অস্তিত্বের স্বার্থে বাংলাদেশকে মুসলিম পরিচিত অটুট রাখতে হবে

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার আড়ালে বিভিন্ন কায়দা-কারণ দেখিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে দ্রুত আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সাবধনতার সাথে ধীরগতিতে দেশের মোট জন্যসংখ্যার ৯০% মুসলমানদের ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও জীবনাচরণ তুলে দিয়ে এমনসব আচার অনুষ্ঠান  শুরু হয়েছে যেগুলো মুসলিম সমাজে আগে ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টির জন্য একটা অগ্রহণযোগ্য অজুহাত বা যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন কোন মহল বুঝাতে চাচ্ছেন যে, ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ায় দ্বিজাতি তত্ত্ব নাকি ভুল প্রমাণিত হয়েছে ।  তাই দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলশ্র“তিতে সৃষ্ট বাংলাদেশের মুসলিম চরিত্র  বা পরিচিতি তুলে দিয়ে সেখানে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ আবহ ও পরিচিতি তৈরি করতে হবে ।  এসব যুক্তি একান্তভাবেই মতলবী  ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা। ১৯৭১ সনে  মুক্তিযুদ্ধ কোনভাবেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাাদেশের শতকরা ৯০% মুসলমানের ধর্মীয় পরিচিতমূলক সংস্কৃতি তুলে দেয়ার জন্য হয় নি। অন্যদিকে মুসলমানরা কোন সংখ্যালঘুর ধর্মচর্চায় সমস্যা সৃষ্টি করে নি। কেবল ১৯৬৫ সনে পাক-ভারত  যুদ্ধের সময় ভারতে সৃষ্ট ব্যাপক মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অত্যন্ত  সীমিত এলাকায় সামান্য হিন্দুবিরোধী দাঙ্গা ছাড়া ১৯৪৭ সনের পর হতে ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুবিরোধী কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয় নি। ( যদিও তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে এ সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মুসলিমবিরোধী রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। বহু মুসলমান ও খ্রিস্টানকে জোরপূর্বক হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে ঘটনাও ঘটেছে। ২০৩০ সনের মধ্যে ভারতে কোন মুসলিম থাকবে না, এমন আগাম ঘোষণাও এসেছে। এই তো সেই দিন ৩ আগস্ট হিন্দু মহাসভার সভাপতি কমলেশ তেওয়ারি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, ভারতীয় মুসলমানদের মুকাবিলা করার জন্য প্রতিটি হিন্দুর হাতে একটি করে তরবারি দেয়া হবে। এসবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা সামান্যতম প্রতিবাদও করেন নি। এসব দাঙ্গা, ধমক ও ঘোষণা যদি ধর্মনিরপেক্ষতার নমুনা হয়, তবে মুসলমানরা কারো ক্ষতি না করে কেবল মুসলিম পোশাক তথা ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি অনুসরণ ও অনুসরণ করলে কেন মৌলবাদের আলামত হিসেবে ধিক্কার দেয়া হবে, কিংবা সেগুলো বন্ধ করার পাঁয়তারা করা হবে। ) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কিংবা আজকের বাংলাদেশে সংখ্যালঘু  তথা হিন্দুরা কোনভাবেই অস্তিত্বের সংকটে ভোগে নি। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ভারত হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারে এমন সম্ভাবনা দেখা দেয়ার পর থেকেই হিন্দুরা ধর্মীয় অনুভূতিগত মনস্তাত্তিক কারণে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় প্রকাশ্যে-গোপনে ভারতে পাড়ি জমায়। কারণ তারা ভারতকে তাদের স্বদেশ বলে মনে করতো। আমার সহপাঠী রুহিদাস, বসন্ত, আরতি, অঞ্জলী, রত্তি, মতিলাল, অনিল, মন্টু, সুবল চন্দ্র আচার্যসহ অন্যান্যরা (যাদের নাম এখন আর মনে নেই) ১৯৬৩-৬৪ সনের দিকে ভারতে যাবার কারণ হিসেবে তাদের পিতামাতাকে উদ্ধৃত করে বলেছিল: তারা হিন্দু, তাই হিন্দুস্থানই তাদের দেশ, আর পূর্ব-পাকিস্তান হলো মুসলমানের দেশ। আমার কোন কোন হিন্দু প্রতিবেশি কিংবা সহপাঠী স্বেচ্ছায় ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার সুবিধা করতে না পারায় অনেকে ফিরেও এসেছেন এ যুক্তিতে যে, মুসলমানের দেশই ভালো, এখানে হিন্দুদেরকে মূল্যায়ন করা হয়।
বস্তুত দ্বিজাতি তত্ত্ব ও লাহোর প্রস্তাবের আলোকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিচয় নিয়েই ১৯৪৭ সনে ব্রিটিশ-বাংলার পূর্বাংশ পাকিস্তানের অংশ হিসেবে স্বাধীন হয়েছিল, যা পরে পূর্ব পাকিস্তান নাম ধারণ করে। বিদেশী শোষণ ও  শাসনমুক্ত গণতান্ত্রিক স্বদেশ গড়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৭১ সনে  যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তান হতে পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ডকেই মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছি।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোনভাবেই এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় পরিচিতি তথা মুসলিম সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে ছিল না। ১৯৭১ সনের ২৬ মার্চের আগে এমনকি পরেও এদেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি মুক্তিযোদ্ধারাও জানতেন না, স্বাধীন দেশের ব্যাপকভাবে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের সংস্কৃতি ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে উঠিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে। তথাপি ১৯৭২ সনে আমাদের শাসনতন্ত্রে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে সংযুক্ত করার পরেও এদেশের মানুষ তার বিরুদ্ধে কথা না বললেও তাদের ধারণা ছিল ভারতও কাগজে-কলমে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আর বাস্তবে হিন্দু রাষ্ট্র। সুতরাং বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে ধর্মনিরক্ষেতা থাকলেও সেটা কোনভাবেই মুসলিম সংস্কৃতি ও পরিচিতিমূলক বৈশিষ্ট্যকে ক্ষুণœ করবে না।
আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে প্রতিবেশী ভারতের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ তথা হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মবিশ্বাসীদের দেশ হিসেবে, এককভাবে হিন্দুদের আবাসভূমি হিসেবে নয়। ভারতে সরকারী দাবি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার আশিভাগের মতো হিন্দু, যদিও বাস্তবে আরো কম। ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে ভারত সরকার কোনভাবেই ঐ দেশের হিন্দু চরিত্র কিংবা সংস্কৃতিকে উঠিয়ে দেয়ার সামান্যতম চেষ্টাও করেনি । আর তা করাও উচিত নয়। কারণ গণতন্ত্র মানলে সংখ্যাগুরু জনগণের বৈশিষ্ট্যকে তুলে দেয়া যায় না। ভারতে  প্রতিনিয়ত মুসলিম-খ্রিস্টানবিরোধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, এমনকি সরকারী চাকরি এবং সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে সংখ্যালঘুদের বঞ্চনার জঘন্য নজির থাকা সত্বেও একেবারে নাস্তিক কিংবা উদার হিসেবে পরিচিত কমিউনিস্টরা অহিন্দু বিরোধী কার্যক্রম বন্ধে কখনো জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে কিংবা অহিন্দুদের চাকরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের দাবি করেছে কিংবা হিন্দুত্ব পরিচয় বহনকারী সংস্কৃতি তুলে দেয়ার জিগির তুলেছে এমন নজির নেই। হিন্দু বিবাহিতা মহিলাদের হাতে শাঁখা পরা, সিঁথিতে সিঁদুর পরা,  পুরুষদের ধুতিপরা কিংবা কপালে তিলক কাটাকে মৌলবাদের চিহ্ন হিসেবে ধিক্কার দেয় না। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে ধিক্কার দেয়া হয় না উলুধ্বনিকে, বিকট শব্দে  ঢোলক বাজানোকে। সেখানকার কোন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা জিজ্ঞেস করেন না কেন কোন কোন রাজ্যে মুসলমানদেরকে গরু জবাই করতে দেয়া হয় না, কেন মসজিদে মাইকে আজান দেয়ার সুযোগ দেয়া হয় না, যদিও মন্দিরে পূজার সময় মাইক ব্যবহৃত হয়।
অথচ আমাদের দেশে কোন কোন মহল মুসলিম সংস্কৃতি চর্চাকে এক ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।  মুসলিম মহিলাদের বোরকা-হিজাব পরাকে কেবল নিরুৎসাহিতই করা হয় না, ক্ষেত্রে বিশেষে সেগুলোর ব্যবহার জোর করে বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা অহরহই ঘটে। আবার কোন কোন মহল পুরষদের মুখে দাড়ি  রাখা কিংবা মাথায় টুপিপরাকে মৌলবাদ, এমনকি জঙ্গীবাদের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে, ধিক্কার দেয়। দাড়িওয়ালা-টুপিওয়ালাদের নামে কুৎসা রটানো হয়।
মুসলিম পুরুষরা মুখে দাড়ি রাখবেন, মাথায় টুপি পরবেন এটাই প্রত্যাশিত। আর মুসলিম মহিলারা বোরকা পরবেন তাদের দেহ ঢেকে রাখবেন, এটা কেবল মুসলিম সংস্কৃতিই নয়, বরং ধর্মীয় তথা আল্লাহর নির্দেশ। এই নির্দেশ তথা বোরকা পরাকে  আজ মৌলবাদের প্রতীক হিসেবে প্রচার করা হয়। এ প্রচারণা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বোরকা, এমনকি হিজাবপরা মুসলিম মেয়েদের বের করে দেয়া হয়। ধর্মীয় নির্দেশের কথা বাদ দিয়ে কেবল পোশাক হিসেবে বিবেচনা করলেও বোরকা-হিজাব-পরা কোন শিক্ষার্থী কিংবা মহিলাকে নাজেহাল করার অধিকার কারো নেই। কারণ এটা তার বা তাদের ‘ফ্রিডম অব চয়েস’। আমেরিকা-ইংল্যাণ্ডের মতো খ্রিস্টান প্রধান ধর্মনিরপেক্ষ দেশে মুসলিম মেয়েরা অবাধে বোরকা-হিজাব পরেন। আমেরিকাতে এমন বহু মুসলিম মহিলাকে দেখা যায়, যাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো শরীর ঢাকা, এমনকি দুটি চোখও দেখা যায় না। আর ইংল্যাণ্ডের পূর্ব লণ্ডনে, ওল্ডহেমে, কিংবা বার্মিংহামে বোরকা পরিহিতা এমন বিপুল সংখ্যক মুসলিম মহিলা  দেখবেন, বাংলাদেশের ঢাকা কিংবা অন্যকোন শহরে যা দেখেন নি। আমার মনে হয় ঐসব শহরের প্রায় শতভাগ মুসলিম মহিলা বোরকা কিংবা কমপক্ষে হিজাব পরেন। মনে হবে একটি মুসলিম দেশে আপনি পৌঁছেন। এর নাম স্বাধীনতা।  স্বাধীন দেশে ইচ্ছেমতো পোশাক পরিধানের অধিকার বা স্বাধীনতা রয়েছে, যতোক্ষণ পর্যন্ত তা অন্যের অধিকারকে হরণ না করে। একটি মহল হয়তো কোন মহলকে খুশি করার জন্য বাংলাদেশে এই ধর্মীয় পোশাকের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে।
অথচ ধর্ম নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে কিংবা তথাকথিত বাঙালী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আড়ালে মুসলিম সংস্কৃতি তথা বাংলাদেশের মুসলিম বৈশিষ্ট্যসূচক পরিচিতি মুছে ফেলার চক্রান্ত বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। মুসলিম সংস্কৃতি নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী। যদি মুসলমানরা তাদের সংস্কৃতিকে অমুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে তবেই তা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী হবে। কিন্তু মুসলমানরা মুসলমানদের সংস্কৃতি অনুসরণ ও লালন করলে তা কিভাবে এবং কোন যুক্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী হবে তার গ্রহণযোগ্য কারণ বা ব্যাখ্যা দেয়া হয় না। তেমন ব্যাখ্যা আদতেই নেই। আর মতলবী ব্যাখ্যা দেয়া হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পার্শ্ববর্তী ধর্মনিরপেক্ষ ভারত যদি সংখ্যাগুরু হিন্দুদের সংস্কৃতিকে লালন ও অনুসরণ করে, এমনকি অহিন্দুদেরকে হিন্দুদের সংস্কৃতি অনুসরণে বাধ্য করার পরেও ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে, তাহলে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের মুসলিমদের সংস্কৃতিকে কেন বিতাড়নের মুখে পড়তে হবে? বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন পশ্চিম বাংলাসহ ভারতীয় মুসলিমরা হিন্দুদের সাথে দেখা হলে বহুক্ষেত্রে কুর্নিশ করে নমস্কার বলে। কোন কথিত উদারবাদী কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মুসলমানদেরকে হিন্দু রীতিতে সৌজন্য বিনিময়কে মৌলবাদ কিংবা জঙ্গীবাদের আলামত বলে ধিক্কার দিতে শোনা যায় নি, কিংবা নমস্কারের পরিবর্তে সৌজন্য বিনিময়ের জন্য নতুন কোন শব্দেরও আমদানী করা হয় নি, যেমনটি হচ্ছে বাংলাদেশে ‘আস্সামুয়ালাইকুম’এর পরিবর্তে শুভ সন্ধ্যা, শুভ সকাল, শুভরাত্রি ইত্যাদি প্রচার ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ঠিকই নমস্কার/নমস্তে বলেন, সেগুলোর অনুবাদ কিংবা প্রতিশব্দ ব্যবহার করেন না, যেমনটি করা হয় বাংলাদেশে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’এর বেলায় বাংলা তরজমা করে ।
অর্থাৎ বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান টার্গেট বা শিকার হলো মুসলিম পরিচিতিমূলক সংস্কৃতি । যুক্তি দেয়া হয় যে, ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিজাতি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হওয়া মানে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাই ছিল ভুল, অর্থাৎ উপমহাদেশ বিভক্তি সঠিক ছিল না। উপমহাদেশ বিভক্তি সঠিক ছিল না প্রমাণ করা গেলে উপমহাদেশকে আবার একত্রিত করার যুক্তি তৈরি হয়। এটাই ছিল নেহেরুদের তথাকথিত অখণ্ড ভারত তথা রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ।  অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা মানে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তথা অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার পোষ্যরা একবারও বলে না, হিন্দুদের প্রভুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক মানসিকতা এবং অসহযোগিতা আর শোষণ-নির্যাতন এবং মুসলমানদেরকে ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ প্রদানে হিন্দুদের অস্বীকৃতির কারণেই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছে। তারা কি ভুলে গেছেন উপমহাদেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মুসলমানদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর বিপদজনক দুর্বিসহ পরিস্থিতি হতে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে দ্বিজাতি তত্ত্ব লাহোর প্রস্তাব কিংবা উপমহাদেশে মুসলিম আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছিল?  পূর্ব বাংলার খেটে খাওয়া ক্ষেতমজুর, নৌকার মাঝি তথা হিন্দুদের চাকর-বাকর তৎকালীন মুসলমানরা কেন পশ্চিম পাকিস্তানের অজানা-অচেনা লোকদের সাথে একত্রিত হয়ে একটি স্বাধীন মুসলিম আবাসভূমি গঠন করেছিল? আর সেই আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় বাংলার মুসলমান এমনকি নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও কেন একচেটিয়া ভোট দিয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে হিন্দুদের নির্যাতন ও অপমানে জর্জরিত মুসলমানরা বাধ্য হয়েই ভিন্নদেশী মুসলমানদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পৃথক আবাসভূমির দাবি তুলেছিলেন। সেই আবাসভূমির অংশ হওয়াতেই আজকের বাংলাদেশ এবং আমাদের সব ধরনের উন্নতি সমৃদ্ধি প্রতিপত্তি  অর্জন সম্ভব হয়েছে। ১৯৪৭ সনে আমাদের পূর্ব-পুরুষদের দূরদর্শিতামূলক সিদ্ধান্তের কারণেই ভারতের সাথে যোগ না দিয়ে পাকিস্তানে যোগ দেয়ায় ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল প্রেরণাই ছিল আমরা মুসলিম এবং হিন্দুদের অত্যাচার অপমান ও শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়া। ১৯৭১ সনের যুদ্ধ মুসলিম পরিচিতি কিংবা মুসলিম কৃষ্টি-কালচারের বিরুদ্ধে ছিল না, তা ছিল শোষণ ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসমিলম পরিচিতি মুছে ফেলার সামান্য ইঙ্গিতও ছিল না, বহির্শক্তির হস্তক্ষেপও শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক স্বদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা অন্যকোন রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সংখ্যাগুরু মানুষের পরিচিতি ও সংস্কৃতিকে কোন অজুহাতে মুছে ফেলতে পারে না।
মুসলিম পরিচিতি আর সংস্কৃতি বিলুপ্ত হলে একসময় বাংলাদেশের পৃথক অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে।  তাই বাংলাদেশের অর্থবহ স্বাতন্ত্র-স্বাধীনতা হেফাজত করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশের মুসলিম পরিচিত নিয়েই  এগিয়ে যেতে হবে। ভারতসহ ধর্মনিরপেক্ষ সবদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মবিশ্বাস-কেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য তথা সংস্কৃতিককে বর্জন করা হয় নি,বরং সেগুলো যথাযথভাবে লালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশকেও তার অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তার মুসলিম পরিচিতিমূলক সংস্কৃতিকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, কারণ এ পরিচিতির কারণেই আমাদের পূর্ব-পুরুষরা ১৯৪৭ সনে ভারতের সাথে না মিশে মুসলিম আবাসভূমি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তো ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতিই চালু রয়েছে।  ধর্মনিরপেক্ষতা প্রমাণ কিংবা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি হিন্দুয়ানী শব্দ কিংবা সংস্কৃতির কোন অংশ বাদ দিয়ে মুসলিম কিংবা অন্যকোন ধর্মের অনুসারীদের রীতি চালু করা হয় নি। বরং ভারত দিন দিন হিন্দুত্বাবাদী জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরো শানিত করছে, কারণ সেখানে ৮০% অধিবাসী হিন্দু। ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা মনে করেন ভারতকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করতে হতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরো জোরদার করতে হবে। আর তা জোরদারকরণের সহজ অস্ত্র হচ্ছে মুসলিমবিরোধী শক্ত অবস্থান  নেয়া এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা। ভারতীয় এমন কোন  চলচ্চিত্র নেই যেখানে কোন না কোনভাবে মন্দির আর দেব-দেবীকে দেখানো হয় না। কথিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারত হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়েই সর্বক্ষেত্রে তাদের মূর্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে কেবল লালন নয় প্রসার করছে, আমাদের দেশসহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে।  
অন্যদিকে বাংলাদেশের ৯০% অধিবাসীই মুসলমান। আমাদের দেশে সংখ্যগুরু অধিবাসীদের ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা বাঙালী পরিচয়ের নামে বিলীন করার প্রচেষ্টা চলছে। মুসলিম সমাজে ব্যবহৃত বহু শব্দ তুলে দেয়ার প্রবণতা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। মৃতব্যক্তির দেহকে মুসলমানরা বলে লাশ আর হিন্দুরা বলে মরদেহ। আমাদের টিভি চ্যানেলে এখন প্রতিনিয়ত লাশ’এর পরিবর্তে মরদেহ বলা হয়। একইভাবে মৃতব্যক্তিকে মুসলমানরা মরহুম আর হিন্দুরা প্রয়াত বলে। বাংলাদেশী প্রচার মাধ্যম মুসলিম সমাজে ব্যবহৃত শব্দ মরহুমের পরিবর্তে হিন্দু শব্দ প্রয়াত ব্যবহার করছে। মৃতব্যক্তিকে কবর দেয়াকে মুসলমানরা দাফন বা কবরস্থ করা হয়েছে বলে। আর হিন্দুরা বলে সমাহিত করা হয়েছে। আমাদের প্রচার মাধ্যমে মৃত মুসলমানদের ক্ষেত্রেও  হিন্দুদের ব্যবহৃত সমাহিত শব্দ ব্যবহার করা হয়। এককথায় মুসলমানদের ব্যবহৃত বহু শব্দ বাদ দিয়ে হিন্দুদের ব্যবহৃত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ব্যবহৃত শব্দের বিপরীতে সংখ্যালঘুদের ব্যবহৃত শব্দ মুসলমানদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা কোন ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা?
বাংলাদেশে মাত্র ৮% অধিবাসী হিন্দু, ৯০% মুসলিম এবং বাকি ২% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠতার নামে মুসলিম সংস্কৃতি এবং শব্দ ব্যবহারের উপর অঘোষিত কিংবা ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সেখানে বাঙালী সংস্কৃতির নামে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়েছে। যেমন মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো। এটা কোনভাবেই মুসলমানের সংস্কৃতি নয়, এমনকি বাংলাভাষী হিন্দুদের একক সংস্কৃতিও নয়। এটা সর্বভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব কখনোই এ ধারা চালু করেন নি, এর সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার সংযোগও নেই। মঙ্গলপ্রদীপ সরাসরি উপমহাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি, হিন্দু ধর্মের একটি অংশ, সেটাকে বাঙলাী সংস্কৃতি হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ভারতীয় মুসলমানরাও মঙ্গলপ্রদীপ চর্চা করেন না। পশ্চিম বাংলায় পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয় না বলেই জানি। আমাদের দেশে এটা সম্ভবত চালু হয়েছে এরশাদের সময় থেকে । মুতলব আলী নামে চারুকলা ইনিস্টিটিউটের জনৈক শিক্ষক ২০১৩ সনে নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে  কিভাবে তারা তথাকথিত মঙ্গল শোভাযাত্রা চালু করেন, তার ফিরিস্তি বয়ানের পর, আমি তাকে বললাম: আপনারাই বলেন, শেখ মুজিব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী।  বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তিনি চারটি নববর্ষ দেখেছিলেন। তার সময়তো মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো হয় নি, কিংব তথাকথিত মঙ্গল শোভাযাত্রাও চারুকলা ইনিস্টিটিউট থেকে বের হয় নি,  তাহলে আপনারা  কেন এসব চালু করে এখন কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করছেন। অধ্যাপক সাহেব আমার প্রশ্ন শুনে হতবাক হয়ে গেলেন, কথাই বলতে পারলেন না। মনে হয়েছে  তিনি ভাবলেন, এ ব্যাটা  নির্ঘাত রাজাকারই হবে। তার হাবভাব আঁছ করতে পেরে আমি বলে ফেললাম: দেখুন আমি রাজাকার নই, বরং এমন মুক্তিযোদ্ধা যে গেরিলা প্রশিক্ষণ শিবিরে ‘একনদী রক্ত’ নামক পূর্ণাঙ্গ মঞ্চ নাটক লিখে তা ভারতেই মঞ্চস্থ করেছে। হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া ঐ অধ্যাপকের মুখে কোন উত্তরই ছিল না।
তথাকথিত ধর্মনিপেরক্ষতার পক্ষে যারা কথা বলছেন তাদের সবারই একই অবস্থা। মঙ্গলপ্রদীপ কোনভাবেই বাঙ্ালী সংস্কৃতিও নয়, পুরোপুরি হিন্দু সংস্কৃতি। সারা ভারতের সব অঞ্চলের হিন্দুদের প্রাত্যতিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হলো মঙ্গল প্রদীপ। এটা পূজার অপরিহার্য অংশ। এটা  কোনভাবেই মুসলিম সংস্কৃতি নয়। অন্যদিকে মঙ্গল প্রদীপ কোনভাবেই বাংলাভাষী হিন্দুদের একক সংস্কৃতিও নয়, সর্বভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি।  ধুতি প্রসঙ্গেও একই কথা । যারা বলেন, ধুতি বাঙালী সংস্কৃতি তারাও সত্যকে লুকাচ্ছেন । ধুতি সারা ভারতের হিন্দুদের পোশাক।  গান্ধীসহ তাবৎ হিন্দু নেতারা ধুতি পরেন এবং পরতেন।  ধুতি যদি বাঙলীর পোশাক হয়, তবে তো  গুজরাটি গান্ধীর কিংবা হালের মোদির ধুতি পরার কথা নয়। রাজনীতি করতে গিয়ে জনসাধারণ্যে গান্ধী ধুতির একাংশকে খাটো করে নেংটি হিসেবে পরতেন এবং Natun-6221বাকি অংশ গায়ে লাগাতেন।  উৎসাহী যেকোন ব্যক্তি নিচের লিং টা দেখুন: 

(http://binscorner.com/pages/l/life-in-pictures-mahatma-gandhi.html)| )।

জওহারলাল নেহেরু পাশ্চাত্য পোশকের পাশাপাশি শেরওয়ানী পরলেও ধুতি পরা ছাড়েন নি। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার নামে হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক ধুতি বর্জন করেন নি। ঘরোয়া পরিবেশে তো বটেই এমনকি রবিঠাকুরের সাথে দেখা করার সময়ও তিনি  ধুতি পরিহিত ছিলেন। কারণ ধুতি হিন্দুত্বের প্রতীক।  
Natun-72311
স্ত্রী এবং মেয়ের সাথে ধুতি পরিহিত নেহেরু(

(http://abhisays.com/photography/30-old-and-rare-photos-of-pandit-jawaharlal-nehru.html)|

)।
ধুতি কার পোশাক এবং বাঙালী কারা  এ প্রসঙ্গে আমি পশ্চিম বাংলার লেখক বসন্ত চ্যাটার্জির গ্রন্থের সাহায্য নিতে চাই। শেখ মুজিবের শাসনামলে বাংলাদেশ সফল সম্পর্কে তিনি ১৯৭৩ সনে ইংরেজিতে একটি বই

() লিখেছিলেনInside Bangladesh Today: An Eye-witness Accounts। এ গ্রন্থে তিনি মনের কষ্টে উল্লেখ করেছিলেন যে, তিন দিন ঘুরেও তিনি ঢাকা শহরে কোন বাঙালী দেখতে পান নি। অবশেষে তিনি নবাবপুর রোডে তিনজন বাঙালীর দেখা পেলেন। কিভাবে বুঝেছিলেন ঐ তিনজন বাঙালী? এর উত্তর  তিনি নিজেই দিয়েছেন: তাদের পরনে ধুতি ছিল বলেই তিনি বুঝতে পারলেন তারা বাঙালী। আজকের ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা  বাঙালী কারা, ধুতি, মঙ্গল প্রদীপ কার সংস্কৃতি, এ সম্পর্কে আরো কোন কথা বলবেন কি?
অন্যদিকে তথাকথিত বাঙালী সংস্কৃতির নামে বসন্তবরণ, বর্ষাবরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবের আবরণে যেসব  উপদ্রব ইদানিং আমাদের  উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে সেগুলোও মুসলিম সংস্কৃতি নয়। এসব তথাকথিত ‘বরণ’ উৎসব আগে ছিল না। এগুলো হলো মুসলিম সংস্কৃতি তথা পরিচিতিমূলক সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার চক্রান্ত বিশেষ।
মুসলিম সংস্কৃতি বিলুপ্ত করার অভিযানে আমাদের টিভি চ্যানেলের ভূমিকা প্রসঙ্গে কিছু কথা না বললেই নয়। কলিকাতার টিভি চ্যানেলে দর্শকদেরকে হিন্দু  উপস্থাপিকা হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী ‘নমস্কার’ বলে সম্বোধন করলে কিংবা তাদের মহিলারা সিথির মধ্যে সিঁদুর পরলে ধর্মনিরপেক্ষতা নষ্ট হয় না। কলিকাতার কোন বুদ্ধিজীবী কিংবা নারীবাদী অথবা কথিত সংস্কৃতিসেবী বলে না যে এগুলো হিন্দু মৌলবাদী হিন্দুজঙ্গীবাদের প্রতীক কিংবা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী। অথচ ঢাকার টিভি চ্যানেলে মুসলিম দর্শকদের সাথে কথা বলার সময়েও কোন কোন চ্যানেলের মুসলিম উপস্থাপিকা ‘আস্সালা-মুয়ালাইকুম’ না বলে ‘শুভ সকাল’ কিংবা ‘সন্ধ্যা/রাত’ ইত্যাদি বলেন। কোন দর্শক ফোনে ‘আস্সালা-মুয়ালাইকুম’ বললেও উপস্থাপিকতা তাকে ‘শুভ সকাল’ ‘শুভ সকাল’ বলে জবাব দেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের হিন্দু দর্শকরা একই টিভি চ্যানেলে নমস্কার বললে উপস্থাপিকা আপত্তি করেন না। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী কোন কোন  মুসলিম মহিলা শিল্পীকেও উপস্থাপিকা হিন্দু রীতিতে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করেন, মুসলিম পারিবারিক ভাষা ‘আপা’ বলে নয়।  সবকিছু দেখে মনে হয়, এ ধরনের উপস্থাপিকা ফরমায়েসী দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে প্রায় সবগুলো টিভি চ্যানেলের অধিকাংশ অনুষ্ঠানে অধিকাংশ মহিলার মাথায় কাপড় দেখা যায় না । এসবই মুসলিম পারিবারিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী । এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাথায় কাপড় দিয়ে যেসব অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সেসব অনুষ্ঠানে দর্শক সারিতে বসা মহিলাদের অধিকাংশের মাথায়ই কাপড় দেখা যায় না। এই বিপরীত দৃশ্য কেবল বেমানানই নয়, দৃষ্টিকটূও বটে। প্রধানমন্ত্রীর একটি উপদেশই মুসলিম মহিলাদের মাথায় কাপড় উঠতে পারে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন।
উদ্বিগ্ন মহল মনে করেন, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আজ যা প্রচার করা হচ্ছে কিংবা দেখানো হচ্ছে তা সরাসরি বাংলাদেশের মুসলিম পরিচিতিকে মুছে ফেলার অভিযান। এ অভিযানে সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রকটভাবে আক্রান্ত। এ আক্রমণের ভয়াবহতা বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং পোশাক-পরিচ্ছেদকে প্রভাবিত করেছে। এ অভিযানকে দ্রুত সামনে নিয়ে যাবার জন্য প্রচুর অর্থের লেনদেন করা হচ্ছে। আমাদের তরুণ সমাজ তথা অসচেতন জনগণ এর ভিতরের কাহিনী ও উদ্দেশ্য হয়তো জানেন না। একটি গোষ্ঠী পুরোপুরি ব্যক্তিগ স্বার্থ-সুবিধার জন্য এমন আত্মঘাতী কাজে  মগ্ন রয়েছে, যারা বাকিদের বিভ্রান্ত করছেন। টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান, শব্দমালা পোশাক-পরিচ্ছেদ দেখলে বুঝা যায় বাংলাদেশ কেমন ভয়াবহ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার।
আমাদের একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে: বাঙালী সংস্কৃতি মানেই সর্বভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি।  শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর মতো কোন বাংলাভাষী হিন্দুই বাংলাভাষী মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করে নি। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামের মতো সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক কবিকে হিন্দুরা মুসলমানদের কবি বলে অভিহিত করতো, বাঙালীদের কবি নয়। আজো পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষী মুসলমানদেরকে হিন্দুরা বাঙালী না বলে  মুসলমান বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। হিন্দুদের মতে কোন মুসলমানই বাঙালী নয়। যে মুহূর্তে কোন হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করেছে সাথে সাথে তার বাঙালীত্ব খারিজ হয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদেরকে বাঙালী হিসেবে পরিচিত করানোর জোর প্রচেষ্টার মূল রহস্য হলো দ্বিজাতি তত্ত্ব  কিংবা উপমহাদেশের বিভক্তি ভুল ছিল প্রমাণ  করে বাংলাদেশেকে ভারতের সাথে মিশে যাবার মানসিকতা সৃষ্টি করা।
সুতরাং সেই বাঙালী সংস্কৃতি চালু করার পরিণতি হবে মুসলমানদের মন-মানসিকতা হতে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ  ও চেতনা মুছে ফেলা । আর ‘নামে মুসলিম আর সংস্কৃতিতে হিন্দু’ হয়ে গেলে আমাদের অস্তিত্ব পরবর্তী কয়েক দশকে যে বিলীন হবার মুখে পড়বে না তা বলার কোন সুযোগ নেই। কারণ ১৯৭১ সনে আমরা আমাদের মুসলিম পরিচিতির বিনিময়ে  ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য যুদ্ধ করি নি। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ছিল গণতান্ত্রিক ফলাফলকে অস্বীকার করার পরিণতি। আর এখন বলা হচ্ছে ’৭১ সনে যুদ্ধের মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে, যা মোটেই সত্যি নয়। বরং স্বাধীন বাংলাদেশ দ্বিজাতি তত্ত্বেরই সৃষ্ট তথা লাহোর প্রস্তাবের বাস্তব রূপায়ণ। আর লাহোর প্রস্তাব ছিল উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাংশে স্বাধীন সার্বভৌম একাধিক রাষ্ট্রের পত্তন করার ঘোষণা। মুসলিম পরিচিতির ভিত্তিতে ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলেই ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।
সুতরাং আমাদের মুসলিম পরিচিতি, স্বাতন্ত্র্য-সংস্কৃতি আমাদের স্বাধীনতার প্রাণপ্রবাহ। একে হারালে আমাদের স্বাধীনতা তথা সব অর্জন, সমৃদ্ধি তথা অস্তিত্বই হারিয়ে যাবে। আবার আমরা পরাধীনতার যুগে ফিরে যাব। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মসমূহ হিন্দুদের ঝি-চাকর আর বেশ্যায় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। দৈনিক ইনকিলাবের ২১ আগস্ট (২০০৪) সংখ্যার একটি প্রতিবেদন আমি কোনভাবেই ভুলতে পারি না। ২০ আগস্ট (২০০৪) সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগর পূজা  উদ্যাপন কমিটির সভায় জনৈক বক্তার খেদোক্তি ছিল এ রকম: “এখন আর হিন্দু বাড়িতে মুসলিম ঝি-চাকর পাওয়া যায় না। মুসলমানরা এখন আর হিন্দু বাড়িতে কাজ করতে আসে না। এটা খুবই দুঃখজনক। আর এই পরিস্থিতি শুরু হয়েছে ১৯৪৭ সনের পর থেকে।”
আজকের রমারমা সাংস্কৃতিক ব্যবসা, এতো আয়োজন, এতো তোড়জোড়, কোন বিশেষ ব্যক্তির গান রাতদিন প্রচার, পোশাক-পরিচ্ছেদে, ভাষায় যে পরিবর্তনের হাওয়া তার উদ্দেশ্য হলো আমাদেরকে ’৪৭-পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার দুরভিসন্ধি।  ’৪৭’এর সীমানা উপড়ে ফেলা। ভারতীয় পোষ্য এখন আমেরিকাতে আশ্রিত তসলিমা নাসরিন তার কবিতায় তার গলায় বিদ্ধ ’৪৭’এর কাঁটা  উপড়ে ফেলার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশকে সেই দিকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতা কতো মূল্যবান আজকের স্বাধীন মুক্ত সমৃদ্ধ পরিবেশে বাস করে অনেকেই মনে হয় পরাধীনতার গ্লানি অনুধাবন করতে পারছেন না । ওটা কতো ভয়াবহ আমাদের পূর্ব-পুরুষরা তার ভূক্তভোগী ছিলেন বলেই তারা পৃথক স্বাধীন মুসলিম আবাসভূমির আওয়াজে সাড়া দিয়েছিলেন। আমাদেরকে সেই স্বাধীন স্বদেশ রাখতেই হবে। আর তা রাখার অন্যতম খুঁটি হচ্ছে ৯০% অধিবাসীর ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচার অক্ষুণœ রাখা । পুনরাবৃত্তি হওয়া সত্বেও আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই: মুসলিম  ধর্মীয় পরিচিতির কারণেই  আমরা ’৪৭ সনে আমাদের পূর্ব-পুরুষরা সুবিবেচকের ভূমিকা পালন করে ভারতের পরিবর্তে পাকিস্তান যোগ দিয়েছেন, যার প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সনে আমরা আবার স্বাধীন হয়েছি। ’৪৭ সনে ভারতে যোগ দিলে ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশ হতো না, আর ভারতের পক্ষ থেকে হাজারে সমস্যা চাপিয়ে দেয়ার পরেও আমাদের আজকের যে শান-শওকত, সমৃদ্ধ উন্নত জীবন তা হতো না, যা হয় নি ১৯৪৭ সনে ভারতের সাথে থেকে যাওয়া মুসলমানদের  Ñ এমনকি ভারতে অধীনে থাকা আমাদের প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার, বিহারের, উড়িষ্যার, আসামের, ত্রিপুরার, মেঘালয়ের, মিজোরামের, মণিপুরের, নাগাল্যাণ্ডের, কিংবা অরুণাচল প্রদেশের কিংবা দূরবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের। আমাদেরকে বুঝে-শুনে পদক্ষেপ নিতে হবে। আজকের কোন সিদ্ধান্ত যেন ৫০/১০০ বছর পরে আমাদের কলিজায়  Ñ  আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বে কেউ হাত দিতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। *
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Email: এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।



Bangla-Kotir
line seperator right bar ad
sunnati hazz
line seperator right bar ad
RiteCareFront
line seperator right bar ad
Adil Travel Winter Sale front
line seperator right bar ad
starling front
line seperator right bar ad

Prothom-alo Ittafaq Inkilab
amardesh Kaler-Kontho Amader-Somay
Bangladesh-Protidin Jaijaidin Noya-Diganto
somokal Manobjamin songram
dialy-star Daily-News new-york-times
Daily-Sun New-york-post news-paper

line seperator right bar ad

 

 Big

line seperator right bar ad
Rubya Front
line seperator right bar ad

Motin Ramadan front

line seperator right bar ad
 ফেসবুকে বিএনিউজ24
line seperator right bar ad
   আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...
line seperator right bar ad
banews ad templet
 
 
line seperator right bar ad
   ফটোগ্যালারি
  আরো ছবি দেখুন -->> 
line seperator right bar ad
 
    পুরাতন সংখ্যা
banews ad templet