরিচিতি অর্জন করে এবং পরে পেশাগত অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে আসে। পেশাগত কারণেই তাদের অন্য পেশার মানুষের সাথে সহজ সংযোগ সাধিত হয়। এভাবে উচ্চ দক্ষতা, পেশাগত নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক সংযোগ সাধনের সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে। তবে এদের শুরুতে অর্থের অভাব থাকে না। কারণ পেশাগত দক্ষতায় শ্রেষ্ঠত্ব তাদের বিত্তেরও প্রসার ঘটায়। এরা উচ্চ মেধার অধিকারী হওয়ায় সহজাতভাবেই উচ্চাকাঙ্খী। ফলে এদের একটি অংশ সহজেই রাজনীতির সাথে সখ্যের বন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এদের বেলায় ঘটনাবলি অনেকটা এভাবে ঘটে- দক্ষতা ও খ্যাতি বিত্ত আনে, বিত্ত ও খ্যাতি ক্ষমতার সান্নিধ্য এনে দেয়, ক্ষমতা ও মেধা সম্পদের সাথে গড়ে দেয় অটুট বন্ধন।
আমরা সরকারি পরিসংখ্যান থেকে দেখেছি বাংলাদেশে মাত্র ৩৩ শতাংশ শ্রমশক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিত। এর মধ্যে আবার ২.৪ শতাংশ উচ্চতর পেশাদারি দক্ষতা সম্পন্ন। যাদেরকে উচ্চ শ্রেণি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে করদাতার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ যা এখন প্রায় ১৫ লক্ষে দাঁড়িয়েছে, এদেরকে উচ্চ শ্রেণির বলে গণ্য করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ০.৩ শতাংশ মানুষ আর একটি ব্যক্তিগত কম্পিউটার রয়েছে ২.৩ শতাংশ মানুষের। স্মরণযোগ্য যে কোনো একটি সমাজের দুর্লভ পরম আকাঙ্খিত দ্রব্যগুলো যারা ব্যবহারের সুযোগ পায় তারাই উচুঁ শ্রেণিভুক্ত বা এলিট হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন কর্পোরেত সংস্থার ব্যবস্থাপকরা এর মধ্যে গণ্য। সুতরাং বলা যায় যে উচ্চ উচ্চ শ্রেণি গঠিত হয়েছে একেবারে শীর্ষ সামরিক বেসামরিক আমলা, বিভিন্ন পেশার শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক দলের ক্ষুদ্র অংশ, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গ, কর্পোরেট সংস্থার উচ্চ ব্যবস্থাপকগণ এবং অল্পকিছু ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন কারণে যারা কূটনৈতিক যোগাযোগের অধিকারী এদের সমন্বয়ে। এদের সংখ্যা একেবারে হাতে গোনা যায়। হয়তো সেটা তিন সংখ্যায়ই গণনা করা সম্ভব।
উচ্চ মধ্যস্তরটি গঠিত হয়েছে উপরে যাদের কথা বলা হল তাদের অধিকাংশ নিয়ে আর নিম্ন উচ্চস্তরটি গঠিত এই সকল পেশা বা গোষ্ঠীর প্রবেশমুখে যারা রয়েছে বা পূর্ববর্তী স্তর সদ্য পরিবর্তন করেছে তাদের সমন্বয়ে। তবে মনে রাখতে হবে দুটি নদীর স্রোতোধারা যেখানে সদ্য মিলিত হয়েছে সেখানে দুটি স্রোতোধারা নিখুঁতভাবে পৃথক করা বেশ কষ্টসাধ্য। সুতরাং বাংলাদেশের মতো অতি উচ্চমাত্রায় অসমভাবে শ্রেণীকৃত সমাজে সর্বোচ্চ ০.৫ থেকে ১ শতাংশ লোক নিয়ে উচ্চ শ্রেণিটি গঠিত। ড. রঙ্গলাল সেন তার এক আলোচনায় বাংলাদেশের স্তরবিন্যাস আলোচনা করতে গিয়ে মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ উচ্চবিত্ত, ৮ শতাংশ মধ্যস্তরের এবং ৮৭ শতাংশ নিুবিত্তের বলে উল্লেখ করেছেন (সেন, ২০০৩ : ১১৮)। উপাত্ত দিয়ে এই ধারণার সাথে একমত পোষণ করা একেবারেই সম্ভব নয়। আধুনিক সমাজের শ্রেণিবিন্যাস শুধু ভাবগত উপাদান দিয়ে সম্ভব নয়। মানুষের চাহিদা, পরিম আকাঙ্খিত বস্তুগুলো পাবার সক্ষমতা, বিভিন্ন সেবা দ্রব্যে প্রবেশ (অপপবংং) বা অধিকার (ঊহঃরঃষবসবহঃ), তুলনামূলক সন্তুষ্টি ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণি : মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বলা হয় সমাজের অসংজ্ঞায়িত শ্রেণি। কার্ল মার্কস বলেছেন অবয়বহীন। অনেকেই দাবি করেন আধুনিক সমাজের সকল পরিবর্তনের চালিকাশক্তি এদের হাতেই। ফরাসি বিপ্লব, ইউরোপের রেনেসাঁ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল এদের অগ্রসর ভূমিকার কারণেই। আবার এমনও বলা হয় সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবাদী শ্রেণি এরাই। কারণ এরা চতুর, বৃষ্টির অনুকূলে ছাতা ধরতে অভ্যস্ত। এরা সর্বপ্রথম নিজের ভবিষ্যত নিশ্চিত জানার পরই নিজের অবস্থান প্রকাশ করে। সাধারণত এরা সংগ্রামের মাধ্যমে নিজের বিত্ত এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার অধিকারী হয়। ফলে কোনোভাবেই নিজের কষ্টে অর্জিত সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে চায় না। সমালোচকরা বলেন, মধ্যবিত্তরা যখন ঝুঁকি নেয় তখন বুঝতে হবে আরো বৃহত্তর প্রাপ্তির হাতছানি তাদের মোহমুগ্ধ করেছে।
যাহোক, আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচ্য বিষয়। কারণ কোনো একটি সমাজ সম্পর্কে জানতে গেলে, তার গতি-প্রকৃতি বুঝতে হলে এর মধ্যবিত্ত অংশ সম্পর্কে জানা জরুরি। বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন দলিলে যাদের প্রতিদিন আয় ২ মার্কিন ডলারের বেশি থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত অর্থাৎ বার্ষিক ৭৩০ ডলার থেকে ৭৩০০ ডলার তাদেরকে বলা হয় মধ্যবিত্ত। মধ্য পর্যায়ের সরকারি আমলা থেকে শুরু করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সবাই নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে উল্লেখ করে থাকে। ড. নাজমুল করিম পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে মধ্যবিত্ত হচ্ছে একটি মনস্তাত্ত্বিক গোষ্ঠী (চংুপযড়ংড়পরধষ মৎড়ঁঢ়রহম) অর্থাৎ এখানে কোনো মানদ-ে পরিমাপ করার চেয়ে সে নিজে কী মনে করে আর তার ব্যাপারে সমাজের অন্য লোকেরা কী মনে করে এটাই বেশি জরুরি। তবে সাধারনত উন্নত সমাজে সমাজের তিনটি শ্রেণির অবস্থান থাকে হীরক আকৃতির আর আমাদের মতো দেশে থাকে কিছুটা পিরামিড আকৃতির। হয়তো সবচেয়ে বেশি থাকে নিুবিত্ত তারপর মধ্যবিত্ত আর সবচেয়ে কম থাকে উচ্চবিত্ত। অথবা নিুবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সমান সমান থাকে আর অতি ক্ষুদ্র অংশ থাকে উচ্চবিত্ত।
বাংলাদেশে যদি ধরে নেওয়া হয় ০.৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চবিত্ত আর প্রায় ৫০ শতাংশ নিুবিত্ত তাহলে বাকি ৪৯ শতাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এখানে মধ্যবিত্ত এবং নিুবিত্ত শ্রেণির আয়তন প্রায় সমান। তবে কোনো সমাজে যখন ইতিবাচক পরিবর্তন দ্রুত হতে থাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয়তন দ্রুত স্ফীত হতে থাকে এবং আধুনিক উন্নয়ন চিন্তায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্ফীতিকে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ মধ্যবিত্তের সম্প্রসারণ ঘটলে সে উন্নয়নকে টেকসই বলে ধরা হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্যরা হয়ে থাকে পরিশ্রমী, উদ্যমী, গতিশীল এবং উচ্চাকাঙ্খী। এদের মধ্যে সামাজিক সচলতা অধিক থাকার কারণে জাতীয় উন্নয়নে লক্ষণীয় অবদান রাখতে সক্ষম হয়। এদের আয় স্তর সীমিত হওয়া সত্ত্বেও এরা একধরনের মেকি উচ্চবিত্তভাব বজায় রাখতে চায়। ফলে তাদের ভোগের ধরনে (চধঃঃবৎহ) এ বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তারা উচ্চবিত্তের মতো হতে চায়। এর ফলে অধিক ভোগে আগ্রহী হয়ে পড়ে। ফলে সমাজে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উৎপাদনে একটি ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যায়। এজন্য বহুজাতিক কোম্পানি এবং পুঁজিবাদী কেন্দ্র এদের প্রতি বিশেষ মনোযোগী থাকে।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি অতিমাত্রায় আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন, খুঁতখুঁতে, পরশ্রীকাতর, সমালোচনাপ্রবণ এবং কখনই নিজের সামাজিক অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এই সীমাহীন অসন্তুষ্টি তাদের অনিঃশেষ কর্মপ্রেরণার উৎস। এটাই তাদের তীব্র প্রতিযোগিতাময় পরিবেশে সাফল্য পেতে সহায়তা করে। তবে এরা সব সময়ই নিজের সাফল্যের অধিক পরিমাণ সামাজিক পুরস্কার প্রত্যাশা করে। এটা একদিকে যেমন তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি আবার অন্যদিকে আজন্ম অসুখী হওয়ার কারণও বটে। অসন্তুষ্টি থেকে আসে অস্থিরতা। এদের কোনো স্থায়ী আদর্শিক অবস্থান নেই। সামাজিক পুরস্কারের প্রত্যাশাই এদের আদর্শিক গন্তব্যের একমাত্র নির্ধারক।
নিম্নবিত্ত শ্রেণি ঃ নিম্নবিত্ত শ্রেণিভুক্ত কারা? সম্ভবত সমাজের খেটে খাওয়া মানুষদের সমন্বয়ে এই শ্রেণিটি গঠিত। মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানে যাকে বলা হয়েছে সর্বহারা শ্রেণি, এরা হয়তো তার কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১১ তে সমাজের কয়েকটি সূচক দিয়ে সমাজের সদস্যদের সন্তুষ্টি পরিমাপ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের ২২ শতাংশ মানুষ উল্লেখ করেছে তারা তাদের বর্তমান জীবনযাত্রার মানে অসন্তুষ্ট। ভারতে এই হার ২৬ এবং পাকিস্তানে ৩২। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৮। ঐ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ নিজের নাম পর্যন্ত লিখতে জানে না। যদিও সরকারি হিসাবে এটা ৩২ শতাংশ। বলা যায় এরা একটি মানদ-ে নিু শ্রেণিভুক্ত। ইউএনডিপি’র মানব উন্নয়ন রিপোর্ট ২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৫৭.৭ শতাংশ লোক বহুমাত্রিক সূচকে (এমপিআই) দরিদ্র আর চরম দরিদ্র অর্থাৎ যাদের প্রতিদিন মাথাপিছু আয় ১.২৫ মার্কিন ডলারের নিচে। এরা নিুবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী চরম দারিদ্র্যের হার ১৯.৬ শতাংশ এবং সাধারণ দারিদ্র্য ২৮.৭ শতাংশ। এই মানুষগুলোকে নিুবিত্ত বলা যায়। এদের শিক্ষা নেই, অনেকের থাকার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, যতবার ক্ষুধা লাগে ততবার খাদ্যের কোনো সংস্থান নেই, চিকিৎসার জন্য কোনো বাড়তি অর্থ নেই, বিশুদ্ধ পানি পানের কোনো নিশ্চয়তা নেই, অসুখবিসুখ-প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে ঝুঁকি সামাল দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, তারা যে কাজ করে সেই কাজে কোনো প্রকার ছুটি বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা এ এতোগুলো মৌলিক ‘নেই’-এর মধ্যে বসবাস করে সেটা বলার মতো কোনো ফোরাম বা তাদের উচ্চ কন্ঠ নেই। এরাই হচ্ছে নিুবিত্ত যাদের কোনো বিত্ত নেই। কলকারখানার দৈহিক শ্রমদানকারী মানুষ যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বা প্রশিক্ষণ নেই, বিভিন্ন সেবাদানকারী যেমন হাসপাতাল, পরিবহন, অফিস-আদালত, বাসগৃহে দক্ষতাবিহীন কাজ, বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত লোকজন যেমন হকার, ফড়িয়া-দালাল ইত্যাদি লোকজন এই শ্রেণিভুক্ত। তাহলে বলা যায় যে আধুনিক শিল্প সমাজে কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা দক্ষতাবিহীন কাজে বা পেশায় নিয়োজিত লোকজনকে বলা যায় নিুবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। সকল মানদ- বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ এই শ্রেণিভুক্ত।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সাধারণত দিনে ২ মার্কিন ডলারের কম আয় করে এমন লোকদেরকে দরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। প্রতিদিন ২ ডলার মানে বার্ষিক ৭৩০ মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৭৩ টাকা ম্যূমানে বার্ষিক ৫৩২৯০ টাকা। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ৯ জুন, ২০১১ তার বাজেট বক্ততায় বলেছেন বর্তমান বাংলাদেশের গড় আয় মাথাপিছু ৮১৮ ডলার যা টাকায় ৫৩২৩৬। সেদিক দিয়ে বলা যায় বাংলাদেশের সব মানুষ দরিদ্র। যদিও ব্যাপারটা সে রকম নয়। বাংলাদেশ ভীষণভাবে আয়বৈষম্যজর্জরিত একটি দেশ। বিশ্ব উন্নয়ন রিপোর্ট অনুযায়ী এখানে শহরে বৈষম্য ৩০.৭ শতাংশ থেকে ৩৬.৮ শতাংশ, আর গ্রামে ২৪.৩ থেকে ২৭.১ শতাংশ। অন্যদিকে গিনি সহগে জাতীয় বৈষম্য .৪৭, শহরে .০৬১ এবং গ্রামে .০২৪। যাহোক প্রতিদিন দুই ডলার হিসাবেও বাংলাদেশে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র বা নিুবিত্ত শ্রেণির      অন্তর্ভূক্ত। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান বেতন কাঠামোতে সর্বনিু বেতন ২৪০০ টাকা মাসিক যা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ ৪০০০ টাকার সমান প্রায় অর্থাৎ বার্ষিক ৪৮০০০ টাকা যা প্রতিদিন দুই ডলারের কম। সুতরাং বাংলাদেশে যারা ৪র্থ শ্রেণির চাকরি করে, পুলিশ এবং মিলিটারির সিপাহি, গার্মেন্ট কারখানায় কর্মরত প্রায় ৮০ লাখ শ্রমিক, অন্যান্য জায়গায় কর্মরত মানুষের মধ্যে যারা দৈহিক শ্রমে কাজ করে তাদেরকে নিুবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।       
তবে এদের আবার শ্রেণিবিভাগ আছে। যেমন যারা সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় চাকরি করে তাদের ন্যুনতম সামাজিক নিরাপত্তা আছে, তারা পেনশন পায়, তাদের চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ আছে, সন্তানদের লেখাপড়া করানোর জন্য কিছু সুবিধা দেওয়া হয়, কোনো কোনো সংস্থা কিছু আবাসন সুবিধা দিয়ে থাকে। ফলে এদেরকে নিু উচ্চশ্রেণিভুক্ত বলে আখ্যায়িত করা যায়। যারা মোটামুটি স্থায়ী চাকরি করে, প্রাপ্ত আয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে পারে, যেমন বেসরকারি সংস্থা, গার্মেন্ট, কলকারখানা, বিভিন্ন সেবা সংস্থা ইত্যাদিতে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যস্তরে। যাদের একেবারেই কর্মের নিশ্চয়তা নেই, আজকে কাজ করলেও জানে না কালকে কোথায় কাজ করবে বা আদৌ কাজ পাবে কি না যেমন দিনমজুর, যাদের পেশার সম্মানজনক সামাজিক স্বীকৃতি নহে, যেমন পরিচ্ছন্নকর্মী ঠেলাগাড়ি, ভ্যান-রিকশাচালক, যারা ঘরে কাজ করেন যেমন ঝি-চাকর ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিতদের নিু নিুবিত্ত বলে আখ্যায়িত করা যায়। এরা নিুবিত্তেরও নিু পর্যায়ে অবস্থান করছে।
গ্রাম সমাজে স্তরবিন্যাস ঃ এ আলোচনার শুরুতে স্তরবিন্যাসের যেসকব নির্ধারক বা উপদান উল্লেখ করেছি সেগুলো নিঃসন্দেহে গ্রামীণ সমাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে গ্রামীণ সমাজের ক্ষেত্রে তার বহিঃপ্রকাশ হবে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। গ্রামীণ সমাজের স্তরবিন্যাস আলোচনা করতে গেলে এ ব্যাপারে কিছু গবেষণা সংক্রান্ত আলোচার আশ্রয় নিতে হবে। ড. নাজমুল করিম তাঁর ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল সমাজ গ্রন্থে মুসলিম সমাজকে প্রধানত তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করেছেন। সেগুলো হল :
১. শরিফ বা আশরাফউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত শ্রেণি;
২. আতরাফ বা আফজাল মধ্য পর্যায়ের মর্যাদা গোষ্ঠীসমূহ;
৩. আরজাল বা নিুপদমর্যাদার গোষ্ঠীসমূহ;
ড. করিম কুমিল্লার একটি গ্রামে সরেজমিন গবেষণার মাধ্যমে দেখতে পান যে সেখানে কয়েকটি গোষ্ঠী রয়েছে এরা মূলত মর্যাদা গোষ্ঠী (ঝঃধঃঁং এৎড়ঁঢ়)। তবে তাদের পেশা এবং সম্পত্তির মালিকানার সাথে মর্যাদার একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। মোট ৯টি মর্যাদা গোষ্ঠীর তিনি উল্লেখ করেছেন :
* চৌধুরী : তাদের ধারণা তারা এক সময় গ্রামের সামন্তপ্রভু বা জমিদার ছিল;
* খন্দকার : তাদের দাবি তারা একদা ধর্ম প্রচার করত;
* ভুঁইয়া : তারা সম্পদশালী কৃষক গোষ্ঠী;
* মুহুরি : তাদের দাবি তারা একদা লেখক পেশায় কাজ করত যেমন দলিল লেখক;
* কৃষক : নিজস্ব আবাদযোগ্য জমি আছে, নিজের শ্রমে নিজের জমি চাষ করত;
* ভূমিহীন কৃষি দিনমজুর;
* অকৃষি দিনমজুর;
* কাঠুরে : যারা পার্শ্ববর্তী বন থেকে কাঠ কেটে আনে বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মানুষের কঠোর কাঠের কাজ করে দেয়;
* গোলাম বা দাস : যারা একদা গৃহদাস বা ক্রীতদাস ছিল। (করিম, ১৯৫৬ : ১৬০-১৬১)।
তিনি এই গোষ্ঠীগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। এক থেকে চার আশরাফ শ্রেণিভুক্ত, পাঁচ এবং ছয় আতরাফ শ্রেণিভুক্ত আর সাত, আট এবং নয় আরজাল শ্রেণিভুক্ত। ড. করিম উপমহাদেশে মুসলিম সমাজের ধারাবাহিকতা আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে ভারতীয় মুসলিমগণ নিজেদের চারটি প্রধান গোষ্ঠীভুক্ত বলে মনে করে সেগুলো হচ্ছে : (১) সৈয়দ; (২) শেখ; (৩) মুঘল; (৪) পাঠান। ড. আনোয়ারুল্লা চৌধুরী তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন বাংলাদেশের গ্রামের মুসলিমরা তিনটি স্তরে বিভক্ত১. খান্দানি মুসলিম, যারা জমির মালিক হলেও প্রত্যক্ষভাবে কৃষিকর্মের সাথে জড়িত নন; ২. গৃহস্থ মুসলিম, মালিক কৃষক অর্থাৎ নিজের জমি নিজেই চাষ করেন; ৩. কামলা মুসলিম, শ্রমজীবী শ্রেণি। এখানে ভূমির মালিকানাই স্তরবিন্যাসের প্রধান নির্ধারক অন্যগুলো গৌণ। তিনি ভূমি মালিকানার মর্যাদাকে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘‘খধহফ রং ঃযব ভঁহফধসবহঃধষ নধংরং ড়ভ ংড়পরধষ পষবধাধমবং রহ গবযবৎঢ়ঁৎ ধহফ ঃযবৎবভড়ৎব বি ফবভরহব পষধংং রহ ঃবৎসং ড়ভ ড়হিবৎংযরঢ়, পড়হঃৎড়ষ ধহফ ঁংব ড়ভ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু” (পযড়ফিযঁৎু, ১৯৭৮:৭৯)। ড. এ এফ ইমাম আলী একটি গ্রাম গবেষণায় দেখতে পান যে গ্রামীণ সমাজের স্তরবিন্যাস পেশাভিত্তিক বংশগতিনির্ভর। অনেকটা হিন্দুদের বর্ণপ্রথার মতো। তিনি গবেষণা করে দেখতে পান মুসলিম সমাজ জুলহা, কুলাল, ডোম, হাজাম, সারেং, মুনশি এই সকল পেশাভিত্তিক গোষ্ঠীতে স্তরায়িত। সুতরাং এখানে পেশা এবং বংশ এই দুটি স্তরায়নের প্রধান উপাদান। অন্য এক আলোচনায় ড. আলী পেশাকেই বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের স্তরবিন্যাসের কেন্দ্রীয় উপাদান বলে উল্লেখ করেছেন (আলী, ২০০০ : ৫৮-৭৫)।
সমাজবিজ্ঞানী ইরফান হাবিব তার মুঘল আমলে কৃষি কাঠামো গ্রন্থে মন্তব্য করেন যে ‘অনিবার্যভাবেই ভারতের কৃষি সমাজ ভূমিকে কেন্দ্র করে অসমভাবে শ্রেণিবিন্যাসিত ছিল। সমাজে সম্পদের মূল্য অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। গ্রামীণ জনসংখ্যা যে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, সম্পদের মূল্য অনুযায়ী এ শ্রেণিবিভাগকে তার এক নমুনা হিসেবে ধরা যেতে পারে। আমরা ধরে নিতে পারি যে, জমিদার, মহাজন, শস্য ব্যবসায়ীদের একটি ছোট দল নিয়ে গড়ে উঠেছিল প্রথম শ্রেণি। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ছিল ধনী চাষিরা আর বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ চাষিদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণি (হাবিব, ১৯৮৭ : এখানে দেখা যাচ্ছে যে ভূমি মালিকানার সাথে সম্পত্তি বা সম্পদের মালিকানাই সমাজে শ্রেণিবিন্যাসের প্রধান নির্ধারক।
মুখার্জি তার বিখ্যাত বাংলাদেশের গ্রাম গবেষণায় বগুড়ার ছয়টি গ্রামের ওপর গবেষণা করেন। সেখানে তিনি প্রধানত পেশা, জমির মালিকানা এবং আয়কে প্রধান উপাদান হিসেবে গণ্য করে শ্রেণিবিন্যাস করেন। তিনি তিনটি ক্যাটাগরিতে শ্রেণিবিন্যাস সাধন করেন। (১) উচ্চস্তরের মধ্যে রয়েছে চাকরিজীবী, জোতদার (বড়, জোত-জমির মালিক), জমিদার (জমির মালিক), ধনী কৃষক। (২) মধ্যস্তরে রয়েছে রায়ত (নিজের জমি চাষরত কৃষক), ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র অচাষি জমির মালিক, বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্পজীবী শ্রেণি। (৩) নিুস্তরে রয়েছে রায়ত বর্গাদার, কৃষি শ্রমিক, ভিক্ষুক (মুখার্জি, ১৯৯২)। মনে রাখতে হবে আইন পরিবর্তনের ফলে কিছু শ্রেণির এখন আর অস্তিত্ব নেই যেমন জোতদার, জমিদার, রায়ত ইত্যাদি। পি জে বার্তোসি (১৯৭০) তার গবেষণা ঞযব ঊষঁংরাব ঠরষষধমব: ঝড়পরধষ ঝঃৎঁপঃঁৎব ধহফ ঈড়সসঁহরঃু ঙৎমধহরুধঃরড়হ রহ জঁৎধষ ঊধংঃ চধশরংঃধহ (১৯৭০) থিসিসে ‘কুলমন্ত্রের আবর্তন’ তত্ত্বে দেখান যে ভূমি মালিকানা, পদমর্যাদা এবং ক্ষমতাই গ্রামীণ শ্রেণিবিন্যাসের প্রধান উপাদান। অৎবহং ধহফ ইঁবৎফবহ (১৯৭৪) ডাচ দম্পতি ১৯৭৪ সালে মেহেরপুর জেলার একটি গ্রামে গবেষণা করেন। তাদের গবেষণার প্রতীকী নাম ‘ঝগড়াপুর’। তারা দেখিয়েছেন গ্রামের কৃষকরা ভূমিকেন্দ্রিক অন্তহীন দ্বন্দ্বের আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে বেঁচে থাকে। বাংলাদেশের কৃষকরা প্রাক-পুঁজিবাদী সম্পর্ক থেকে পুঁজিবাদী সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করছে। গ্রামীণ মানুষেরা নিুভাবে শ্রেণিবিন্যস্ত-(১) ভূস্বামী; (২) ধনী কৃষক; (৩) মাঝারি কৃষক; (৪) ক্ষুদে কৃষক; এবং (৫) প্রায় সর্বহারা কৃষক। যদিও এটা আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগের একটি পর্যবেক্ষণ কিন্তু এর একটি বাস্তবতা রয়েছে। ড. জেহাদুল করিম তার গবেষণায় মূলত দেখতে চেয়েছিলেন এলিট কারা। এক্ষেত্রে তিনি দেখতে পান নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত খ্যাতি (বংশ মর্যাদা ইত্যাদি থেকে আগত) এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের কারণে ব্যক্তির এলিট স্তরে প্রবেশ ঘটছে। এ ক্ষেত্রে পেশা বা শিক্ষা খুব বড় কোনো ভূমিকা পালন করছে না। তবে তিনি দেখেছেন নেতৃত্বে ক্রমাগতভাবে শিক্ষিতদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার গবেষণা একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। তা হল নবগঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে অবস্থান ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে (করিম, ২০০০ : ৭৯-৯৭)। অর্থাৎ বলা যায় যে সমাজের উচুঁ স্তরের লোকজনই এগুলো পরিচালনা করতে যায় আর সেটা তাদের নবতর মর্যাদা এবং ক্ষমতায় অভিষিক্ত করে। জেওফ্রে ডি উড তার গবেষণায় দেখান যে ভূমির মালিকানা থেকে উদ্বৃত্ত উৎপাদন বড় ভূমি মালিকদের অধিক তরল (খরয়ঁরফ অংংবঃ) সম্পদের জোগান দিচ্ছে যা থেকে তারা ঋণ দানের ক্ষমতা অর্জন করছে, যেটা তাদের বাড়তি ক্ষমতার জোগান দিচ্ছে। গ্রামীণ সমাজে ভূমির মালিকানা এবং ঋণ দানের ক্ষমতা শ্রেণিকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।
বিগত শতাব্দীর আশি এবং নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কের লেশমাত্রও অপসৃয়মাণ। সম্পূর্ণ পুঁজিবাদী সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে বৃহৎ পুঁজির সংযোগ ঘটেছে। কর্পোরেট উদ্যোক্তারা কৃষিতে বিনিয়োগ করছে। কৃষির আধুনিকায়ন এবং দ্রুত প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। গ্রামাঞ্চলে খুব বড় জোত জমার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। কৃষিতে শ্রমঘন উৎপাদনের পরিবর্তে পুঁজিঘন উৎপাদন কায়েম হয়েছে। গ্রামের মানুষেরা দ্রুততার সাথে ভূমি হারিয়ে অকৃষি পেশায় প্রবেশ করছে। যে ঋণ কার্যক্রম গ্রাম্য মহাজন এবং ভূস্বামীদের একচেটিয়া দখলে ছিল তা এখন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতা এবং এনজিওদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে গ্রামীণ জীবনে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। উৎপাদন সম্পর্ক এবং কৃষির পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা না করলে গ্রামীণ শ্রেণিবিন্যাস আলোচনা সুস্পষ্ট হবে না। নিুে কৃষির পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হল :
ক্ষুদ্রায়তন খামার : এ কথা সত্য বাংলাদেশে একদা ভূমি দারুণ অসমভাবে বণ্টিত ছিল। অনুপস্থিত ভূমি মালিকরা বেশিরভাগ ভূমি নিয়ন্ত্রণ করত। ব্রিটিশদের থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এবং অধিকাংশ শোষক ঋণদাতা ভূস্বামী ১৯৪৭ সালের পর দেশ ত্যাগ করলে এই বাস্তবতার পরিবর্তন হতে থাকে। সরকার প্রথমে ১০০ বিঘা পরে ৬০ বিঘা পুনরায় ১০০ বিঘা, আবার জমি ক্রয়ের মাধ্যমে ভূমি মালিকানার হোল্ডিংপ্রতি সীমা নির্ধারণ করে ৬০ বিঘা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একদা জনপ্রিয় ইস্যু ছিল ভূমির পুনর্বণ্টন। ড. সেন বলেন, “গ্রামীণ ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর জন্য ভূমি সংস্কার এবং উদ্বৃত্ত ভূমির বিতরণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে” (সেন, ২০০৩:১০৫)। এরিক জেনসেন বাংলাদেশকে বলেছেন ‘ক্ষুদ্র কৃষকের দেশ’। আসলেও তাই। এখন আর এখানে পুনর্বণ্টনের মতো কোনো ভূমি নেই। ১৯৬০ সালে ১.৫ একরের বেশি জমি রয়েছে এরকম খামারের সংখ্যা ছিল মোট খামারের ৪১ শতাংশ এবং তাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ ছিল মোট জমির ১৬ শতাংশ। ১৯৬০ সালের মাষ্টার সার্ভে এগ্রিকালচার অনুযায়ী ০.৭৫ একরের নিচে জমি আছে এমন খামারের সংখ্যা ছিল মোট খামারের ৪২.১০ শতাংশ আর তাদের দখলে জমি ছিল মোট কৃষি জমির মাত্র ২.৪ শতাংশ। বিবিএস ১৯৮৬ অনুযায়ী ক্ষুদ্র খামার (০.৫১-২.৪৯ একর) ছিল ৭০.৩৪ শতাংশ আর তাদের অধীনে জমি ছিল মোট চাষযোগ্য জমির ২৯ শতাংশ। রহমান ও হুসাইন তাদের এক সমীক্ষায় দেখিয়েছেন ১৯৭৭ সালে দেশে মোট ক্ষুদ্র খামার ছিল ৩০ লক্ষ ১০ হাজার, ১৯৮৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৭০ লক্ষে। বিবিএস ২০০০-এর তথ্যানুযায়ী খামারপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১.৫ একর আর মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.১৫ একর যা গত ১০ বছরে ০.১০ একরে দাঁড়িয়েছে। এ সময় ৭০০৫২৫০ কৃষি খামারের মধ্যে ৫০০৭২৬৭ ছিল ক্ষুদ্র খামার। বিবিএস ১৯৯৬ সালে কৃষি পরিবর্তনশীলতার একটি চিত্র উপস্থাপন করেছে। সেখানে দেখা যায় ১৯৮৩-৮৪ সালে ক্ষুদ্র খামারের সংখ্যা ছিল মোট খামারের ৭০.৩৪ শতাংশ আর তাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ ছিল ২৮.৮৭ শতাংশ এবং ১৯৯৬ সালে ক্ষুদ্র খামারের সংখ্যা ছিল মোট খামারের ৭৯.৮৭ শতাংশ আর মোট চাষযোগ্য জমিজমার মধ্যে তাদের দখলে থাকা জমিজমার পরিমাণ ৪১.১৮ শতাংশ। যা ক্রমপরিবর্তনশীল।
ভূমিহীনতার হার ক্রমবর্ধমান : ১৯৭১-৭২ সালে দেশে ভূমিহীনতার হার ছিল ২৪ শতাংশ। ১৯৮৩-৮৪ সালে তা দাঁড়ায় ২৭ শতাংশ। বিগত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে একটি গবেষণায় দেখানো হয় এই হার ৫৬ শতাংশ এবং ২০০০ সালে তা দাঁড়ায় ৬৪ শতাংশ। অবশ্য বিবিএস ২০০০ অনুযায়ী এই হার ৩৪ শতাংশ। এই তথ্যগুলোর মধ্যে কিছু পরস্পরবিরোধিতা সব সময়ই আছে। এরিক জেনসেন এবং আশির দশকে একটি গ্রাম গবেষণা করেন। তিনি তার জঁৎধষ ইধহমষধফবংয : ঈড়সঢ়বঃরঃরড়হ ভড়ৎ ঝপধৎপব জবংড়ঁৎপবং (১৯৮৬) গবেষণায় দেখান যে নমুনা এলাকায় ভূমিহীনতা ৩৫ শতাংশ (জেনসেন, ১৯৯৯:৪)। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ২০০৬ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করে বাংলাদেশের বাইশটি গ্রামের ওপর। জঁৎধষ ইধহমষধফবংয : ঝড়পরড় ঊপড়হড়সরপং চৎড়ভরষব-২০০৬ রিপোর্টে দেখানো হয় যে বাংলাদেশে ভূমিহীনতার হার ৬০ শতাংশ। ঐ রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী প্রতি ১০ পরিবারের ৬টির কোনো চাষযোগ্য জমি নেই। সুতরাং বলা যেতে পারে গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীনতার হার ক্রমবর্ধমান। এটার কারণ এ-নয় যে একটি গোষ্ঠী কৌশলে বা দস্যুদের মাধ্যমে জনগণকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে যেমন করা হত ১৯৪৭ সালের পূর্বে ধূর্ত এবং ক্ষমতাবান জমিদারদের দ্বারা। বরং এখন তা ঘটছে মানুষের পেশা পরিবর্তন, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন, জমির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি, মধ্য কৃষকদের জমি ক্রয়ের সামর্থ্য বৃদ্ধি, কৃষি শ্রমিকের মূল্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে এলাকা বিশেষে জমির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত। এই বৃদ্ধি যে এলাকা শহরের যত নিকটে এবং যে এলাকার অধিক সংখ্যক লোক বিদেশে থাকে সে এলাকায় অধিক। তবে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনই এর প্রধান নির্ধারক। বলা যায় ব্যতিক্রমসহ বাংলাদেশে ভূমিহীনতার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে।
ভূমির পুঞ্জীভবন ক্রমহ্রাসমান : বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে পরিবারপিছু ৭.৫০ একর জমি ধারণ করাকে বড় খামার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৮৩-৮৪ সালে বড় ফার্ম ছিল মোট ফার্মের ৪.৯৪ শতাংশ এবং তাদের দখলে ছিল মোট জমির ২৫.৯২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২.৫২ শতাংশ এবং ১৭.৩২ শতাংশ। জেনসেন তার গবেষণা গ্রামে আশির দশকে পেয়েছিলেন খামারের ৫ শতাংশ এবং জমির ২৩.৯ শতাংশ, কিন্তু তিনি বড় খামার ধরেছেন ৪ একর বা তার চেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২ বিঘা প্রায়। ঐ এলাকার সবচেয়ে বড় খামারের আয়তন ৫.৪ একর বা প্রায় ১৬ বিঘা। বিবিএস ২০০০ অনুযায়ী বড় খামার মোট খামারের ১.৬৭ শতাংশ আর তাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ ১৭.৪৯ শতাংশ। বিবিএস ২০০৮ অনুযায়ী এই সংখ্যা ১ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে বিধায় ভূমির পুঞ্জীভবন ক্রমহ্রাসমান। সুতরাং এখন ভূমির পুঞ্জীভবন নয় বরং ভূমির অতি খ-ীকরণ এবং অতি ক্ষুদ্র খামারের আয়তন সমস্যা হিসেবে প্রকটিত হচ্ছে। কারণ কৃষিতে যত বেশি প্রযুক্তি এবং পুঁজির ঘনত্ব (ঈধঢ়রঃধষ ধহফ ঞবপযহড়ষড়মু ওহঃবহপরঃু) বৃদ্ধি পাবে তত সেটা অতি ক্ষুদ্র খামারে প্রয়োগ অলাভজনক হিসেবে দেখা দেবে। দীর্ঘদিন থেকে একটা সাধারণ তত্ত্বের চর্বিত চর্বণ (ঈষরপযব) শোনা যায় যে পুঞ্জীভূত অল্প কৃষকের হাতে জমাকৃত জমি বৈপ্লবিক কায়দায় পুনর্বণ্টন করতে পারলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য সমস্যার প্রায় পুরোটার সমাধান হয়ে যাবে। বিদ্যমান উপাত্ত থেকে এর আর তেমন কোনো বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
খোরাকি অর্থনীতি থেকে প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তর : সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি খোরাকি অর্থনীতি থেকে ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যমুখী কৃষি অর্থনীতির রূপ পরিগ্রহ করছে। ঐতিহ্যগতভাবে এদেশের কৃষকরা পরিবার পোষণের জন্য উৎপাদন করত। এর বাইরে তারা কিছু ভাবত না, ভাবার প্রয়োজনও বোধ করত না। বিগত শতকের ৫০-এর দশকে পাটের উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি, বিশেষ করে কোরীয় যুদ্ধের কারণে এবং জিকে প্রজেক্টের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লবের সূচনা ঘটলে কৃষকের একটি অংশের ঘরে উদ্বৃত্ত ফসল আসে যা তারা বাজারে বিক্রি করতে থাকে এবং সে অর্থে তাদের সন্তানদের শহরে পাঠাতে শুরু করে, হয় পড়াশোনা করতে না হয় ব্যবসা করতে। যা কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত করে। ৭০-এর দশকের শেষে এবং ৮০ দশকের শুরুতে উফসি ফসলের ব্যাপক প্রচলন ঘটলে এই প্রবণতা আরো গতিশীল হয়। আবু আবদুল্লা দেখিয়েছেন ১৯৬৩-৬৪ সালে মোট উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ বাজারে বিক্রি হয়েছে কিন্তু ৭৩-৭৪ সালে মোট উৎপাদিত ফসলের ৩০ শতাংশ বাজারে বিক্রি হয়েছে। এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। এখন কৃষক কখনো অধিক মুনাফার জন্য ধানের জমিতে গোলাপ চাষ করছে, বহুজাতিক কোম্পানির জন্য তামাক চাষ করছে বা মধ্যপ্রাচ্যের বাজারকে লক্ষ্য করে সবজি আবাদ করছে। অর্থাৎ সারা বছর পরিবার-পরিজন নিয়ে খাবে কী তার চেয়ে তার কাছে মুনাফাই মুখ্য। কারণ বাজার তাকে নিশ্চয়তা দেয় যে মুক্তবাজারে অর্থ থাকলে খাদ্য পাওয়া যায়। এই প্রবণতা কৃষকের সমৃদ্ধির কারণ আবার জাতীয়ভাবে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিও বৃদ্ধি করছে।
খাদ্য উৎপাদননির্ভর কৃষি থেকে ফসলের বহুমুখীকরণ : রাষ্ট্র কাঠামোর শক্তিহীনতা এবং দুর্যোগের ঝুঁকি অধিক থাকায় ঐতিহ্যগতভাবে এদেশের কৃষক প্রধানত খাদ্য উৎপাদনেই তার সকল পুঁজি ও শ্রম নিয়োগ করত। রাষ্ট্র কাঠামোর সামান্য গণতন্ত্রায়ন সাধিত হওয়ায় রাষ্ট্র জনগণের ঝুঁকির খানিকটা বহনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জনগণের বিকল্প পছন্দ সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে কৃষক শুধু ভোগের জন্য উৎপাদন নয় বরং সমৃদ্ধির আশায়ও উৎপাদন করছে। তা ছাড়া জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ফলাফল প্রয়োগ করায় কৃষকের বিকল্প পছন্দের আরো সম্প্রসারণ ঘটেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে যে দারিদ্র্যের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটত তা শস্যের বহুমুখীকরণের ফলে থামানো সম্ভব হয়েছে। ফলে এটা কৃষকের দারিদ্র্যরোধে ভূমিকা পালন করছে।
রাষ্ট্র ও কৃষকের সম্পর্ক : ১৯৫০ সালের পর থেকে রাষ্ট্রই একমাত্র বৈধ খাজনা আদায়কারী কর্তৃপক্ষে পরিণত হয়েছে। দুর্বল হলেও গণতন্ত্র কার্যকর থাকায় সরকার কৃষি সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সচলতার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। বাজার ব্যবস্থা সম্প্রসারণশীল হলেও এখন পর্যন্ত কৃষির প্রধান সেবাদানকারী এবং ঋণ সরবরাহকারী সরকার। এনজিও এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলো এগিয়ে এলেও কৃষিতে সেবা ও সরবরাহের প্রধান খেলোয়াড় এখন পর্যন্ত সরকারই। ফলে বাজার ব্যবস্থা থেকে যে উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয় তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
শ্রমমূল্য বৃদ্ধি বিগত আশি এবং নব্বইয়ের দশকে শ্রমমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রুতগতিতে। এক সময় কৃষিতে শ্রমমূল্য বেঁধে দেওয়ার মতো একটি হাস্যকর সিদ্ধান্তই সরকারকে নিতে দেখা গেছে। এখন কৃষির অন্যতম প্রধান ঝুঁকিতে পরিণত অথি শ্রমমূল্য। কারণ অধিক শ্রমমূল্য চাহিদা জোগানের নীতির ভারসাম্য অতিক্রম করে গেলে এক সময় বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর পরিণতিতে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা ১৯৯০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়াতে ঘটেছিল। যা হোক কৃষিশ্রমের অধিক মূল্যবৃদ্ধিতে প্রান্তিক দরিদ্রদের জীবন মানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাদের আয় বেড়েছে। সামান্য হলেও তাদের পছন্দের সম্প্রসারণ ঘটেছে যা গণতন্ত্রায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিষয়টি দারিদ্রের ক্ষমতায়নে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যেতে পারে। এর অন্যতম প্রধান কারণ পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৮ মিলিয়ন শ্রমিক। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একজন বিশেষজ্ঞ ড. মাহবুব হোসেন মনে করেন বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শ্রমমূল্য এবং উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ ভারসাম্যহীন শ্রমমূল্য উৎপাদন খরচ বাড়াবে, উৎপাদন খরচ অধিক বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন কমবে, উৎপাদন কমলে আবার দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে (হোসেন, ২০০৩:১Ñ৩৫)। যাহোক বিগত দশকগুলোতে শ্রমমূল্য বৃদ্ধি পাওয়াতে গ্রামীণ সমাজে প্রান্তিক মানুষদের জীবনমান বৃদ্ধি পেয়েছে।
পুঁজিঘন ও প্রযুক্তিঘন উৎপাদন : বিগত ষাটের দশকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়ে এখন তা প্রায় শতভাগ বি¯তৃতি লাভ করেছে। প্রযুক্তি ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় পুঁজি ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য প্রন্তিকীকরণ আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ তার হাতেই প্রায়ই বিনিয়োগের মতো যথেষ্ট অর্থ থাকে না। ফলে তাকে ঋণের জন্য এনজিও বা মহাজনের কাছে হাত বাড়াতে হয়। তা ছাড়া প্রযুক্তি ঘনত্ব উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে বটে কিন্তু এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কর্পোরেট পুঁজির সাথে বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকের সংযোগ ঘটেছে। সিনজিনটা, এসিআইয়ের মতো মেট্রোপলিটন পুঁজির মালিকরা কৃষিকেন্দ্রিক বিনিয়োগ করছে। এইচএসবিসি, সিটিএনএ’র মতো কর্পোরেট পুঁজির মালিকরা আফতান ফার্ম, প্রাণ এদের মাধ্যমে কৃষির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। এই প্রক্রিয়া আরো জোরদার হলে এখন কৃষকের তার জমি এবং ফসলের ওপর যতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে তা থাকবে কি না সন্দেহ আছে। কারণ এখন কৃষক তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় নীতি যতটুকু প্রভাবিত করতে পারে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়তো  জারি রাখতে পারবে না। যদিও এই আন্তর্জাতিক পুঁজির সংযোগের কারণে আপাতত কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলে পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর দ্বারা গ্রামীণ শ্রেণি কাঠামোও প্রভাবিত হচ্ছে। কারণ এর দ্বারা একটি নতুন ব্যবসায়ী সরবরাহ-ভোগকারী শ্রেণি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজকাঠামোর পরিবর্তন সম্পর্কে সমাজ চিন্তাবিদ বদরুদ্দীন উমরের একটি বিশ্লেষণ প্রণিধানযোগ্য। পর্যবেক্ষণটি নিচে উল্লেখ করা হলÑ
* বাংলাদেশের ট্রেডিং বুর্জোয়া নিয়ন্ত্রণাধীন একটি দেশ। জাতীয় অর্থনীতির মতো কৃষিও এদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
* কৃষিতে যে পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে সে পরিমাণ উদ্বৃত্তও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সে উদ্বৃত্ত অকৃষি খাতে বিনিয়োজিত হচ্ছে। গ্রামে এলিট কারা? আগে এটা ছিল জমির মালিক সামন্তরা, পাকিস্তান আমলে ছিল জোতদার মহাজন, এখন হচ্ছে ব্যবসায়ী ভূমি মালিক। এরা হচ্ছে গ্রাম-বাংলার নতুন এলিট।
* কৃষির উদ্বৃত্ত শিল্প বা শিক্ষায় নিয়োজিত না হয়ে উদ্বৃত্ত শ্রম পুঁজি গ্রামের মধ্যেই ঘুরপাক হচ্ছে।
*  ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া ক্রমবর্ধমান বর্গাচাষি কোনো শ্রেণি নয় বরং এরা ভূমিহীন শ্রমিক।
* এই কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে মারাত্মক শ্রেণি চেতনার অনুপস্থিতি বিদ্যমান (উমর, ২০০৮:১১৬)।
উপর্যুক্ত পর্যবেক্ষণের সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত না হলেও বাংলাদেশি সমাজের পরিবর্তন পর্যালোচনা করতে গেলে এই পর্যবেক্ষণ মূল্যবান।
উপর্যুক্ত আলোচনার সাথে আমরা কিছু উপাদান যোগ করতে চাই কারণ তা না হলে গ্রামীণ শ্রেণিবিন্যাস বা স্তরবিন্যাস আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সেগুলো নিুরূপ:
১. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা ও বিত্তের একটি বলয় তৈরি হয়েছে। যারা গ্রামের ক্ষমতা কাঠামোকে প্রভাবিত করার সামর্থ্য রাখে।
২. গ্রামকেন্দ্রিক ঋণনির্ভর নানা রকম এনজিও কার্যক্রমের বিস্তার। এর মধ্যে কিছু আছে শুধুই বাণিজ্যকেন্দ্রিক আবার কিছু আছে আদর্শকেন্দ্রিক। কিছু আছে অতি বাম আবার কিছু আছে অতি ডান। যদিও এদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বাণিজ্য। এনজিও সংযোগে অর্থবিত্তের একটি নতুন সঞ্চালন পথ তৈরি হয়েছে।
৩. উন্নয়ন কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্বচ্ছ সম্পর্ক গ্রামীণ শ্রেণি কাঠামোতে নতুন বিন্যাসের সূচনা করেছে।
৪. অচাষি ভূমি মালিক শ্রেণী যেমন চাকরিজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এরা গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক উপাদান।
৫. অকৃষি পেশায় ক্রমবর্ধমান হারে অর্থাগম কৃষির বাইরে অন্যান্য পেশার গুরুত্ব বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। যেমন মাছ চাষ, পোলট্টি, ডেইরি, পশুপালন ছাড়াও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প ও ব্যবসার প্রসার নতুন মাত্রা যুক্ত করছে।
উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের স্তরবিন্যাস নিুলিখিতভাবে গড়ে উঠছে :
১. উচ্চবিত্ত শ্রেণি: ব্যবসায়ী ভূমি মালিক (শস্য ব্যবসা, সার, ওষুধ, ইট, নির্মাণসামগ্রী ইত্যদি), অচাষি শিক্ষিত চাকরিজীবী ভূমি মালিক, (শিক্ষক, আধা দক্ষ পেশাজীবী ইত্যাদি), স্থানীয় পরিষদের সদস্য, রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃত্ব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদাধিকারীগণ। যেমন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদের সদস্যবৃন্দ। ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ সমন্বয়ে উচ্চবিত্ত শ্রেণি গঠিত।
২. মধ্যবিত্ত শ্রেণী: মধ্য পর্যায়ের মালিক কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ইস্কুল শিক্ষক, সম্প্রসারণশীল অকৃষি পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ যেমন দোকানদার, পোলট্টি-মাছ চাষি, ইত্যাদি শ্রেণি; এদের একটি অংশ আবার বিদেশফেরত। অল্প দক্ষতাসম্পন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, দালাল, ফটকাবাজ, রাজনৈতিক টাউট, ইজারাদার, তেলকল, আটাকল ইত্যাদির মালিক, সেচযন্ত্রের মালিক ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ২য় শ্রেণিটি গঠিত।
৩. নিুবিত্ত শ্রেণি: বর্গাচাষি, ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, অন্যান্য সেবামূলক কাজে নিয়োজিত শ্রমিক। ঐতিহ্যগত পেশায় নিয়োজিত শ্রেণিসমূহ যেমন নাপিত, জেলে, ধোপা, তাঁতি, মুচি, পরিবহন শ্রমিক ইত্যাদি নিয়ে নিুবিত্ত শ্রেণি গঠিত।
ভারতের বর্ণপ্রথা : সমাজবিজ্ঞানীদের নিকট বিশেষ কৌতূহল এবং আগ্রহোদ্দীপক একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ভারতের হিন্দু সমাজে প্রচলিত বর্ণপ্রথা (পধংঃব)। বর্ণপ্রথাকে ধর্মীয় ভাবধারা বা বিশ্বাস দ্বারা নির্ধারিত একটি সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করা যায়। তবে কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী এটাকে একটি সামাজিক শ্রমবিভাজন (ঝড়পরধষ উরারংরড়হ ড়ভ ষধনড়ৎ) ব্যবস্থা বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেহেতু বর্ণপ্রথার মৌল ধারণায় মতভিন্নতা রয়েছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবে সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য বিদ্যমান। সমাজবিজ্ঞানীদের যে দলটি মনে করেন এটা বিশ্বাস নির্ধারিত তাদের মতে ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা চালিত, জন্মসূত্রে নির্ধারিত, প্রায় অপরিবর্তনীয় সামাজিক স্তরবিন্যাস ব্যবস্থাই বর্ণপ্রথা। এ মত পোষণকারীদের মধ্যে রয়েছেন আর এম ম্যাকাইভার, টি বি বটোসোর প্রমুখ। আর যারা মনে করেন এটা সামাজিক শ্রমবিভাজন ব্যবস্থা তাদের মতে জন্মসূত্রে নির্ধারিত ব্যক্তির শ্রমদান প্রথা আর শ্রমদান পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত ব্যক্তিবর্গের সামাজিক বিন্যাসই হচ্ছে বর্ণপ্রথা। সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে এম এন শ্রীনিবাস, এ আর দেশাই প্রমুখ এ মত পোষণ করে থাকেন। বর্ণপ্রথার সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে এটার উদ্ভব কীভাবে ঘটেছে এবং প্রাচীন ভারতীয় কাব্য বা ধর্মশাস্ত্রে এটার ব্যাখ্যা কীভাবে দেওয়া হয়েছে সে আলোচনাও প্রাসঙ্গিক।
বহু প্রাচীনকাল হতে জাতি বর্ণপ্রথা ভারতীয় সমাজে প্রচলিত আছে। কখন কীভাবে এ প্রথার উদ্ভব ঘটেছে তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয় নি। সমাজের অন্যান্য ব্যবস্থা ও আচার প্রথার মতো জাতি বর্ণ প্রথারও কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছে কালক্রমে। তাই বলা যায় সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জাতি বর্ণপ্রথার তাৎপর্য বুঝতে হলে এ প্রথার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা আবশ্যক যা এ সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়।
পরিমল ভূষণ কর ঋগবেদের পুরুষ সুক্তের মন্ত্র উদ্বৃত করে বলেছেন সেই বিরাট পুরুষের “ব্রাহ্মণ মুখ ছিলেন, রাজন্য বাহুস্বরূপ ছিলেন, ঊরু বৈশ্য ছিলেন, এবং পদদ্বয় হইতে শূদ্র জাত হইয়াছিলেন” (কর, ১৯৯২ : ২০৪)। গীতায় শ্রী ভগবানের উক্তি মতে বলা হয়েছে “আমি গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে চাবি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) সৃষ্টি করিয়াছি” (কর, ১৯৯২:২০৪)। পুরুষ সুক্তের মন্ত্র ব্যাখ্যা কলে নির্মল কুমার বসু যে মত ব্যক্ত করেন তা হল চারটি বিশেষ গুণসম্পন্ন এবং বিভিন্ন মাত্রার সংযাগের ফলে চার বর্ণের মধ্যে গুণের তারতম্য দেখা যায়। প্রাচীন ভারত বর্ষের বিভিন্ন জাতের গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে সে জাতির কর্ম উল্লিখিত চার বর্ণের কর্মের সাথে মিল না থাকলে সে জাতি মিশ্র গুণসম্পন্ন ধরে নেওয়া হত। তবে এ ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয় তাদের বর্ণ ও সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে। মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, গৌতম প্রভৃতি স্মৃতিকারগণ এ নিয়ে যে মতামত দেন তা প্রণিদানযোগ্য। মনু সংহিতায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে প্রত্যেক জাতির নির্দিষ্ট বৃত্তি ছিল এবং স্মৃতিকারগণ বৃত্তির ভিত্তিতে সে জাতির বর্ণ ও সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ করে দিতেন। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে প্রাচীনকালে কিছু গুণকে উত্তম এবং কিছু গুণকে অধম বলে গণ্য করা হত। একইভাবে কিছু বৃত্তিকে শুদ্ধ এবং কিছু বৃত্তিকে অশুদ্ধ বলে বিবেচনা করা হত। এভাবে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রএ চার বর্ণের সৃষ্টি হয়।
বর্ণপ্রথাকে ভালোমতে বুঝতে হলে এর কতিপয় সামাজিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বৈশিষ্ট্যগুলো নিুে আলোচনা করা হলÑ
ধর্মীয় ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত : ধর্মে বলা হয়েছে পরম ব্রহ্মা তার স্তুতিবাক্য পাঠ করার জন্য ব্রাহ্মণ, ধর্ম আর রাষ্ট্র রক্ষার জন্য ক্ষত্রিয়, এই দুই জাতির সেবা করার জন্য বৈশ্য এবং শূদ্র তৈরি করেছেন। তা ছাড়া হিন্দুধর্মের পুনর্জন্মাবাদের সাথেও এটা সম্পর্কিত। পুনর্জন্মবাদের ধারণা অনুযায়ী মানুষ পূর্বনির্ধারিতভাবেই কোনো কাষ্টে জন্মগ্রহণ করে। কারো পক্ষে এটা খন্ডন করার কোনো পথ নেই। ধর্ম মান্য করলে তার যে বি¯তৃত সম্পর্ক যা বিশ্বাস থেকে মানুষের উৎপাদন সম্পর্ক পর্যন্ত তা ছিন্ন করার কোনো পথ খোলা নেই।
বংশগতি এবং জন্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত : বর্ণ ব্যবস্থায় ব্যক্তি যে বর্ণে জন্মগ্রহণ করে তার বাইরে অবস্থান গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। জন্মের দ্বারাই নির্ধারিত হয় সে কোন বর্ণের অন্তর্ভূক্ত। বংশগতি হচ্ছে তার বর্ণ পরিচয়ের বাহক। অজানা সময় কাল থেকে একটি বংশধারা এই মর্যাদা ভোগ করে আসছে। অনন্তকাল পর্যন্ত বংশধারার মাধ্যমে এটা অব্যাহত থাকবে। ব্যক্তির মর্যাদা জন্ম দ্বারা নির্ধারিত। আধুনিক সমাজে ব্যক্তির মর্যাদা যেমন তার পারফরমেন্স দ্বারা নির্ধারিত এখানে তেমন নয়। যেমন একজন ব্যক্তি যদি এমপি বা সিনেটর হয়ে মর্যাদা এবং ক্ষমতা পেতে চায় তাহলে তাকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে, এমপি বা সিনেটর নির্বাচিত হতে হবে, তারপর সে ঐ ক্ষমতা বা মর্যাদা ভোগ করতে পারবে। বর্ণ ব্যবস্থায় সেটা সম্ভব নয়। একজন ব্রাহ্মণ হিসেবে জন্মগ্রহণ করলে যে কোনো অবস্থায়ই সে ব্রাহ্মণের জন্য নির্ধারিত মর্যাদা এবং পুরস্কার ভোগ করবে।
অন্তর্বিবাহ গোষ্ঠী : বর্ণ একটি অন্তর্বিবাহ গোষ্ঠী। এক বর্ণে জন্মগ্রহণ করে কেউ অন্য বর্ণে বিবাহ করতে পারে না। বর্ণের বাইরে বিয়ে করলে তার বংশগত পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়। শুধু যে বংশগত পবিত্রতাই মূল কথা তাই নয় এর সাথে আরো বহু আচার ব্যবস্থা জড়িত যার মাধ্যমে বর্ণ শুদ্ধতা রক্ষিত হয়। মূল বর্ণগুলোর মধ্যে আবার রয়েছে হাজার উপবর্ণ। এই উপবর্ণগুলো আবার নিজেদের গোত্রগত বিশুদ্ধতা রক্ষার নীতি মেনে চলে। তাদের আবার শুচিতা বা শুদ্ধতার বিশেষ রীতি রয়েছে। এই উপগোত্রগুলো আবার নিজেদের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য নানারূপ বিধিনিষেধ মেনে চলে যেমন সপি-, সগোত্র ইত্যাদি সংক্রান্ত আচার বিধি। এজন্য অধ্যাপক জিসবার্ট বলেন, ‘‘অ ঢ়বৎংড়হ নড়ৎহ রহ ধ পধংঃব ৎবসধরহং রহ রঃ ভড়ৎ ষরভব; ফরবং রহ রঃ, ধহফ যরং পযরষফৎবহ, বীপবঢ়ঃ রহ বীঃৎধড়ৎফরহধৎু পধংবং ড়ভ সরীবফ সধৎৎরধমবং, ৎবসধরহ ধষংড় রহ রঃ ষবধফরহম ঃযবৎব নু ঃড় ঃযব পধংঃব ংঃধঃঁং ঃযধঃ ৎরমরফরঃু নু যিরপয রঃ যধং নববহ ংড় হড়ঃড়ৎরড়ঁং” (এরংনবৎঃ).
সমআহার্যতা : আহারবিহারের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ কিছু টাবু বা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে। এ ক্ষেত্রে কে কার সাথে খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে কে পারবে না কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। উচুঁ জাতির লোক নিচু জাতের রান্না করা খাবার খাবে না। এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা হয় তা না হলে উচুঁ জাতের পবিত্রতা বিনষ্ট হয়। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ এবং অব্রাহ্মণের মধ্যে এটা কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। এজন্য প-িতগণ বলে থাকেন হিন্দুস্তানে বর্ণপ্রথার ইমারতটি গড়ে উঠেছে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর। অধ্যাপন এন কে দত্ত বলেন, “ব্রাহ্মণের পদমর্যাদাই হল সকল জাতিভেদ প্রথার মূল ভিত্তিপ্রস্তর”। জাতিভেদ প্রথায় সমপাঙক্তেয়তার ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ থাকে। একজন ব্রাহ্মণ একজন নিচু জাতের লোকের সাথে একত্রে বা হাতের রান্না খাবে না, ছোঁয়া খাবার খাবে না। তার খাওয়া পাত্রে খাবে না, তার স্পর্শ করা খাবার খাবে না। এজন্য অধ্যাপক জিসবার্ট বলেন, ‘‘ঞযব পধংঃব ংঃৎঁপঃঁৎব ড়ভ ংড়পরবঃু রং ধ যরবৎধৎপযু ড়ৎ ংুংঃবস ড়ভ ংঁনড়ৎফরহধঃরড়হ যবষফ ঃড়মবঃযবৎ নু ঃযব ৎবষধঃরড়হং ড়ভ ংঁঢ়বৎরড়ৎরঃু ধহফ রহভবৎরড়ৎরঃু ধঃ ঃযব ধঢ়বী ড়ভ যিরপয ধৎব ঃযব ইৎধযসরহ” (এরংনবৎঃ).
আচরণ রীতি এবং বর্ণ পঞ্চায়েত : বর্ণগুলোর নিজস্ব মর্যাদা রয়েছে এবং এই মর্যাদার ব্যাপারে তারা সচেতন। এই মর্যাদা রক্ষার জন্য তারা বিশেষ রীতি মেনে চলে। তারা মনে করে তাদের এই মর্যাদা এবং আচরণ পরস্পর সম্পর্কিত। আচরণবিধি, নৈতিকতার মানদ- এগুলোর ব্যত্যয় ঘটলে তার মর্যাদারও ব্যত্যয় ঘটে। সুতরাং আচরণবিধি এবং মর্যাদার বিষয়টি দেখভাল করার জন্য একটি বর্ণ পঞ্চায়েত (ঈধংঃব ঈড়ঁহপরষ) থাকে। এটা অবশ্য সর্বোচ্চ শ্রেণি অর্থাৎ ব্রাহ্মণ সমাজের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য। কারণ যেহেতু নিু বর্ণগুলো একধরনের বঞ্চনার মনোভাব নিয়ে সমাজে বসবাস করে তাই আচরণরীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কিছু শিথিলতা দৃশ্যমান। কারণ সকল সমাজেই নিুবর্গের মানুষেরা সমাজের আচরণীয়গুলো পালনের ক্ষেত্রে কম রক্ষণশীল হয়ে থাকে। এই বর্ণ পঞ্চায়েতের কাজ হল একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা পালন করা। যাতে করে বর্ণের সদস্যরা তাদের আচরণ রীতি লঙ্ঘন করতে না পারে। আর যদি তা করে তাহলে তার জন্য সামাজিক দ-ের বিধান করা। বলা বাহুল্য যে এই বর্ণ পঞ্চায়েত এবং আচরণ রীতি ব্যাপারটাও কেন্দ্রে রয়েছে ব্রাহ্মণ সমাজ এবং তাদের কৌলীন্য ও মর্যাদার ধারণার মিথ। অধ্যাপক জিসবার্ট মনে করেন, ‘‘ঃযব ষধংঃ ভবধঃঁৎব ড়ভ ঃযব পধংঃব ড়িৎঃয পড়হংরফবৎরহম রং বীরংঃরহম রিঃযরহ রঃ ড়ভ ধহ ড়ৎমধহ রিবষফরহম ধ াধৎুরহম ফবমৎবব ড়ভ ধঁঃযড়ৎরঃু যিরপয পড়সঢ়বষং ড়নবফরবহপব ভৎড়স ঃযব পধংঃব সবসনবৎং” (এরংনবৎঃ).
সামাজিক গতিশীলতার অনুপস্থিতি : গুণগত উৎকর্ষের কারণে সমাজে মানুষেরা উচ্চতর মর্যাদা এবং পুরস্কারগুলো ভোগ করবে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বর্ণ ব্যবস্থায় তা সম্ভব হয় না। এখানে বিশেষ পুরস্কার বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত থাকে। এর ফলে সমাজের নিু শ্রেণিগুলোর মধ্যে উচ্চতর অর্জন প্রেষণা কাজ করে না। সমাজ হয়ে পড়ে অচলায়তন, বদ্ধ। এখানে সর্বস্তরের মানুষের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয় না। মানুষের উচ্চ অর্জন প্রেরণা হচ্ছে সমাজ উন্নয়নের চাবিকাঠি। যেহেতু বর্ণ ব্যবস্থায় ব্যক্তির মর্যাদা এবং পুরস্কার শ্রম এবং মেধার সাহায্যে অর্জন করা যায় না তাই সার্বিকভাবে সামাজিক সচলতার উপস্থিতি এখানে লক্ষ করা যায় না। ভারতীয় সমাজ চিন্তাবিদ অধ্যাপক এন কে দত্ত মনে করে, ‘‘--নরৎঃয ধনড়াব ধষষ ফবপরফবং ধ সধহ রহ পড়হহবপঃরড়হ রিঃয যরং পধংঃব ভড়ৎ ষরভব, ঁহষবংং বীঢ়বষষবফ ভড়ৎ ারড়ষধঃরড়হ ড়ভ যরং পধংঃব ৎঁষবং, ধহফ ঃযধঃ ৎবহফবৎং ঃৎধহংরঃরড়হ ভৎড়স ড়হব পধংঃব ঃড় ধহড়ঃযবৎ, যরময ড়ৎ ষড়,ি রসঢ়ড়ংংরনষব.” (ঘ.ক উঁঃঃধ).
পেশাগত বিভাজন : বর্ণ ব্যবস্থায় বর্ণ দ্বারা নির্ধারিত হয় ব্যক্তির পেশা। এখানে ব্যক্তির মেধা অনুযায়ী পেশা নির্বাচনের কোনো অধিকার ব্যক্তির থাকে না। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে মেধা বিকাশের অন্তরায় হিসেবে বর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেশা এখানে জন্মগত এবং বংশগতভাবে নির্ধারিত হয়। সমাজ থেকে ব্যক্তির ওপর এক ধরনের প্রত্যাশার বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয় সে তার গোত্র বা বর্ণের পেশাই গ্রহণ করবে। ব্যক্তির পক্ষে কদাচিৎ তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তির মেধা, যোগ্যতা, শ্রমকুশলতা, আগ্রহ, সৃজনশীলতা কোনো গুরুত্ব পায় না। তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যারা পরিচ্ছন্ন কর্মী তারা তাই কমে যাচ্ছে, যে কাঠের কাজ করে সে তাই করে যাচ্ছে, যে মাছ ধরে বংশপরস্পরায় তারা ঐ পেশা পরিবর্তনের কোনো চিন্তাই করে না। অধিকতর দক্ষতাসম্পন্ন পেশার ক্ষেত্রে এটা যেমন একটি অন্তরায় তেমনি কৃষির মতো পেশার ক্ষেত্রে এটা অধিকতর উৎপাদন সহায়ক বলেই মনে হয়। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অনুপস্থিতি কৃষির মতো পেশায় বংশপরস্পরায় লালিত লোকপ্রজ্ঞা (ঋড়ষশ ডরংব) অত্যন্ত সহায়ক। কারণ হাল আমলে দেখা যাচ্ছে অনেক বন্যা বা খরায় টেকসই ধানের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথবা বিলুপ্তপ্রায়। বংশগত পেশা এখানে জ্ঞান এবং পরিবেশের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
সামজিক বিচ্ছিন্নতা : বর্ণপ্রথা সমাজের অভ্যন্তরে দারুণ রকমের সামাজিক বিচ্ছিন্ন তৈরি করে। যা সমাজের নিুবর্গের মানুষদের সামাজিক সেবা এবং পণ্যগুলোতে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। এটা তাদের মাঝে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু অসামর্থ্য বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যেমন যে উৎস থেকে একজন ব্রাহ্মণ পানি উত্তোলন করে সেখান থেকে একজন দলিত পানি উত্তোলন করতে পারে না। কেরালাতে একজন নায়ার একজন নামবুদারি ব্রাহ্মণের নিকটে আসতে পারে কিন্তু তাকে স্পর্শ করতে পারে না। একজন ‘তিয়া’ একজন ব্রাহ্মণ থেকে ৩৬ পদক্ষেপ দূরে থেকে কথা বলবে এবং একজন পুলাইয়া একজন ব্রাহ্মণ থেকে ৯৬ পদক্ষেপ দূর থেকে কথা বলবে। এর চেয়ে কম দূরত্বে আসতে পারবে না। পেশোয়া শাসন আমলে মহারাষ্ট্রে মাহার এবং মঙ সম্প্রদায়ভূক্ত নিুবর্গের মানুষদের শুধু সকাল ৯টার পর এবং বিকাল তিনটার আগে পুনা গেটে আসার অনুমতি ছিল কারণ এর আগে মানুষের ছায়া অনেক দীর্ঘ থাকে এবং কোনো ব্রাহ্মণ যদি সে ছায়া অতিক্রম করে তাহলে তার জাত নষ্ট হয়। অর্থাৎ পবিত্রতা নষ্ট হয়। এজন্য বর্ণপ্রথা একদিকে যেমন সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে তেমনি মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক প্রবেশাধিকারে (ঝড়পরধষ অপপবংংরনরষরঃু) প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
বর্ণ পদবি : সাধারণত প্রায় প্রত্যেক বর্ণ সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন কিছু বংশগত পদবি নির্দিষ্ট রয়েছে। যেমন আচার্য, উপাধ্যায়, সেন, ঠাকুর, দাস, বৈদ্য, কর্মকার, বণিক, কৈবর্ত ইত্যাদি। যে গোষ্ঠীর লোকেরা আচার, পার্বণ, পূজা ইত্যাদিতে নেতৃত্ব দেন তারা আচার্য। যারা চিকিৎসাকে পেশা হিসাবে নিয়েছেন তারা বৈদ্য। যারা হস্তশিল্পকে পেশা হিসাবে নিয়েছেন তারা কর্মকার। যাদের পেশা মাছ ধরা এবং বিক্রি করা তারা কৈবর্ত। যাদের পেশা ব্যবসায় তারা বণিক। সাধারণত আচার্য, উপাধ্যায়, ঠাকুর তারা উচ্চ পর্যায়ভূক্ত ব্রাহ্মণ। এরা আর্য বংশ উদ্ভুত বলে দাবি করে থাকে। এদের পূর্বপুরুষ পশ্চিম থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে বলে মনে করা হয়। আর দাস, বৈদ্য, কর্মকার, কৈবর্ত এরা শুদ্র বর্ণভূক্ত। এরা এদেশেরই আদি বাসিন্দা বলে মনে করা হয়। এরাই শ্রমে ঘামে সকল উৎপাদন এবং বণ্টনের চাকা সচল রাখে।
বর্ণপ্রথার উৎপত্তি ঃ (১) ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় আর্যরা ছিল মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি। তারা ক্রমাগত পূর্বদিকে অগ্রসর হতে হতে সিন্ধু নদ পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। যেহেতু ভারতের তৎকালিন দ্রাবিড়, কোল, ভিল, সাঁওতাল প্রভৃতি জাতি ছিল কৃষিজীবী এবং খাদ্য আহরক যারা খাদ্য আহরণ অর্থনীতির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের প্রযুক্তি ছিল অতীব প্রাথমিক পর্যায়ের। পশু পালন এবং শিকারজীবী আর্যরা ছিল যোদ্ধা জাতি। দীর্ঘকায় অশ্বচারি আর্যরা দ্রুতগতিতে ভারতে প্রবেশ করে অপেক্ষাকৃত ক্ষীণকায় নিু প্রযুক্তির ভারতের আদিবাসীদের সহজে পরাভূত করে দাসে পরিণত করে। এবং এই দাসত্বকে স্থায়ীত্ব দান করার জন্য এর একটা সামাজিক ব্যাখ্যা দান করে। যার বর্হিপ্রকাশ হল বর্ণপ্রথা। এটা ইউরোপীয়দের বর্ণবাদের মতোই নিবর্তনমূলক প্রথা। কারণ সাধারণত কোনো ব্রাহ্মণ ক্ষুদ্র, কৃষ্ণকায় হয় না আবার কোনো শূদ্র দীর্ঘ নাসিকা সংবলিত দীর্ঘদেহী শ্বেতকায় হয় না। যেহেতু আর্যরা এমন অঞ্চল থেকে এসেছিল যেখানে জীবন ছিল সংগ্রামমুখর, গতিময় আর আহার্যের স্বল্পতা। চারণভূমির জন্য কিংবা পালিত পশুর নিরাপত্তার জন্য প্রায়ই তাদের যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হতে হত। সংগ্রামী জীবন তাদের দিয়েছিল উচ্চ মেধা এবং কল্পনা শক্তি। তাই সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত কৃষিজীবী ভারতীয়দের তারা সহজে পরভূত করতে পেরেছিল। আর্যরা দেখল এখানে খাদ্যের প্রাচুর্য রয়েছে যার জন্য তাদের আজীবন সংগ্রাম করতে হত। তাই চতুর আর্যরা বিজিত কৃষিজীবীদের তাদের স্বপেশায় নিয়োজিত রেখে উৎপাদনের চাকা সচল রাখল এবং এমন এক কর্মকৌশল উদ্ভাবন করল যাতে করে তারা কখনই সমাজের উপরিকাঠামোর অংশিদারিত্ব দাবি না করে। এর ফলে এমন এক অভিনব ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটল যার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের নিশ্চয়তা অটুট থাকল যার জন্য আর্যদের অহর্নিশি সংগ্রাম করতে হত। আবার সামাজিক শৃঙ্খলা বিধানের দূরহ কার্যটিও আনায়াসে সমাধান হয়ে গেল যার জন্য পৃথিবীর প্রায় সকল সমাজকে বাড়তি অর্থ এবং শ্রম নিয়োজিত করতে হত। এভাবেই আর্যরা আদিবাসী ভারতীয়দের কার্যত দাসে পরিণত করল।
এখানে লক্ষণীয় যে রোম এবং গ্রিক সভ্যতা ছিল দাস নির্ভর। কিন্তু দাস এবং দাস মালিকদের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং দাস পোষণ লাভজনক না থাকায়, ঘন ঘন দাস বিদ্রোহের কারণে রোম এবং গ্রিক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু বর্ণপ্রথা যারা প্রবর্তন করেছিল তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই দুই সমস্যার সমাধান একত্রে করতে সক্ষম হয়েছিল। একদিকে তারা যেমন বিদ্রোহ বিপাকের সম্মুখীন হয় নি তেমনি উৎপাদনের ভারসাম্য চমৎকারভাবে রক্ষিত হয়েছিল। ফলে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার বছর পূর্বে ভারতে প্রবেশের পর থেকে আর্যদের কখনই কোনো বড় চ্যালেঞ্জার মুখোমুখি হতে হয় নি। তাই বলা যায় ইউরোপের রোমান বা গ্রিক দাস ব্যবস্থার চেয়ে ভারতীয় বর্ণপ্রথা অনেক বেশি টেকসই।
ঊ.ঝবহবৎঃ তাঁর গ্রন্থ ঈধংঃব রহ ওহফরধ তে উল্লেখ করেছেন যে ভারতে জাত এর উদ্ভব হয়েছে কুল এবং কুলদেবতার অর্চনাকে কেন্দ্র করে। ইবিটসনের মতে আর্যদের সাথে অনার্যদের সংঘাত এবং সংমিশ্রণের ফলে বর্ণপ্রথার উদ্ভব ঘটেছে। রিজলে মত প্রকাশ করছেন ভারতে জাতের উদ্ভব ঘটেছে সংঘাত এবং অনুলোম বিবাহের মাধ্যমে। নেসফিল্ড মত প্রকাশ করেছেন যে পেশার বিভাজন থেকেই জাত বা বর্ণের উদ্ভব ঘটেছে। ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী জি এস ঘুরে তাঁর বিখ্যাত ঈধংঃব, ঈষধংং ধহফ ঙপপঁঢ়ধঃরড়হ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে ভারতে প্রবেশের পর আর্যরা তাদের রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য আর্য পুরোহিতরা পুরো ব্যবস্থাটির উদ্ভব ঘটান। অনেকেই এই ব্যাখ্যাটি আংশিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। তবে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মত প্রকাশ করেছেন যে ভারতে প্রবেশকালে আর্যরা অনার্যদের পরাভূত করার মাধ্যমে তাদের স্থায়ীভাবে নিুবর্গে প্রেরণ করে। সমাজবিজ্ঞানী এ আর দেশাই এর একটি উদ্ভৃতি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তিনি বলেন, “প্রাক-ব্রিটিশ যুগ থেকে কতকগুলো পীড়নমূলক ও অগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকার সূত্রে হিন্দু সমাজে প্রচলিত ছিল। হিন্দুদের একটা গোষ্ঠীকে অস্পৃশ্য বলে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হত। অস্পৃশ্যরা কতকগুলো প্রাথমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলÑ যেমন সর্বজনীন মন্দিরে প্রবেশাধিকার, সর্বসাধারণের ব্যবহার্য কূপ অথবা জলাশয় ব্যবহার করার অধিকার অস্পৃশ্যদের ছিল না। উপরন্তু তাদের স্পর্শেই উচুঁ জাতের লোকেরা অশুচি হয়ে যেত। এইসব চূড়ান্তরূপে অমানাবিক সামাজিক পীড়ন তাদের উপর করা হত। অস্পৃশ্যরা হিন্দু সমাজ থেকে পরিত্যক্ত হয়েছিল। হিন্দুসমাজের অন্তর্গত হয়েও তারা ছিল হিন্দু সমাজের বাইরে। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে দেখলে বলা যায় অস্পৃশ্যতা হল ভারতবর্ষে আর্য অধিকারের সামাজিক পরিণাম” (দেশাই, ১৯৮৭:২২৮-২২৯)। বক্তব্যটি আর্য অধিকারের পরিণাম সংক্রান্ত ব্যাখ্যাটি সুস্পষ্টরূপে সমর্থন করে।
ব্যাখ্যার দ্বিতীয় ধরনটি হল ধর্মভিত্তিক। হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধান মোতাবেক সমাজকে চারটি ভাগে ভাগ করার বিষয়টি উল্লেখ পাওয়া যায়। ঋগবেদের পুরুষ সুক্তের ভাষ্য অনুযায়ী প্রজাপতি ব্রহ্মাই হলেন চর্তুবর্ণের সৃষ্টিকর্তা। পরম ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রীয়, উরু থেকে বৈশ্য এবং পদযুগল থেকে শূদ্রের সৃষ্টি। গীতায় ভগবানের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “চতুর্বনংময়া সৃষ্টং গুণ কর্ম বিভাগশ” অর্থাৎ গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে চারটি বর্ণ সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং ব্যক্তির গুণের উপর নির্ভর করে তাকে কোনো একটি বর্ণের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ভগবানই নির্ধারণ করে দিয়েছেন কে কোন গুণের অধিকারী তাকে সেই বর্ণে জন্ম দেওয়া হয়েছে। হিন্দু শাস্ত্রে ‘বৃ’ অর্থ বরণ বা নির্বাচন। অর্থাৎ বৃত্তি নির্বাচন। ব্রাহ্মণের বৃত্তি হল যজন-যাজন এবং অধ্যাপন। ক্ষতিয়ের কাজ রাজ্য রক্ষা এবং যুদ্ধ। বৈশ্যের বৃত্তি ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকার্য, গোপালন প্রভৃতি। শূদ্রের কাজ উপর্যুক্ত তিনটি বর্ণের সেবা করা। যেমন কর্মকার, স্বর্ণকার, জেলে, ক্ষৌরকার ইত্যাদি। এই চর্তুবর্ণের বাইরে আর একটি বর্ণ রয়েছে যাদেরকে বলা হয় অচ্ছুত বা অস্পৃশ্য। যাদের স্পর্শ করলে জাত থাকে না। এটা উপর্যুক্ত চারটি বর্ণের বাইরে। এ জন্য কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী বলেন বর্ণ ব্যবস্থা পাঁচটি বর্ণ নিয়ে গঠিত। অচ্ছুতদের কাজ হল একেবারেই সমাজের সর্বনিু স্তরের কাজ। যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, জুতা প্রস্তুত ইত্যাদি। পূর্বে এদেরকে মূল গ্রামে বাস করতে দেওয়া হত না। এরা গ্রামের বাইরে এক কোণে বাস করত। ভারতীয় রাজনীতিবিদ এম কে গান্ধি এদের নাম দিয়েছিলেন হরিজন বা ঈশ্বরের পুত্র। ভারতের মোট হিন্দু জনসংখ্যার প্রায় ২৫/২৬ শতাংশ হল হরিজন বা অচ্ছুত সম্প্রদায়ভূক্ত। আর প্রায় ২৭ শতাংশ প্রথম দুটি বর্ণভূক্ত অর্থাৎ ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়। বাংলাদেশে হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণের সংখ্যা কত তা সঠিকভাবে জানার কোনো উপায় নেই। তবে ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে হবে বলে অনুমান করা যায়। কৌতূহলের ব্যাপার হল বাংলাদেশের হিন্দুদের মধ্যে অচ্ছুতদের সংখ্যাও অতি নগণ্য। এদেশের হিন্দু জনসংখ্যার পুরোটাই গঠিত হয়েছে শূদ্র বর্ণ দিয়ে। এটাও প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের সমাজ আদিতেই একটি সাম্যভিত্তিক সমাজের কাছাকাছি ছিল। পেশাগতভাবে এখানকার মানুষ সমতার নীতিতে বিশ্বাসী ছিল।
বাংলাদেশে হিন্দু ধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যবাদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক দিনেশ চন্দ্র সেন। তিনি তাঁর বৃহত বঙ্গ গ্রন্থে বলেন, “পরবর্তীকালে জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম বন্যায় পূর্বভারত (বাঙ্লাদেশ) ভাসিয়া গিয়াছিল, সুতরাং ব্রাহ্মণেরা এই দেশকে তাহাদের গ-ির বর্হিভূত করিতে চেষ্টিত হইয়াছিলেন। তাহারা প্রাচীন শাস্ত্রেও অনেক শ্লোক প্রক্ষিপ্ত করিয়া সমস্ত পূর্বভারতকে কলঙ্ক পঙ্কিত করিয়াছিলেন; অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ, সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত বৃহত জনপদকে তাহারা আর্যগ-ির বহির্ভূত বলিয়া নির্দেশ করিয়া ছিলেন......এই জন্য হিন্দুদিগের দ্বারা এইদেশ নিষিদ্ধ হইয়াছিল” সেন, (১৩৪১:৬) তিনি আরো বলেন, “আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে যে ভারত যুদ্ধের প্রাক্কালে পূর্ব ভারত অনেক পরিমাণে নব প্রবর্তিত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরোধী হইয়া পড়িয়াছিল...এই বিরুদ্ধতা উত্তর কালে বৌদ্ধ ও জৈন প্রাধান্যের যুগে পূর্ব ভারতকে কয়েক শতাব্দিকাল নব যুগের নিকট বর্জনীয় করিয়া তুলিয়া ছিল। .....হিন্দু বিদ্বেশের জন্যই আমরা এই দেশের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে এত অজ্ঞ ছিলাম।” (ঐ, পৃ.৭)। ড. হরপ্রশাদ শাস্ত্রি জাতপাত সম্পর্কে বলেন, “মেথর শব্দটি মহত্ত্বর শব্দের অপভ্রংশ বলিয়া মনে হয়। এদেশে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের পুনরুভ্যুদয়ে বিজিত বৌদ্ধদিগের প্রতি যেরূপ নিপীড়ন চলিয়াছিল তাহাতে বৈষ্ণবরা যদি সেই সকল হতভাগ্যের জন্য স্বীয় সমাজের দ্বার উদঘাটন না করিতেন তবে সেই শ্রেণীর সকলেই মুসলমান হইয়া যাইত”। তিনি আরো বলেন, “উহারা দেবতাগিকে অপদেপতা এবং অপদেবতাকে দেবতা করিয়া থাকেন, (ঐ, পৃ.১০) ব্রাহ্মণ ঘৃতদ্বারা প্রস্তুত পায়েস, মৃগমাংস, সুবর্ণ দান বৃশদান গ্রহণ করিতেন.... স্বীয় ভার্ষা (স্ত্রী) দান করে রাজা প্রশসিংত হয়ে থাকেন.... যে ব্রাহ্মণ বিদ্যাশ্যন্য তিনিও অন্যকে পবিত্র করিতে পারেন। ফলত ব্রাহ্মণ বিদ্যান হউন কি মূর্খ হউন তাহাকে পরম দেবতা স্বরূপ জ্ঞান করা বিধেয়। অগ্নি সংস্কৃতই হউন বা অসংস্কৃত হউন তাহার দেবত্ব লুপ্ত হয় না। যেমন তেজস্বী অগ্নি শ্মশানে অবস্থান করিলেও দৃষিত হন না। প্রভূত উত্তাপেও যজ্ঞগৃহে বিধিবত ব্যবহৃত হইতে পারেন। তদ্রুপ ব্রাহ্মণ যদিও সতত অনষ্ঠিকর কার্যে নিযুক্ত থাকেন, তথাপি তাহাকে পরম দেবতা স্বরূপ জানিয়া সমাদর করিতে হইবে” (মহাভারত, ১৪১ অধ্যায়) (ঐ. পৃ. ৪৮)।
বর্ণব্যবস্থা ও আধুনিক সমাজের পরিবর্তনশীলতা ঃ বর্ণব্যবস্থার প্রধান শক্তি ছিল অন্তর্গোষ্ঠী বিয়ে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ। সমাজের আধুনিকায়নের সূচনায় এই উপাদানগুলো কতিপয় সামাজিক ঘটনার দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যেমন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, নগরায়ন, শিল্পায়ন, নতুন আইনি কাঠামো, পরিবর্তীত উৎপাদন কাঠামো এবং সামাজিক আন্দোলন। অধ্যাপক এ আর দেশাই মনে করেন, “বর্ণপ্রথা হিন্দু সমাজের ইস্পাত কাঠামো বলে অবিহিত.... জাতপ্রথা ছিল অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্বপরায়ণ। জাতসমূহ ক্রমপর্যায়ে বিন্যস্ত। প্রত্যেকটি জাতই ওপরের পর্যায়ে অবস্থিত জাতসমূহ থেকে নিকৃষ্ট এবং নিুতর পর্যায়ে অবস্থিত জাতসমূহ থেকে উৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হয়। ক্রমপর্যায়ে বিন্যস্ত জাতসমূহের মধ্যে কার কোন পর্যায়ভূক্ত জাতে জন্ম হয়েছে তাই দিয়ে তার মর্যাদা নির্ধারিত হত। কোনো একটি বিশেষ জাতে জন্ম হলে মর্যাদা তদনুসারে পূর্বনির্ধারিত বলে গণ্য হত। এই অবস্থার পরিবর্তন ছিল অসম্ভব। জন্মসূত্রে যে মর্যাদা মানুষ পেত মেধা বা ধনসম্পদ কিছু দিয়েই তার পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। অনুরূপভাবে যে জাতে যার জন্ম হয়েছে সেই অনুসারে তার বৃত্তিও পূর্ব নির্ধারিত থাকে। এক্ষেত্রে করবার কিছু নেই” (দেশাই, ১৯৮৭:২১০)।
অন্য একটি প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে। একটি দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারত একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৪৭ সালে। ব্রিটিশ শাসন পূর্বকালে ভারতের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক বিষয়াদি আইন দ্বারা চালিতও হলেও সমাজ পরিচালিত হত সম্পূর্ণ ধর্ম এবং ঐতিহ্য দ্বারা। ব্রিটিশরা অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্যমূলক সামাজিক বিষয়গুলো আইনের শাসনের আওতায় নিয়ে আসতে চেয়েছে। সেক্ষেত্রে তারা ভারতীয় সমাজের অগ্রসর শ্রেণির সমর্থন পেয়েছে। যেমন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। ফলে ব্রিটিশ আমলেই কতিপয় আইন প্রণয়ন করা হয় যা জাতি বর্ণ প্রথার অচালয়তনে সামাজিকভাবে আঘাত হানে। স্বাধীনতা আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এবং পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উজ্জীবিত। তারা অনুভব করেছিলেন বহুভাষী, বহুজাতি, বহুবর্ণের, বহুধর্মের দেশ ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হলে বৈষম্যমূলক সামাজিক চর্চাগুলো গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ধারায় উচ্ছেদ করতে হবে। তাই তারা নানারকম আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে সামাজিক গতিশীলতার পথে প্রতিবন্ধক প্রথাগুলো ক্রমান্বয়ে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে কয়েকটি আইনগত পদক্ষেপের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ১৮৫০, হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন ১৮৫৬, শিশু বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯, হিন্দু নারীসম্পত্তি অধিকার আইন ১৯৩৭ ইত্যাদি (রহমান, ১৯৯৭:৩৭৯)। যেহেতু পৃথিবীর বেশিরভাগ হিন্দু ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাস করে তাই এসকল আইন দ্বারা কোনো কোনো না কোনোভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ হিন্দু সমাজ প্রভাবিত হয়।
কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আরো কিছু আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয় যা শুধু ভারতীয় হিন্দু সমাজকেই প্রভাবিত করে। ভারতের বাইরে বাংলাদেশ পাকিস্তান ইত্যাদি দেশে বসবাসরত হিন্দুরা এর বাইরে থেকে যায়। যেমন হিন্দু বিবাহ আইন ১৯৫৫, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৬, হিন্দু দত্তক গ্রহণ ও পরিপালন আইন ১৯৫৬ (রহমান, ১৯৯৭:৩৮০)
ব্রিটিশ অধিকারের পর ভারতীয় সমাজে এসকল বিষয়গুলো ইউরোপিয়দের কাছে অভিনব বলে বিবেচিত হতে থাকে। উপনিবেশিক শাসকেরা যে সকল পরিবর্তন তাদের বাণিজ্যিক এবং সম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ঘটিয়েছিল শেষ পর্যন্ত তা বর্ণ বা জাতপাত শাসিত ভারতীয় সমাজের লৌহকঠিন আবরণে প্রবল ধাক্কা দিতে সক্ষম হয়। যে সকল আধুনিকীকরণের উপাদান ব্রিটিশ শাসক দ্বারা সমাজে সূচনা করা হয় তার ফলে জাতপাতে লৌহকঠিন দেয়াল খানিকটা নড়বড়ে হয় বটে কিন্তু এটাকে একেবারে ধ্বসিয়ে দিতে পারে নি। যাই হোক নিচে সে সকল উপাদান এবং তার পরিবর্তনশীলতা আলোচনা করা হল।
আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার : এদেশের ঐতিহ্যগত যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নৌকা, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, পালকি এবং পানির জাহাজ। যেখানে ছোঁয়াছোঁয়ি এড়িয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভ্রমণ সম্ভব ছিল। এখানে জাত্যভিমান বজায় রেখে চলাচল সম্ভব ছিল। তা ছাড়া সামন্ত সমাজে খুব একটা সামাজিক স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিত না। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি সম্পসারণ, নগরায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার মানুষের গতিশীলতা বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসা, প্রশাসনিক প্রয়োজন ইত্যাদি কারণেও মানুষকে প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। ব্রিটিশরা রেলওয়ে, ইঞ্জিন চালিত জাহাজ, মোটরগাড়ি, বিমান ইত্যাদি গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটায়। ফলে একজন বর্ণ হিন্দুর পক্ষে পালকিতে বা গরুর গাড়িতে জাত বাঁচিয়ে ভ্রমণ সম্ভব কিন্ত রেলগাড়ি বা বিমানে অন্যের ছোঁয়া এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একজন চরম শুচিবায়ুগ্রস্ত ব্যক্তিও অন্যের সাথে শরিকানা মেনে নিতে বাধ্য হয়। যেখানে একজন বর্ণ হিন্দুর ছায়া অতিক্রম করলে তার জাত যায় তাকে অনায়াসে একজন হরিজনের সাথে পাশের আসনে বসতে বাধ্য হতে হয়। কারণ একটি রেলগাড়ি একার জন্য কেনা সম্ভব নয়। সম্ভব হলেও বাস্তব সম্মত নয়। ফলে জাতপাতের বেড়াজাল এই গণ পরিবহণ ব্যবস্থার কারণে শিথিল হতে বাধ্য হয়।
গণতান্ত্রিক রাজনীতি : একদিকে আধুনিক রাজনীতির প্রসার ঘটতে থাকে অপরদিকে নিুবর্গের মানুষের মধ্যে অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ধীরে ধীরে এক ব্যক্তি এক ভোট ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ফলে একজন ব্রাহ্মণের ভোটের যে মূল্য একজন চ-ালের ভোটেরও সেই মূল্য। দু একজন আধুনিক শিক্ষিত নিুবর্গের মানুষ জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করে। যেমন বি আর অস্বেদকার, জয় প্রকাশ নারায়ন ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গ নিুবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বরকে উচ্চে তুলে ধরেন। হাল আমলে কে আর নারায়ন, মায়াবতি, লাল্লু প্রসাদ যাদব, মুলায়েম সিং যাদব, নিতিশ কুমার, প্রভৃতি অস্পৃশ্য সমাজের সদস্যরা সমাজের সর্বোচ্চ আচন অলংকৃত করেন। ফলে উচ্চ বর্ণের একাধিপত্যের মিথ ভেঙে যেতে থাকে। যেখানে একদা একজন উচ্চ বর্ণের হিন্দু চেয়ারে বসলে নিু বর্গের হিন্দুকে করজোরে দাঁড়িয়ে থাকা বিধেয় ছিল। সেখানে একজন মায়াবতির আগমন ঘটলে রাষ্ট্রীয় আচার মেনে সকলকে দাঁড়ানই নিয়ম। সুতরাং এখানে রাষ্ট্র ঐতিহ্যবাহি প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে পুনর্গঠনে ভূমিকা পালন করছে। এভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ধীরে ধীরে হলেও বর্ণ ব্যবস্থার কঠোরতা হ্রাসে সহায়তা করছে।
সামাজিক আন্দোলন : কিছু মহৎ প্রাণ ব্যক্তি এই জাতপাতের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন। এদের মধ্যে সর্বাধিক স্মরণীয় ব্যক্তি হচ্ছেন বাংলাদেশের রাজা রাহমোহন রায়। এছাড়াও বোম্বাই এর ‘প্রার্থনা সমাজ’ এবং পুনের জোতি রাও এর ‘সত্যসাধক’ আন্দোলন জাত পাতের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁদের মতে এই প্রথা মানবিক মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করছে। তারা মনে করেন কর্মবাদের মাধ্যমে মৃত্যুর পর মোক্ষলাভের আশায় অবমাননাকর জীবন মেনে নেওয়ার চেয়ে বাস্তব জীবনের সুখ সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাওয়া অনেক শ্রেয়। তারা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জাতবিভাজনের কড়া সমালোচনা করতে থাকেন। সত্যসাধক আন্দোলনকারীরা বিয়ের সাথে সম্পর্কিত ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করার জন্য ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের সহায়তা নিতে তার অনুসারিদের নিষেধ করেন। তিনি ধর্মীয় আচার পালনে ব্যাপক বাহুল্য অর্জন করে সহজ ও কম আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার তাগিদ দেন। কারণ তিনি মনে করতেন মানুষকে বর্ণবাদের বোঝা থেকে মুক্তি দিতে হলে আনুষ্ঠানিকতার বাহুল্য থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।
এর বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনও দেখা দেয়। দয়ানন্দ সরস্বতীর ‘আর্যসমাজ’ আন্দোলন, রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং তার শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ যে আন্দোলন গে তোলেন তাতে চর্তুবর্ণ প্রথাকে বহাল রাখার জন্য বক্তব্য প্রচার করা হয়। এর ফলে চর্তুবর্ণ প্রথা সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি বটে তবে এর যে লৌকঠিন বর্ম তা কিছুটা শিথিল হতে বাধ্য হয়। মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। এখন এর সমর্থকগণ তাদের বক্তব্য কিছুটা নমনীয়ভাবে উপস্থাপন করে থাকেন। তারা বলে থাকেন এটা সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য একটি শ্রমবিভাজন ব্যবস্থা মাত্র।
নগরায়ন : শিল্পায়ন ও নগরায়ন আধুনিক জীবনের বাস্তব ফল। নগরায়নের ফলে মানুষ আবেগ নির্ভর জীবনের চেয়ে বাস্তবতা নির্ভর জীবন প্রণালী বেছে নিতে বাধ্য হয়। এখানে নানা পেশার নানা রুচির মানুষ একত্রে বসবাস করতে বাধ্য হয়, একত্রে কাজ, একত্রে আহারবিহারে বাধ্য হয়। কলকাতা, মুম্বাই, মাদ্রাজ, সুরাট, আহমেদাবাদ, দিল্লির মতো জায়গায় কারো পক্ষে জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে চলা সম্ভব নয়। এই বৃহৎ শহরগুলো ধারণ করে বহুবিধ সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় উপাদান। শহর মানুষের নানাবিধ প্রয়োজন পূরণের বি¯তৃত সুযোগ তৈরি করে। কর্মের বি¯তৃত আঙিনা এখানে সংস্কৃতির সীমানা নির্ধারণ করে। শহর সভ্যতা মানুষের জীবনাচরণের এক নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করে যা চিরায়ত সামাজিক মূল্যবোধ থেকে ভিন্ন। তবে শহর সভ্যতা মানুষের বহুযুগ লালিত সংস্কারগুলোর মূল উৎপাদন করতে পারে না কিন্তু সেখানে একটা ঝাঁকুনি সৃষ্টি করতে পারে। যা প্রবল এবং দীর্ঘস্থায়ী। সংস্কার এবং গতিশীল বাস্তব মূল্যবোধগুলোর মধ্যে একটি অন্তর্লীন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যা সময়ের বহমানতায় যুক্তির মধ্যে আবেগকে বিলীন করে দেয়। এজন্য এম এন শ্রীনিভাস উল্লেখ করেন, ‘‘ঙহ ধ ষড়হম ঃবৎস নধংরং, যড়বিাবৎ, ংঁপয পড়হঃবীঃঁধষ াধৎরধঃরড়হ ঁংঁধষষু ঢ়ধাবং ঃযব ধিু ভড়ৎ ঃযব বাবহঃঁধষ ড়াবৎধষষ ংবপঁষধৎরুধঃরড়হ ড়ভ নবযধারড়ঁৎ” (ঝৎববহরাধং)। নগর জীবনের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের কারণেই কারো পক্ষে অন্য মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলানো বা নিজে বিচ্ছিন্ন থাকা কোনোটাই সম্ভব নয়। ফলে যে কোনো ধরনের আচরণের কঠোরতা এখানে শিথিল হতে বাধ্য। এজন্য শহর জীবনে বর্ণবৈষম্যের তীব্রতা সময়ের ব্যবধানে হ্রাস পায়।
শিল্পায়ন : শিল্পায়ন সমাজে নতুন সামাজিক সম্পর্কের সূত্রপাত করে। শিল্প মানেই দক্ষতানির্ভর কর্মসৃজন। ব্যক্তির শিক্ষা, কর্মক্ষমতা, দক্ষতার ওপর নির্ভর করে তার কর্মসংস্থান। অন্যদিকে শিল্পোদোক্তা, উৎপাদন কৌশল, কোম্পানির মুনাফা ইত্যাদি বিবেচনা করে কর্মী নিয়োগ দান করেন। এখানে কর্মী উদ্যোক্তার নিজ সম্প্রদায়ভূক্ত কি না এটা কোনো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। আবার শিল্প শ্রমিক বিপুল আয়তন কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত বেতনে কাঙ্খিত কাজ অনুসন্ধান করেন। তার পক্ষে নিয়োগদাতার জাতপাত বাছাই করা বাস্তবসম্মত নয়। অন্য বিবেচনায় বলা যায় শিল্প পরিবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষকে একত্রে কাজ করতে হয়। তাদের পক্ষে তার কর্মসঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা কদাচিৎ আশা করা যায়। এখানে আর্য-অনার্য, হিন্দু-মুসলিম অভিন্ন কর্মপরিবেশে কাজ করতে, আহার বিহারে বাধ্য হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা টাটা গ্রুপের মালিক রতন টাটা একজন অগ্নি উপাসক, তার করপোরেশনে কাজ করে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ। ভারতের সরকারি ক্ষেত্রে অন্যতম বৃহৎ চাকরিদাতা ভারতীয় রেলওয়ের শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এক সময় এসেছিল বিহারের বাস্তুচ্যুত মুসলমানদের মধ্য থেকে। কারো পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে যেহেতু একজন মুসলিম দান করছে আমি সেটা গ্রহণ করব না।
শিল্পের অন্য একটি দিক হচ্ছে অভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দরকষাকষি করা বা আন্দোলন করা। এখানে হিন্দু, মুসলিম কিংবা ব্রাহ্মণ, শূদ্রের কোনো ব্যাপার নেই। সবাই একত্রে অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করতে হয়। ফলে ইচ্ছা করলেও কারো পক্ষে জাতি মিশ্রণ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়। শিল্প যে মানুষের শুধু বস্তুগত অবস্থায় পরিবর্তন ঘটায় তাই নয় বরং ভাবগত জীবনেও পরিবর্তন ঘটায়। এখানে বিভিন্ন বর্ণের মানুষেরা একত্রে কাজ করার ফলে তাদের সামাজিক মিশ্রণ ঘটতে থাকে। বর্ণ ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী যে বর্ম অন্তর্বিবাহ তা খানিকটা দুর্বল হয়। এভাবে সংস্কারযুক্ত মূল্যবোধের পরিবর্তে মানুষ যৌক্তিক মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হতে থাকে। সুতরাং শিল্পায়ন জাতপাতের বন্ধনকে ক্রমাগত শিথিল করে দেয়।
আধুনিক আইন : আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনের উৎস হচ্ছে সংবিধান। যেখানে জনমতের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে থাকে। এখানে বিশ্বাস বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ অন্তত তত্ত্বগতভাবে নেই। পূর্বে যেসব বর্ণ পঞ্চায়েত ছিল সেখানে উচুঁ বর্ণের জন্য এক ধরনের আর নিচু বর্ণের জন্য ভিন্ন ধরনের প্রতিবিধানের ব্যবস্থা ছিল। বর্তমান সাংবিধানিক আইনে তা সম্ভব নয়। যদিও জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য এখনো বিদ্যমান কিন্তু আইনগতভাবে অন্তত তা সিদ্ধ নয়। ১৮৭৬ সালের মুম্বাই হাইকোর্টের একটি রায়ে ধর্ম বা বর্ণের ভিন্নতার কারণে কোনো বিয়ে অবৈধ বলে ঘোষণা করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ১৯৫৫ সালের ভারতের সিভিল রাইট আইন অনুযায়ী অস্পৃশ্যতা এবং বর্ণভিত্তিক বিভাজনকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও বর্ণ এবং জাতি পরিচয়ের কারণে ভারতে এখনো ব্যাপক সামাজিক বৈষম্য এবং অবিচারের ঘটনা ঘটে। তারপরও আধুনিক আইন অন্তত প্রতিবাদের ভাষাহীনদের ভাষা দিয়েছে এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সংবিধানে চাকরি ক্ষেত্রে নিুবর্ণের মানুষদের জন্য বিশেষ কোটার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং ১৯৮৯ সালে ম-ল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব আইনগত ব্যবস্থা কাঙ্খিত পর্যায়ে না হলেও বর্ণ ব্যবস্থার অভিশাপ থেকে নিুবর্গের মানুষদের কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিচ্ছে এবং বর্ণ ব্যবস্থার কঠোরতা রোধে ভূমিকা রাখছে।
আধুনিক শিক্ষা : আধুনিক শিক্ষা হল সমাজের চাহিদা এবং জোগানের সাথে সম্পৃক্ত। এখানে সাফল্য নির্ভর করে মেধা এবং শ্রমের ওপর। যদিও সুযোগের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমসুযোগ না পেলে কারো পক্ষে তার মেধার প্রমাণ দেওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক রাষ্ট্র যে সীমিত সুযোগ সৃষ্টি করেছে তা নিুবর্গের মানুষের মেধা এবং দক্ষতার প্রমাণ রাখতে সহায়তা করছে। অবশ্য রাষ্ট্রের সামনেও খুব বেশি সুযোগ খোলা নেই। কারণ রাষ্ট্রের প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি যা একদিকে তার কর্মীর চাহিদা পূরণ করবে অন্যদিকে তার প্রতিযোগিতার সামর্থ্য বাড়াবে। তাই রাষ্টকে বাধ্য হয়েই সকল শ্রেণির নাগরিকের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হয় এবং উন্মুক্ত ‘ট্যালেন্ট হান্টে’ নেমে পড়তে হয়। সুতরাং এটা রাষ্ট্রের দয়া নয় বরং আবশ্যিক প্রয়োজন। এখন ভারতে বিপুল আয়তনের আইটি শিল্প গড়ে উঠেছে। সেখানে দরকার প্রচুর আইটি বিশেষজ্ঞ। যাদের বেতন মাসিক ভারতীয় টাকায় এক/দেড় লক্ষ থেকে চার/ পাঁচ লক্ষ পর্যন্ত। কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটা দেখা সম্ভব নয় যে ব্যক্তিটি কোন বর্ণের বা ব্রাহ্মণ না শূদ্র। বরং তার একমাত্র বিবেচ্য বিষয় তার দক্ষতার মাত্রা। আর একজন হরিজন যদি তার দক্ষতা প্রমাণ করতে পারে তাহলে সে তার দক্ষতা অনুযায়ী বেতন পাবে। আর আধুনিক সমাজে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা মূল্যায়ন করা হয় তার ক্রমক্ষমতা দিয়ে। সে যখন শহরের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো ক্রয় এবং ভোগ করতে পারবে তখন মানুষের চোখে তার মর্যাদা এমনিতেই বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি ভারতে হীরকের ব্যবসা ব্যাপক বি¯তৃতি লাভ করেছে। হীরক এবং স্বর্ণের ব্যবসায় যারা জড়িত তারা ঐতিহ্যগতভাবে নিুবর্ণের। কিন্তু এখন তাদের হাতে ব্যাপক অর্থ। এটা তাদের নবতর সামাজিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। এভাবেই আধুনিক শিক্ষার সম্প্রসারণ বর্ণ ব্যবস্থার অচলায়তন ধসিয়ে দিচ্ছে।
উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন : ব্রিটিশরা এদেশ দখলের পর শাসক সম্প্রদায় মুসলিমদের সর্ম্পূরূপে ভিখিরিতে পরিণত করে। পরিবর্তে মুসলিমদের স্থান দখল করে শিক্ষিত হিন্দুরা। এর মধ্যে অনেক নিুবর্ণের হিন্দুও ছিল। অনেক নিুবর্ণের হিন্দু জমিদারি ক্রয় করার পর উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তার প্রজায় পরিণত হয়। যদিও এই সংখ্যা কম ছিল।              
তারপরও এটা নিুবর্ণের মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে এবং সামাজিক সচলতার সৃষ্টি হয়। তা ছড়া শিল্প-বিনিয়োগ পরিবেশ বাজার সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নিু বর্গের মানুষের মধ্যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় শরিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমান সমাজের নিয়ন্ত্রক যে উদ্যোক্তা শ্রেণি তাদের মধ্যেও দু চার জন নিুজাতের মানুষ স্থান করে নিতে থাকে। এভাবে সামাজিক সচলতা গতি পায়। এভাবে বলা যায় আধুনিক সমাজের উপাদানগুলো বর্ণ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে নমনীয় হতে বাধ্য করছে।
সমাজবিজ্ঞানী এ আর দেশাই এ সংক্রান্ত আলোচনায় এভাবেই উপসংহারে উপনীত হয়েছেন, “অধিকতর আর্থিক উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অগ্রগতির জন্য জাতীয়তাবাদী ও শ্রেণি আন্দোলন বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জাত বিলোপের ব্যাপারটা এমনকি জ্যামিতিক হারেও বেড়ে যাবে। প্রকৃতির রাজ্যে যেমন, সমাজেও তেমনি অগ্রগতি অথবা হ্রাস সমান তালে চলে না। জনসাধারণের মধ্যে পুঞ্জিভূত জাতবিরোধী চেতনা ব্যাপক জাতবিরোধী কার্যক্রমে রূপ লাভ করবে। এর ফলে বিবাহ সংক্রান্ত বিধিনিষেধও শিথিল হয়ে যাবে। জাত ব্যবস্থার শেষ স্তম্ভ সাকুল্যবিবাহ (অন্তর্গোষ্ঠী বিবাহ) লোপ পেলে জাতের ইমারত ধ্বংস হয়ে যাবে”।  লেখক ঃ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

    মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান
    বিএ (অনার্স) এম.এ (ইসলামের ইতিহাস) ও
    এম.এ (ইংরেজী)
       পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১
    

Bangla-Kotir
line seperator right bar ad
sunnati hazz
line seperator right bar ad
RiteCareFront
line seperator right bar ad
Adil Travel Winter Sale front
line seperator right bar ad
starling front
line seperator right bar ad

Prothom-alo Ittafaq Inkilab
amardesh Kaler-Kontho Amader-Somay
Bangladesh-Protidin Jaijaidin Noya-Diganto
somokal Manobjamin songram
dialy-star Daily-News new-york-times
Daily-Sun New-york-post news-paper

line seperator right bar ad

 

 Big

line seperator right bar ad
Rubya Front
line seperator right bar ad

Motin Ramadan front

line seperator right bar ad
 ফেসবুকে বিএনিউজ24
line seperator right bar ad
   আজকের এই দিনে
লোকে-যারে-বড়-বলে-বড়-সেই-হয়
আবদুল আউয়াল ঠাকুর : বাংলা প্রবচন হচ্ছে, আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যা বড় বলে বড় সেই হয়। সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি কেন্দ্র করে এমন কিছু...
line seperator right bar ad
banews ad templet
 
 
line seperator right bar ad
   ফটোগ্যালারি
  আরো ছবি দেখুন -->> 
line seperator right bar ad
 
    পুরাতন সংখ্যা
banews ad templet