ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক : দশ বছর আগে ও পরে

q123সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম

গত বুধবার ২০ মে ২০১৫ প্রকাশিত কলামের শিরোনাম ছিল- ‘ক্ষয়রোগে আক্রান্ত গণতন্ত্র’। ওই কলামের শেষে বলেছিলাম, আগামী তিনটি কলামে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে লিখব। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসবেন বলে ঘোষিত হয়েছে। যথাসম্ভব তিনি ৬ জুন বাংলাদেশে পৌঁছবেন এবং ৭ জুন বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাবেন। দুই দিনের সফর; কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বর্তমান গণতন্ত্রের সুঅবস্থা অথবা দুরবস্থা (যে বিশেষণটিই প্রয়োগ করি না কেন) ওই অবস্থা সৃষ্টির সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকারের সম্পর্ক আছে। সরকার নামে শব্দটি এবং সরকার নামে সংগঠনটি সর্বজনীন, চলমান ও বহমান। ১৮ মাস আগে ভারত নামে রাষ্ট্রে সরকারের দায়িত্বে ছিলেন অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস নামে রাজনৈতিক দল। এখন দায়িত্বে আছে বিজেপি নামে রাজনৈতিক দল। কী প্রেক্ষাপটে, কী পরিস্থিতিতে এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে ওই আমলের (কম-বেশি ১৭ মাস আগে) কংগ্রেস সরকার তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (ভদ্রমহিলা) সুজাতা সিংকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন সেই সম্বন্ধে অল্প-বিস্তর সবারই জানা আছে। গত মাসে আমি আরেকটু বেশি জানতে পেরেছি দুর্ঘটনাক্রমে। যা হোক, সেদিকে বিস্তারিত যাবো না। শুধু একটি গল্প বলব।

রাওয়া আয়োজিত বইমেলা সমাচার
গল্পের আগে গল্পের প্রেক্ষাপট। রোববার ৩ মে ২০১৫ সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একটি বইমেলা ছিল। বইমেলার আয়োজক হচ্ছে একটি অরাজনৈতিক, সামাজিক ও কল্যাণমূলক সংগঠন যথা ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ (সংক্ষেপে যার নাম রাওয়া)। এই সমিতির একটি ক্লাবও আছে, যার নাম রাওয়া ক্লাব। রাওয়া এবং রাওয়া ক্লাবের মালিকানাধীন একটি নির্মাণাধীন ভবনও আছে। ঢাকা মহানগরের ফার্মগেট থেকে ভিআইপি রোড তথা এয়ারপোর্ট রোড তথা বীর উত্তম জিয়াউর রহমান সড়ক দিয়ে যদি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে যাওয়া হয়, তাহলে মহাখালী রেলক্রসিংয়ের আগেই হাতের বাঁয়ে প্রধান সড়কের ওপর বিরাট ভবন দাঁড়িয়ে আছে, যার নাম রাওয়া কনভেনশন সেন্টার। এই বিরাট ভবনের পাশ দিয়ে উত্তর দিকে যে রাস্তা, সেই রাস্তার মোড় থেকেই ডিওএইচএস মহাখালী শুরু। সেই রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে তিনটা হল আছে। যেগুলোর নাম সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সুপরিচিত পরিভাষা থেকে নেয়া। দোতলায় সবচেয়ে বড় হলটির নাম হেলমেট, তিনতলায় মাঝারি আকারের হলটির নাম অ্যাংকর এবং তিনতলাতেই একটু ছোট আকারের তৃতীয় হলটির নাম ঈগল। হেলমেট হলটিতে বড় বড় বিয়ের অনুষ্ঠান ও অন্যান্য অনুষ্ঠান হয়। হলটির ভাড়া দুই লাখ টাকা। ওই হলটি রাওয়া কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে ছেড়ে দিয়েছিল একটি বইমেলা আয়োজন করার জন্য। কারণ, আয়োজক রাওয়া নিজেই। এ মুহূর্তের দায়িত্বরত নির্বাচিত রাওয়া নির্বাহী কমিটি বিশেষত এর চেয়ারম্যান, মহাসচিব ও সদস্য লাইব্রেরি সবার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। রাওয়া বা রাওয়া ক্লাব অনেক বড় সেক্রিফাইস বা ত্যাগ স্বীকার করেছে বইমেলার জন্য। মেলার উদ্দেশ্য ছিল অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা অর্থাৎ রাওয়ার সদস্যদের মধ্যে যারা পুস্তক লেখালেখি করেন, তাদেরকে উৎসাহিত করার জন্যই এ বইমেলার আয়োজন ছিল। অতি মহৎ উদ্যোগ। অতি সৎ উদ্দেশ্য। অনেক বড় সেক্রিফাইস বা ত্যাগ স্বীকার। কিন্তু ছোট্ট দু’টি ভুলের জন্য মেলাটি সফল হয়নি। প্রথম ভুল ছিল মেলায় আগমনকারী মেহমান হিসেবে নির্ধারিত ছিল শুধু রাওয়া সদস্যরা; অর্থাৎ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। দ্বিতীয় ভুল ছিল উপযুক্ত এবং যথেষ্ট প্রচারণা না দেয়া; আমি যথেষ্ট শব্দটি থেকেও উপযুক্ত শব্দের ওপর গুরুত্ব বেশি দিচ্ছি। এ দু’টি ভুল ২০১৪ সালে প্রথমবার আয়োজিত মেলায়ও ছিল এবং এইবার আয়োজিত দ্বিতীয় মেলায়ও ছিল। আশা করি, আগামী বছরের তৃতীয় মেলায় থাকবে না। যা হোক, গল্পটি বলছি পরের অনুচ্ছেদে।

ঘেউ ঘেউ করার নিমিত্তে কুকুরের সফর
৩ মে ২০১৫ রাওয়া কর্তৃক আয়োজিত বইমেলা ঘড়ির কাঁটা ধরে সঠিক সময়ে উদ্বোধন হয়েছিল। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অতি সম্মানজনক ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি তার ভাষণে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। ভাষণে একটি গল্পও বলেছেন। ওই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অনেকের সাথে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ নুরাল হক, পিএসসি। ব্রিগেডিয়ার নুরাল হক মাঝে মধ্যেই এই বহুলপ্রচারিত নয়া দিগন্ত পত্রিকায় কলাম লেখেন। তিনি রোববার ২৪ মে ২০১৫ তারিখেও কলাম লিখেছেন, যেটি ৭ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। ওই কলামের সর্বশেষ অনুচ্ছেদে তিনি ওই সুন্দর গল্পটি নিজের ভাষায় প্রকাশ করেছেন। আমি গল্পটি নুরাল হকের ভাষায় এখানে বলছি। গল্প শুরু- স্ট্যালিনের সময় রাশিয়ায় এত নির্মম শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল যে, সবাই ত্রস্ত। অর্থাৎ রাশিয়াজুড়ে স্ট্যালিনের স্বৈরশাসন। কোথাও কোনো রা করারও উপায় ছিল না। আশপাশের দেশগুলোতেও একই হাওয়ায় ত্রিশঙ্কু অবস্থা। একদিন দেখা গেল, পূর্ব জার্মানির এক কুকুর পশ্চিম জার্মানিতে গিয়ে হাজির। পশ্চিম জার্মানির কুকুরের দল পূর্ব জার্মানির কুকুরটিকে ঘিরে ধরে বলল, ‘কী ভাই, তুমি এখানে কেন? তোমাদের ওখানে কি খাদ্য, বাসস্থান বা চিকিৎসার অভাব? ঘোরাঘুরি করার কোনো সমস্যা?’ পূর্ব জার্মানির কুকুরটি বলল, ‘না ভাই, সবই ভালো। সে রকম কোনো সমস্যা নেই।’ পাল্টা প্রশ্ন, ‘শুনেছি, তোমাদের ওখানে নাকি জিনিসপত্রের দাম খুবই কম? একেবারে সস্তা?’ পূর্ব জার্মানির কুকুরটি সহজভাবে উত্তর দিলো, ‘সবই ঠিক আছে ভাই।’ ধৈর্য হারিয়ে এক্ষণে পশ্চিম জার্মানির কুকুরের দল সমস্বরে প্রশ্ন করল, ‘তাহলে তুমি এখানে কেন?’ পূর্ব জার্মানির কুকুরটি ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিলো, ‘ভাই, সবই ঠিক আছে; কিন্তু ওখানে আমাদেরকে একেবারে ঘেউ ঘেউ করতে দেয় না। তাই শুধু একটু ঘেউ ঘেউ করার জন্য তোমাদের এখানে আসা।’ গল্প শেষ। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে (প্রতীকী অর্থে) ঘেউ ঘেউ করা যাবে কি যাবে না, সেটা পাঠক বিচার করবেন। আগামী মাসের সম্মানিত মেহমান ঢাকা সফরে এসে যদি (প্রতীকী অর্থে) ওই অতিপরিচিত প্রাণীর কণ্ঠ শুনতে না পান, তাহলে নিজের মনে কী ভাববেন জানি না।

দশ বছর আগের ইবরাহিমের সাক্ষাৎকার
এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কথায় আসি। নয়া দিগন্ত পত্রিকার জন্ম আজ থেকে এগারো বছর আগে। নয়া দিগন্তের সাড়ে দশ বছর আগের একটি কপির সূত্র বা রেফারেন্স নিম্নরূপ। বর্ষ-১ ও সংখ্যা-২২৪; বার ও তারিখ : বৃহস্পতিবার ৬ জানুয়ারি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ, ২৩ পৌষ ১৪১১ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ২৪ জিলকদ ১৪২৫ হিজরি। ওই দিনের পত্রিকার একটি কপি আমার কাছে এখন পর্যন্ত আছে। ওই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার চারটি শিরোনাম অতি উল্লেখযোগ্য। প্রথম শিরোনাম, লাল কালিতে চার কলাম তিন ইঞ্চিব্যাপী দুই লাইন- ‘ঢাকায় বিভিন্ন দূতাবাসের নামে চোরাচালান’। দ্বিতীয় শিরোনাম, দেড় ইঞ্চি তিন কলামব্যাপী দুই লাইন- ‘দ্বৈত সিদ্ধান্তে দুর্নীতি দমন কমিশন বিপাকে : আড়ালে কলকাঠি নাড়ছে কয়েক মন্ত্রী’। তৃতীয় শিরোনাম, দেড় ইঞ্চি দুই কলামব্যাপী- ‘ক্রসফায়ারে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ও তার সহযোগী নিহত’। চতুর্থ এবং উল্লেখযোগ্য শেষ শিরোনাম, দুই ইঞ্চি তিন কলামব্যাপী দুই লাইন- ‘নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে এগুলে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব : সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম’। ওই সময় আমি রাজনীতি করতাম না। তাই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিক নাজমুল ইমাম তার রিপোর্টটিতে আমার পরিচয় দিয়েছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষানীতি বিশ্লেষক। ওই দিনের পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠা এবং দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বড় একটি অংশে আমার সাক্ষাৎকারটি ছাপানো হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটিতে আজকের কম্পিউটারে গোনা শব্দ সংখ্যা ছিল ২৪৪৩। ওই সাক্ষাৎকারটিকে ভিত্তি করে আজকের কলামের বাকি অংশ। দশ বছর আগে যেই অনুভূতি ও মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিলাম, আজ দশ বছর পর বাস্তবতার সাথে তার কতটুকু মিল আছে বা নেই, সেই বিচারের ভার পাঠক সম্প্রদায়ের ওপর অর্পিত।

৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর প্রথম প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অমীমাংসিত ইস্যুগুলোকে কিভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন? ৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর উত্তর : ১৯৭১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক আদর্শনির্ভরভাবে গড়ে ওঠেনি। এর অন্যতম কারণ হলো, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারত আমাদেরকে যে সাহায্য করেছে, তা অতুলনীয়। এর জন্য বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত সেটাও ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল। অপরপক্ষে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে যে একদল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ছিল, তারা আমাদের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পরিবর্তে এককভাবে ভারতকে দায়ী করে। এর ফলে ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে একটি মানসিকতা তৈরির জন্য একদল লোক সর্বদাই সচেষ্ট ছিল। আমি কোনোমতেই বলতে চাচ্ছি না যে, ভারতের কোনো দোষ নেই। ভারতও আমাদের কাছ থেকে যে কৃতজ্ঞতা আশা করে তা মাত্রাতিরিক্ত এবং ডেফিনেশন ছাড়া। এর কারণে এ দেশের মানুষ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। তাই উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক কোনো দিনই ভালো হতে পারেনি। এখন ৩০ বছর চলে গেছে নতুন প্রজন্ম কূটনীতি, প্রশাসন, ব্যবসাবাণিজ্যে এসেছে। এখন সম্ভব হলে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে পুনর্মূল্যায়ন করে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোকে সমাধান করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন প্রথমত, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উভয় দেশের সমস্যাগুলোকে বিশ্লেষণ করা। দ্বিতীয়ত, অতীত ও ইতিহাসকে যত কম সম্ভব টেনে আনা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমস্যা রয়েছে। এ সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমেই এটা সম্ভব। তৃতীয়ত, একটি মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। তা হলো- বাংলাদেশের জন্য ভারত এত বড় প্রতিবেশী যে, আমাদের বৈদেশিক নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিন্তা-চেতনায় তারা সব কিছুতে বড় স্থানটি দখল করে থাকে। অন্য দিকে ভারতের চিন্তা-চেতনা ও লক্ষ্যের সব কিছুতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র একটি জায়গা পায়। তাই আমাদের দেশের জন্য ভারত একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এ জন্য উভয় দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্মানজনক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের আমলে এ চেষ্টা করা হয়েছিল। মনমোহন সিংয়ের আমলেও সেটা সম্ভব, যদি তাদেরকে বোঝাতে আমরা সক্ষম হই। এ জন্য ব্যবসায়ী সমাজ ও সিভিল সোসাইটিকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।

৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর প্রথম প্রশ্ন ও আজকের মন্তব্য
সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর আরো ২২ মাস বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। অতঃপর তিন মাস গোলযোগপূর্ণ ছিল। অতঃপর ১১ জানুয়ারি ২০০৭ থেকে শুরু করে দুই বছর ওয়ান-ইলেভেনের সরকার নামে একটি বস্তু ছিল। অতঃপর সাড়ে ছয় বছর ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। অতএব ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সবাই কিছু কিছু সাধুবাদ পাবেন। সবাই আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রেখেছিলেন। ওই আলোচনার ফলে ভারতের কংগ্রেস সরকারের আমলে কিঞ্চিত অগ্রগতি হয়েছিল, কিন্তু মাত্র এক বছরেই বর্তমান বিজেপি সরকার অগ্রগতির ইশারাগুলো উজ্জ্বল করে তুলেছে।

৬ জানুয়ারির দ্বিতীয় প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে প্রধান বাধা কোনটি এবং তা কিভাবে দূর করা সম্ভব? ৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর উত্তর : দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা দু’টি; একটি মানসিকতার বাধা। দিল্লিকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদেরা, পশ্চিম ভারতকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদেরা, দক্ষিণ ভারতকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদেরা বাংলাদেশকে উপযুক্তভাবে বুঝতে পারে না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ, প্রেমপ্রীতি সব কিছুই পূর্ব ভারতের সাথে। অতএব নীতিনির্ধারক ছাড়া দক্ষিণ ভারতে বা দিল্লিতে অন্য কেউ বাংলাদেশকে সেভাবে বুঝতে পারে না। সেজন্য তাদেরকে আমাদের দেশে দাওয়াত দিয়ে আনা প্রয়োজন। তাদের সাথে আমাদের একটা গাঢ় সুসম্পর্ক গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। ভারত আমাদের চেয়ে আকারে ১২ গুণ বড়; জনসংখ্যায় ৮-৯ গুণ বড়। এই প্রেক্ষাপটে দু’দেশের বাণিজ্যের মধ্যে বিরাট তফাত পাওয়া যায়। এ কারণে একটা হীনম্মন্যতাও এসে গেছে, যাতে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয়। এই অসুবিধা থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হলো বেসরকারি বা সিভিল সোসাইটি পর্যায়ের পৃথক পৃথক ভূমিকা পালন। তারা তথ্য বা উপাত্ত দিতে পারবে, যাতে সরকারি পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়। সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা দু’টির মধ্যে অন্যটি হলো অবস্থানগত বাধা। এটা দূর করা কষ্টসাধ্য হলেও মানসিক বাধা দূর করা অনেকটাই সহজ। এখানে উল্লেখ্য, মিডিয়া কারো কথামতো চলে না- এটা মেনে নিয়েই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর দ্বিতীয় প্রশ্ন ও আজকের মন্তব্য
বেসরকারি বা সিভিল সোসাইটি পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই কলাম লেখার তারিখের পরে ছয়বার আমি নিজেও ভারত সফরে গিয়েছি দাওয়াতপ্রাপ্ত হয়ে বিভিন্ন আলোচনা বা সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য এবং ধর্মীয় জিয়ারতের জন্য। মানসিক বাধা দূর হয়েছে আংশিকভাবে। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তেরো-চৌদ্দ মাস আগে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় ভোটারদের কাছে ওয়াদা করেছিল যে, বাংলাদেশ থেকে বিগত চার-পাঁচ-ছয় দশকে অনুপ্রবেশ করা বা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে। বিজেপির মতে, ওইরূপ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা পূর্ব ভারতের পাঁচটি রাজ্য বা প্রদেশে অবস্থান করছে, যথা- পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম। অপর দিকে বাংলাদেশের ছিটমহল সমস্যা, অতি সম্প্রতি সমাধান করা ছিটমহল সম্যাতেও জড়িত ছিল মাত্র তিনটি রাজ্য। যথা- পশ্চিমঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে সমস্যা, সেটার সমাধানে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসক দল। অর্থাৎ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে একটি উপ-অধ্যায় আছে। সেই উপ-অধ্যায়টি হলো ভারত নামক বিশাল রাষ্ট্রের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক। এই উপ-অধ্যায় যদি বাংলাদেশের অনুকূলে সুলিখিত না হয় বা সুপঠিত না হয়, তাহলে মূল অধ্যায় সাফার করবে বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর তৃতীয় প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন : বাংলাদেশের ওপর দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে সাত রাজ্যে যাতায়াতের জন্য ট্রানজিট প্রদান ভারতের প্রধান দাবি। এ বিষয়টিকে বিবেচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু কোনটি প্রধান বিবেচনায় রাখা উচিত? ৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর উত্তর : অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা তিনটি ইস্যুই রাখা উচিত। আর এর মধ্যে বিভাজনের কোনো স্থান নেই। আমি একটা প্রশ্ন তুলে ধরতে চাই যে, ৩০ বছর লেগেছে ইউরোপিয়ান কমন মার্কেট থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পর্যন্ত আসতে। দ্বিতীয় ধাপের সিদ্ধান্ত তারা করে ফেলেছে এবং এ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যাবে। পাঠক সমাজের কাছে আবেদন : কল্পনা করুন, ইংলিশ চ্যানেলের তীর থেকে গ্রিস পর্যন্ত মালামাল কেমন করে আসছে, এখানে কি ট্রানজিট প্রযোজ্য নয়, শুল্ক প্রযোজ্য নয়। এখানে কি ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদ প্রযোজ্য হচ্ছে না? এখানে কি ভিন্নমাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান নেই? তারপরও ইউরোপের দেশগুলো সেটা করছে। যেই রাস্তা বাংলাদেশে বিদ্যমান, যাকে কোনো কোনো জায়গায় বিশ্বরোড বা হাইওয়ে বলেই বাংলাদেশ রাস্তাগুলো কেন বানাচ্ছে? রাস্তাগুলো বানাচ্ছে, কারণ এশিয়াব্যাপী নেটওয়ার্ক হচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেন অবাধে চলাচল করতে পারে এবং এই অবাধে চলাচল শুধু টুরিস্টদের প্রাইভেট কারে চড়ার জন্য নয় বা টুরিস্ট বাসের জন্য নয়, বড় বড় ৪০ ফুট বা ২০ ফুট কনটেইনার নিয়েও লরি কিন্তু যাবে। অতএব আজ যেটা বাংলাদেশের লোক ভয় পাচ্ছে ইন্ডিয়ান ট্রানজিট নিয়ে, তারা কাল বা পরশু পুরো এশিয়ান ট্রানজিটে পড়ে যাবে। তার জন্য এখনই মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। ইন্ডিয়ান ট্রানজিট দিলে আমার নিরাপত্তা কিভাবে রক্ষা করা যায়, এটা নিয়ে চিন্তা করা উচিত, ট্রানজিট দেবো না, সেটা নিয়ে নয়। কারণ দেবো না বলে বসে থাকা যাবে না, যেই আগামীর বিশ্ব আসছে, আমি সেটাকে বলছি।

৬ জানুয়ারি ২০০৫-এর তৃতীয় প্রশ্ন ও আজকের মন্তব্য
ট্রানজিট প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত সমঝোতা হয়েছে। ইংরেজিতে বিভিন্ন নাম দিয়ে এ বিষয়টিকে বোঝানো হচ্ছে। যেই সুন্দর ইংরেজি শব্দটির মোড়কে বা ছদ্মাবরণে ট্রানজিটের সব কিছুই ভারতকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই ইংরেজি শব্দটি হচ্ছে কানেক্টিভিটি। আসল কথা হলো, আমার দেশের মাটি ও পানির ওপর দিয়ে, আমার বুক চিরে ভারতের গাড়ি, ভারতের নৌযান চলাচল করা শুরু হয়ে গেছে। বৃহৎ অংশ নীরবে, কিছু অংশ সবাইকে জানিয়ে, আওয়ামী লীগ সরকার কাজটি সেরে ফেলেছে। দেশের জনগণ পরিষ্কার কেন ধারণা পায়নি, বাংলাদেশের লাভ কী হলো? বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের লাভের অংশটি বুঝে পেতে চায়। দুই-আড়াই বছর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ-ছয়জন উপদেষ্টার মধ্যে একজন উপদেষ্টার একটি মন্তব্য আজো কানের মধ্যে খুব বিশ্রীভাবে বাজে। ভারতীয় গাড়িঘোড়া এবং পণ্য পরিবহনের জন্য (যেই নামেই ডাকি না কেন) কোনো ফিস বা কোনো শুল্ক বা কোনো ট্যাক্স বা কোনো কর ইত্যাদি ভারতের থেকে চাওয়া উচিত, কি উচিত নয়- এ কথা প্রসঙ্গে ওই উপদেষ্টা বলেছিলেন : ভারতের কাছে থেকে ট্রানজিটের বিনিময়ে কোনো ফিস বা শুল্ক চাওয়া অশোভন ও অভদ্রতা। তাই আমি সাড়ে দশ বছর আগে ৬ জানুয়ারি ২০০৫ তারিখে করা আমার মন্তব্য বহাল রাখছি। সাথে এখন যোগ দিতে চাই গুরুত্বের সাথে যে, চলাচল উভয়মুখী হতে হবে বা উভয়মুখী ট্রাফিক হতে হবে। অর্থাৎ শুধু ভারত লাভবান হলে হবে না, বাংলাদেশকেও লাভবান হতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকার ছয়-সাড়ে ছয় বছর ধরে যে পদ্ধতিতে সরকার চালাচ্ছে, তারা নিজের দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় দুর্বলতার পরিচয় দিচ্ছেন।
৬ জানুয়ারি ২০০৫-এ যে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে মোট দশটি প্রশ্ন ছিল, যার মধ্য থেকে তিনটি প্রশ্ন আজকের কলামে উদ্ধৃত করলাম মন্তব্যসহ। আগামী সপ্তাহের কলামে অবশিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর এবং মন্তব্য ছাপানোর আশা রাখি।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:) ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

Bangla-Kotir
line seperator right bar ad
sunnati hazz
line seperator right bar ad
RiteCareFront
line seperator right bar ad
Adil Travel Winter Sale front
line seperator right bar ad
starling front
line seperator right bar ad

Prothom-alo Ittafaq Inkilab
amardesh Kaler-Kontho Amader-Somay
Bangladesh-Protidin Jaijaidin Noya-Diganto
somokal Manobjamin songram
dialy-star Daily-News new-york-times
Daily-Sun New-york-post news-paper

line seperator right bar ad

 

 Big

line seperator right bar ad
Rubya Front
line seperator right bar ad

Motin Ramadan front

line seperator right bar ad
 ফেসবুকে বিএনিউজ24
line seperator right bar ad
   আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...
line seperator right bar ad
banews ad templet
 
 
line seperator right bar ad
   ফটোগ্যালারি
  আরো ছবি দেখুন -->> 
line seperator right bar ad
 
    পুরাতন সংখ্যা
banews ad templet