লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়

আবদুল আউয়াল ঠাকুর : বাংলা প্রবচন হচ্ছে, আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যা বড় বলে বড় সেই হয়। সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি কেন্দ্র করে এমন কিছু আলোচনা-কথাবার্তা হচ্ছে যা দেখে-শুনে মনে হতে পারে লোকলজ্জার মাথা খেয়ে ফেলেছে Takur সরকার। সরকারের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা বিএনপিকে নিয়ে যেমনি যা মনে আসছে তাই বলছেন তেমনি তাদের কোন কোন সহযোগী নেতাও অনেকটাই নিজেদের সম্পর্কে আঁচ না করেই মন্তব্য করে যাচ্ছেন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জনদাবি নিয়ে কোন মন্তব্য না করে সরকারের শীর্ষ নেতারা বরং নতুন আশঙ্কার কথা বাতাসে ছড়াচ্ছেন। সেই সাথে অনেকে সারিন্দায় পুরনো সুর তোলার চেষ্টা করছেন। দেখে মনে হচ্ছে বিএনপি কেন পৌর নির্বাচনে গেল এটাই যেন সরকারের জন্য নতুন গাত্রদাহের কারণে পরিণত হয়েছে। গত কিছুদিনের কর্মকা-ের নানামাত্রিক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। এসবের পরিণতি কোন দিকে যায় তা অবশ্যই দেখার বিষয়।

মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে রাজনীতিতে মাঝখানে কার্যত একটা বিরতি চলছিল। সে অবস্থা কাটিয়ে সরকার ঘোষিত পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্রকরে অথবা অন্য যেকোন কারণেই হোক রাজনীতিতে নতুন বাতাস বইতে শুরু করেছে। সরকারি বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক বিষোদ্গার থাকলেও বিশ্লেষকগণ এর মধ্যে নতুন উপাদানও খুঁজে পেতে চেষ্টা করছেন। সময় রাজনীতির জন্য একটি বড় ফ্যাক্টর। সময় যেমনি সবকিছু ঠিক করে দেয় তেমনি সময়ের এক ফোড় অসময়ের শত ফোড়ের চয়েও উত্তম। বোধকরি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যারা রয়েছেন তারা সেই সময়েরই অপেক্ষা করছেন। প্রকাশ্যত কোন আলোচনা না থাকলেও লক্ষণীয় যে, পত্র-পত্রিকায় মিডিয়ায় এক ধরনের নির্বাচনী ঘ্রাণ রয়েছে। গত কদিনে কোন কোন ইসলামী দলের ‘সংগঠিত’ হওয়ার খবরকে কেন্দ্র করে সরকারের নানা কৌশলের খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। এ থেকে মনে হতে পারে ভেতরে ভেতরে হয়তো সরকারের মধ্যে একধরনের প্রস্তুতি চলছে। পৌরসভা নির্বাচনের প্রকাশিত ফল যাই হোক সরকারের কাছে নিজস্ব একটি রিপোর্ট রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় অনিশ্চয়তার মধ্যে অনুষ্ঠিত বিএনপির সমাবেশে লাখ মানুষ এবং ঢাক ঠোল পিটিয়ে সরকারি জনসভারও একটি মূল্যায়ন রয়েছে। লক্ষণীয় হচ্ছে, সরকারি দলের সর্বশেষ জনসভা মিডিয়ায় খুব একটা ঠাঁই পায়নি।

এর মধ্যেও এক ধরনের বার্তা যে নেই সেকথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। এই বাস্তবতায় সরকারি দলের সম্পাদক ম-লীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজের মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা প্রমাণে সফলতার প্রমাণ দিতে না পারলেও বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, আন্দোলন করার কোন ক্ষমতা, শক্তি, সামর্থ্য ও সক্ষমতা যে তাদের নেই গত সাত বছরে তা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি একথা যখন বলছেন, তখন প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে জারি করা হয়েছে অষ্টম বেতন কাঠামোর গেজেট। বোধকরি সরকার পরিচালনায় বর্তমানেরা কতটা সক্ষম তার জন্য এটা একটা বড় নজির। সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা বা অক্ষমতার মাশুল কেবল সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হচ্ছে তা তো নয় এর বড় ধরনের মাশুল দিতে হচ্ছে জনগণকে। কোন প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা সঙ্গত সে বিবেচনায় না গিয়ে সক্ষমতার প্রশ্ন যখন সড়কমন্ত্রী তুলেছেন তাকে দিয়েই শুরু করা বিধেয়। বর্তমান মেয়াদে দু’বছর ধরে তিনি তার মন্ত্রণালয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজধানীর যানজট নিরসনে এ পর্যন্ত তার নানা কথা শোনা গেছে।

সর্বশেষ আবারো ছ’মাসে বর্ধিত সময়ের আবেদন করেছেন। সবিনয়ে তার কাছে জানতে চাই, সড়ক অব্যস্থাপনার জন্য কে বা করা দায়ী অনুগ্রহ করে বলবেন কি? আজো যে কোনদিন যদি মাননীয় মন্ত্রী আগের মতো ছদ্মবেশে রাস্তায় নামেন দেখতে পাবেন কোন সাধারণ জনগণ বা বিরোধীদলের জন্য নয় বরং যাদের জনগণের টাকায় বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে জনসাধারণের সুবিধা নিশ্চিত করতে তাদের একগুঁয়েমিতেই অব্যাহত যানজট। কৈ এ নিয়ে তো মাননীয় মন্ত্রী একবারও মুখ খোলেননি। দেশের সড়কগুলো তথা খোদ রাজধানীর সড়কগুলো চলাচলের অযোগ্য এজন্য কে বা কারা দায়ী, কাদের ব্যর্থতাতে এ অবস্থা তা নিয়েতো তিনি মুখ খোলেননি। এইতো সেদিন মাত্র চার ঘণ্টার ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু সেতুতে আট সিরিজ দুর্ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক সংঘটিত এসব দুর্ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীর পুত্রসহ ৭ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো শতাধিক। প্রকাশিত রিপোর্টে দুর্ঘটনার বলা হয়েছে, ঘন কুয়াশা ও সেতুতে স্থাপিত লাইটিং বাল্বগুলো বন্ধ থাকার ফলে সেতুর মাঝামাঝি এলাকায় পৃথক পৃথক স্থানে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, সেতুতে স্থাপিত সোডিয়াম লাইটগুলো বন্ধ ও ঘন কুয়াশার কারণে ভোরে একটি গাড়ি অপর একটি গাড়িকে ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনা ঘটে।

অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রথম দুর্ঘটনার পর আরো কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটে। এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৫৮১টি ছোটবড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হন, আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। অবশ্য পুলিশ সদর দফতর বলেছে, উল্লেখিত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে, ২৪৩২ জন। আহত হয়েছে, ১৮৮৩ জন। আর এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে, ২৩৯১টি। আলোচনা নির্দেশনা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা যাই হোক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল। সড়ক মহাসড়কগুলো যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যু ফাঁদে। সারা দেশে বছর জুড়েই চলছে মৃত্যুর মিছিল। কেন এসব দুর্ঘটনা তা নিয়ে এ পর্যন্ত গবেষণা কম হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহল এমনকি সর্বোচ্চ আদালতও সম্প্রতি দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এতসবের পরেও যাদের হুঁশ হওয়া প্রয়োজন বা জরুরি তারা যে এসব ব্যাপার কেয়ার করছেন তেমনটা মনে হবার মত কোন তথ্য-উপাত্ত নেই।

আলোচ্য দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে সুনির্দিষ্ট করেই বলা যায়, দেখার কেউ থাকলে হয়তো এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে যেত না। সঙ্গত প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন এবং কি কারণে অথবা কার অবহেলায় সড়কের বাল্ব থাকল না? দ্বিতীয় বিবেচনা হচ্ছে, কুয়াশা দেখা দেয়ার পর সেতুতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি? তৃতীয়ত, প্রতিটি গাড়িতে কুয়াশা বাতি থাকার কথা। যদি কোন যানবাহনে তা না থেকে থাকে অথবা পরিবহনগুলো যদি তা ব্যবহার না করে থাকে তাহলে কুয়াশায় এসব গাড়ি সেততেু উঠতে পারল কিভাবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এটা বারবার বলা হচ্ছে, সচেতনতা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সম্ভবত যাদের সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে তাদের কান পর্যন্ত এ কথা পৌঁচছে না অথবা তারা কথা শোনর কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অপ্রিয় হলেও সত্যি, অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই খাত রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে কাউকে তোয়াক্কা না করার এক ধরনের প্রবণতা হয়তো কাজ করছে।

দেশ এমনিতেই মৃত্যুর উপত্যাকায় পরিণত হয়েছে। সড়কে প্রতিদিন প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। তার দায়িত্ব কে নেবে মাননীয় সড়কমন্ত্রী অনুগ্রহ করে বলবেন কি? এই হত্যাকে কেন ইচ্ছাকৃত হত্যা বলা যাবে না। সংশ্লিষ্ট মহল আন্তরিক হলে কোন ধরনের সুফল লাভ সম্ভব নয়-একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যার নিজের মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ভূঁরি ভূঁরি তিনি যখন অন্যদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন দুঃখ রাখার জায়গা থাকেন। গত কয়েকদিনে কিছু খবর পর্যালোচনা করে মৌলিক কিছু প্রশ্নে জবাব পাওয়া জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্ন যখন গুরুতর আকার ধারণ করেছে তখন সংশ্লিষ্ট মহল পুনরায় অভিযান শুরুসহ নানা ধরনের অলোচনা শুরু করেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত দু’বছরের একটি মূল্যায়ন করেছেন। এ সময়কে তিনি জেল-জুলুম-নির্যাতনের সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচনের দাবিদার রাজনৈতিক দলের দায়িত্বে রয়েছেন তার কথা না হয় বাদই থাকল কারণ সরকার তো সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা শুনলেই সেখানে জঙ্গি খুঁজে। আন্তর্জাতিক মহলও বাংলাদেশে গুম-খুন-হত্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো অব্যাহতভাবে একই ধরনের অভিযোগ করছে। সেসব বাদ দিলেও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রকাশিত দু-একটি ঘটনার দিকে চোখ বুলান যায়।

এক অপ্রাপ্ত বয়সের শিশু ধর্ষণ মামলার আসামি বাবার কোলে এসে আদালত থেকে জামিন নিয়েছে বলে সচিত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্য এক খবরে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক মামলায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রেফতার হওয়া একটি শিশু জামিনে মুক্তি পেয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বানে ডাকা হরতালে এই শিশুটিকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গত কয়েকদিনে ইজতেমাসহ কয়েকটি ঘটনায় সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগে সরকারিদলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা গ্রেফতার হয়েছে। ছাত্রলীগের সম্মেলনেও নিজেদের মধ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কলহের জের ধরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। দেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যেই বিশিষ্ট নাগরিকগণ বিবৃতি প্রদান করেছন। বাস্তবত দেশব্যাপী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে থাকলেও তা নিরসনের কোন অভাস না থাকায় উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারে বৈষম্যমূলক আচরণের কারণেই পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করেছে। এর জের সর্বত্রই পড়ছে।

সরকারে লোকজন যখন দেশ নিয়ে বিশেষ করে বিরোধীদের নিয়ে কথা বলছেন, তখন সামগ্রীক কোন চিত্র তুলে ধরছেন না। যে জনগণের জন্য দেশ তারাই যদি নির্যাতীত বা অধিকার বঞ্চিত হন তাহলে তার পরিণতি কারো জন্যই শুভকর হতে পারে না। দেশের মানুষও আন্তর্জাতিক মহল যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারকেই সবচেয়ে জরুরি বিষয় বলে মনে করছে তখন সরকার কথিত উন্নয়নের ঢাক ঢোল পেটাতে শুরু করেছে। যদিও এটা নতুন কিছু নয় যে সরকার যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অথবা জনতাকে বোকা বানানোর অর্থহীন চেষ্টায় রত থাকে তখন একাজটিই করে। যেন মনে করা হয় গণতন্ত্র উন্নয়নের শত্রু।

অন্য দেশের উদাহরণ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশের কথাই বলি। ১/১১-এর সরকার এধরনের এক অপপ্রচার চালিয়েছিল যে বিএনপির আমলে উন্নয়নের গতি শ্লথছিল। বাস্তবে তাদের আমলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, সরকার চালাতে বিদেশে কাছে ধর্না দিতে হয়েছে এবং সর্বত্র করারোপের নীতি গ্রহণ করতে হয়েছে। করের একটি ঘৃণ্য উদাহরণ হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়িতে আয়করারোপ। বর্তমান সরকারে অবস্থাও তার চয়ে কোন অংশেই উন্নত নয়। কথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে সরকার কার্যত ভারত নির্ভর হয়ে পড়ছে। ঋণ বা অনুদান যেভাবেই এ টাকা সরকারে কাছে আসুক না কেন জনগণকেই তা পরিশোধ করতে হবে। জনগণের আয়-উন্নতি না থাকলে এসব নিয়ে বিপদ-বিপত্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা হয়তো এখনও সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন না। সবকিছু বাদ দিয়ে সরকারের গত দু’বছরে সফলতার একমাত্র উদাহরণ পদ্মা সেতু। বিশ্লেষকগণ বলছেন, পৃথিবির সবচেয়ে আন প্রেডিকটেবল নদীর অন্যতম এই নদী শাসনেই এখন বিপুল অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিগত বিএনপি সরকারের সময়কালের কিছু কথা অনেকে উল্লেখ করেছেন।

এখন কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্টদের কথাতেও সেসবই উঠে আসতে শুরু করেছে। শরীরের সমস্ত রক্ত মুখে এলে তাকে যদি স্বাস্থ্য বলা না যায় তাহলে এ ধরনের উন্নয়ন নিয়েও গর্ব করারমত কিছু নেই। এ সেতু যেহেতু জনগণের অর্থে হচ্ছে তাই ভাববার রয়েছে অনেক কিছু। সরকার যাই বলুক না কেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক একটি দৈনিকের সাথে আলোচনা কালে স্পষ্ট করেই বলেছেন, উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে চূড়ান্ত বিচারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকতেই হবে। মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সেই জায়গা তৈরি করতে হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধু নির্বাচনে ভোট দেয়া নয়, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগকে অপরিহার্য মনে করা হলেও সরকারের বর্তমান মেয়াদে সে খাতে কোন সুবাতাস নেই। কেন নেই সে আলোচাতেও মূলত উঠে এসেছে আস্থার প্রসঙ্গ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আস্থার সংকট রয়েছে এবং বর্তমান অবস্থা চলমান থাকলে তা আরো বেড়ে যেতে পারে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন সরকার যে ধারায় নির্বাচন করছে তাতে মানুষের আস্থা থাকবে না। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে বলে যে অভিযোগ করেছন প্রধান বিচারপতি সেটি খুবই উদ্বেগজনক। তিনি মন করেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে আমাদের শীতল সম্পর্ক রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, গত দুই বছরে দেশে গণতন্ত্র নির্বাসনে চলে গেছে। আইনের শাসন বাক্সবন্দি হয়ে পড়েছে। তার মতে সরকার এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। আগামীতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হবে। একথা বলাই বাহুল্য, অর্থনীতি নাজুক হচ্ছে। প্রধান বিচারপতিও বলেছেন, চোরাকারবারির কারণে দেশের অর্থনীতি ধংস হয়ে যাচ্ছে। তার এই অভিমতকে জাজমেন্ট বলে ধরে নিলে সরকারের কথিত উন্নয়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। একে যদি সরকারে সক্ষমতা বলে অভিহিত করা যায় বা হয় তাহলে বোধকরি ব্যর্থতার উদাহরণ পাওয়া কষ্টকর। সরকারের সফলতা-সক্ষমতার বিবেচনায় যদি সুশাসন ন্যায় বিচারকে সূচক হিসেবে বিবেচনা করা যায় তাহলে বোধকরি বিচারবিভাগ নিয়ে প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন তাকে গভীর বিবেচনায় নিতে হবে। সুপীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় আইনজীবীদের আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাচ্ছে। তিনি আরো বলেছেন, একযুগেরও বেশি সময় পরেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আসেনি। আজকের বাস্তবতায় যদি প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে বলতেই হবে এযাবৎকাল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সরকারি মহল যা বলেছে তা প্রকৃতপক্ষে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। প্রধান বিচারপতির বর্তমান বক্তব্য নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাননি আইনমন্ত্রী। বর্তমান সময়ে দেশে যে বৈষম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে সে ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার নিয়ে যেসব আলোচনা রয়েছে তাতে প্রধান বিচারপতির উপলব্ধিরই প্রতিধ্বনি রয়েছে। সাধারণভাবে মনে করা হয় নির্বাহী বিভাগের দ্বারা নাগরিকরা যখন নির্যাতিত হন তখন বিচার বিভাগই তাদের আশা-ভরসার স্থল। বিচার বিভাগের এই জনমুখী ভূমিকার জন্য এখন পর্যন্ত মানুষের শ্রদ্ধারপাত্র হয়ে রয়েছেন বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ। স্বাধীন বাংলাদেশেও অনেক বিচারপতি তাদের বিবেকের রায় প্রদানের জন্য জনগণের হৃদয়ে স্থায়ি আসন গেড়ে আছেন। প্রধান বিচারপতির অনুভূতির যে গুঢ় অর্থ রয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় একজন পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তার পদোন্নতি পাবার আবেদনের মধ্যে। যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি বঞ্চিত এই কর্মকর্তা তার যোগ্যতার আবেদনে উল্লেখ করেছেন তিনি একজন আওয়ামী পরিবারের সন্তান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময়ে তিনি ২০১২ থেকে ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের ২৬ হাজার মামলা মনিটর করেছে। এতে তিনি কি করেছেন সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। গত পৌরসভা নির্বাচনেও একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেককে জাল ভোট দিতে দেখা গেছে। খ- চিত্র হলেও এর মাধ্যমে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির চিত্র উঠে এসেছে। শুধু এ ক্ষেত্রে নয় সর্বজনমান্য বরেণ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রে খোদ প্রধানমন্ত্রী আমলাদের জড়িয়ে শিক্ষকদের উদ্দেশে যে কথা বলেছেন তা প্রমাণ করছে সরকার মারাত্মকভাবে আমলা নির্ভর এবং আমলা ও দল একাকার হয়ে গেছে। ইতোপূর্বে মুক্তিযুদ্ধের ক্রেস্টের সোনা-রুপা চুরি করা হয়েছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সনদও জালিয়াতি করা হয়েছে। এসবে সঙ্গে যারা জড়িত বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সারা দেশে স্থানীয় প্রশাসনের চিত্রও অনুরূপ। এই বিবেচনায় যারা সরকারকে সক্ষম বলে বিবেচনা করছে তারা যে রাজনৈতিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তাতে সন্দেহ করার অবকাশ নেই। প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপির আন্দোলনের সফলতা নিয়ে। বলা দরকার বিএনপির আন্দোলনের প্রকৃতি কি? বিএনপি আন্দোলন করছে একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে। এটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ দাবি মনে হলেও প্রকৃত বিবেচনায় জাতীয় দাবি। সরকারের মধ্যে যারা নিজেদের গণতন্ত্রী বলে দাবি করেন তারা গণতন্ত্র রক্ষার দাবিকে কার্যকর করলেই তো আর আন্দোলন করতে হয় না। এই কাজটা যারা করতে পারছেন না অথচ ক্ষমতায় রয়েছেন তারা সফল না ব্যর্থ সে কথা কি ভেবে দেখেছেন? সফলতার অর্থ যদি হয় গণতন্ত্রকে তছনছ করে দেয়া তাহলে তো নতুন বিবেচনা উঠতেই পারে, হয়তো উঠবেও। যারা নিজেদের সফল বলে প্রমাণ করতে নানা কসরত করছেন তারা এতসব না করে জনগণের অধিকার অর্থাৎ ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েই নিজেদের সফলতার প্রমাণ দিতে পারেন। এটা যা কিছু করছেন তার চেয়ে অনেক সহজ। কে সফল কে ব্যর্থ তা নির্ধারণের দায়িত্ব প্রকৃতপক্ষে জনগণের। তাই সফলতা-ব্যর্থতা পরিমাপের সুযোগ জনগণকেই দেয়া হোক। এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র...
আবু জাফর মাহমুদ: সংবাদ পড়ছিলাম সৌদি আরবে...
শিবলী চৌধুরী কায়েস: ইউরোপের শিল্প সাহিত্য আর...
ডক্টর তুহিন মালিক: এক. ইতালীয় নাগরিক...