প্রচ্ছদবাংলাদেশ

জঙ্গী দমনের নামে বাংলাদেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: শেখ হাসিনা এবং তার দলের সুবিবধাভোগীরা সব সময়ই প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে, বাংলাদেশকে জঙ্গীমুক্ত করা হবে । বাংলাদেশে কোন জঙ্গী নেই। তাদের দলের সমর্থক নন এবং ভারতীয় আগ্রাসী হতে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চান  Ñ  এমন নিরীহ দেশপ্রেমিক শক্তিকেই ক্ষমতাসীনরা জঙ্গী বলছেন। মূলতঃ বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথে বলিয়ান এ দেশপ্রেমিক শক্তি ঘটনাক্রমে terror 20910 1470089015বিএনপি-জামায়াতের অনুসারী। এরা যে জঙ্গী কিংবা হিংসাত্মক ঘটনার সাথে জড়িত কোন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা কখনোই প্রমাণের চেষ্টা করা হয় নি। হয়তো এ কারণেই তদন্ত হয় নি, কারণ শেখ হাসিনা ও তার মুরুব্বীরা জানেন যে, মূল জঙ্গী বা সন্ত্রাসীরা তাদেরই তৈরি এবং এদেরকে ব্যবহার করেই বিরোধী দলকে নির্মূল করা হবে। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বা দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন পুলিশী তদন্ত ছাড়াই খুঁজে খুঁজে বিরোধী দলের নেতাকর্মী, এমনকি সমর্থকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাদের অধিকাংশই আর ফিরে আসেন না। ইলিয়াস আলী থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী থেকে বলপূর্বক অবসরে পাঠানো সেনাকর্মকর্তাও এ ধরনের উধাও হবার শিকার। এরা কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না, তা কারো জানা নেই। এ ধরনের নামকরা ব্যক্তিত্বদের অবস্থা যদি এমন হয়, তবে নিরেট পল্লী অঞ্চলের একেবারে নাম-পরিচয়হীন বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের অবস্থা কেমন করুণ ও বিপজ্জনক তা সহজেই অনুমেয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কতো হাজার কিংবা লাখ বিরোধীদলীয় সমর্থক ও নেতাকর্মী পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য, কিংবা দলীয় ক্যাডার অথবা বাংলাদেশে ছদ্মবেশে অবস্থানকারী ভারতীয় পেশাদার খুনি (কিলার)দের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, তার কোন পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। সাতক্ষীরায় ভারতীয় বুলডোজার হামলায় কিংবা শাপলা-চত্বরে কতো ঘুমন্ত মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষককে মেরে লাশ গুম করা হয়েছে তারও হদিছ নেই। 
ইদানিং পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে প্রায়ই জঙ্গীদের আস্তায় অভিযানের নামে বাংলাদেশের যুবক শ্রেণীকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এরা যে জঙ্গী তার কোন প্রমাণ কারো কাছে নেই। শুধু পুলিশের মুখপাত্র যা বলেন, তা-ই সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয়। এর বাইরে বিভিন্ন সূত্র বিশেষত সামাজিক গণমাধ্যমে বল হয় যে, যাদেরকে জঙ্গী হিসেবে হত্যা করা হচ্ছে এদের অধিকাংশই রাজনীতিতে  কোনকালেই জড়িত ছিল না। এরা হয়তো গ্রামের খেটে-খাওয়া মানুষের সন্তান ষারা কোন মেসে থেকে কাজ করে কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে। আবার এদের মধ্যে এমনকিছু হতভাগ্য রয়েছে, যাদেরকে চাঁদা আদায়ের জন্য পুলিশ গ্রেফতার করেছে। কিন্তু চাঁদা না পেয়ে তাদেরকে পুলিশই কোন ঘরে আটক রাখে। এমন খবরও পাওয়া গেছে যে, গাজীপুরে যে বাসায় তথাকথিত অভিযান চালানো হয়েছিল, পুলিশ সে বাসাটি নাকি দুইমাস আগেই ভাড়া করে এবং পুলিশ সে বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতো। জঙ্গী নিধনের অভিযান চলছে এবং সরকার একাজে একেবারেই তৎপর তা প্রমাণ করা এবং দেশবাসীকে ভীতির মধ্যে রাখার উদ্দেশ্যেই এসব নিরাপরাধ যুবকদের হত্যা জঙ্গী দমন বলে চােিলয়ে দেয়া হচ্ছে। 
আবার কাউকে কাউকে রাস্তাঘাট থেকে গুম করে বছরের পর পর আটকে রেখে হয়। তাদের কাছ থেকে চাঁদা চাওয়া হয়। এভাবে এসব হতভাগ্যরা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরাই এক সময়ে তথাকথিত জঙ্গী অভিযানের শিকার হয়। আর এসব হতভাগ্যদের পরিবারের সদস্যরাও বিশ্বাস করেন যে, তাদের সন্তানরা জঙ্গী সেজেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। আসল কাহিনী পরিবারের জানার বাইরে থেকে যায়। এ ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ অজুহাতে কতো মানুষের প্রাণ গেল, তার ইয়ত্তা নেই। এদের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে জঙ্গী অভিযানের মাধ্যমে, ক্রসফায়ারে, ট্রাকের নিচে চাপা দিয়ে, রেলগাড়িতে পিষে, কিংবা ব্যায়নটে কিংবা তরবারির কোপে। এদের লাশের ঠাঁই হয়েছিল সড়ক কিংবা রেল লাইনের পাশে, নদীতে-ডোবায়-ধানক্ষেতে। কাউকে কাউকে নাকি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।  
বিরোধীদলের দলের সাথে জড়িত এমন লাখ লাখ সৌভাগ্যবান নেতাকর্মীরাই কেবল কারাগারে আটক রয়েছেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় লক্ষাধিক নেতাকর্মী কারারুদ্ধ রয়েছেন। আর রাজনৈতিক মামলায় আসামী হয়ে প্রায় প্রতিদিন কোটে হাজিরা দিচ্ছেন প্রায় সাড়ে সাতলাখ নেতাকর্মী। এছাড়া গুম হওয়া কিংবা গ্রেফতার এড়ানো জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন  আরো দশ লক্ষাধিক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 
নিহতরা তো জীবন দিয়ে মুক্তিই পেয়েছেন। তাদের রুহ হয়তো শেখ হাসিনার এমন মহান কাজের জন্য দোয়া করবে। কারণ তাদেরকে আর জীবন-জ্বালা সইতে হবে না। কিন্তু কারারুদ্ধ অথবা ফেরারীদের অবস্থা কি হবে? তাদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। জীবনযুদ্ধে জয়ী  হবার যোগ্যতা অর্জন না করেই জীবনের অতীব মূল্যবান সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তাদের জীবন কীভাবে চলবে?  কারারুদ্ধ অথবা ফেরারীরা অযোগ্য হিসেবে তাদের জীবনযুদ্ধে কেমন বেপরোয়া অপরাধী হিসেবে সমাজে প্রবেশ করবেন, তা কর্তৃপক্ষ ভাবছেন বলে মনে হয় না। তারা  দেশ ও দেশবাসীর জন্য মারাত্মক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। পুরা দেশে অপরাধ প্রবণতা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেলে বিস্ময়ের কিছুই থাকবে না। লাখ লাখ পরিবারের লালিত স্বপ্ন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য ধুলিস্মাৎ হয়ে যাচ্ছে। 
দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য গুম কিংবা খুন হওয়া এবং কারারুদ্ধ ও মামলার আসামী কিংবা স্বেচ্ছায় পালিয়ে বেড়ানো সবাইকে মিলে ২০ লক্ষাধিক যুবকের ২০ লাখ পরিবারের কমপক্ষে এককোটি সদস্যদের অধিকাংশই পথে বসে যাবে। অন্যদিকে এই ২০ লাখ যুবকদের বিপরীতে ২০ লাখ যুবতীকে জীবনসঙ্গী পেতে সমস্যা পড়তে হবে। কারণ অর্ধশিক্ষিত এবং অযোগ্য ২০ লাখ যুবককে কোন শিক্ষিত মেয়েই স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবে না। এ ২০ লাখ যুবক তাদের প্রত্যাশিত  মেয়েকে বিয়ে করার সুযোগ পাবেন না। অন্যদিকে বিবাহযোগ্যা ২০ লাখ যুবতীর বিবাহ-সংকট সৃষ্টি হবে, কারণ তারাও তাদের যোগ্য ছেলে পাবে না। এর ফলে সমাজে যে অচিন্তনীয় বিপর্যয় নেমে আসবে তা শাসকশ্রেণী ভাবছে বলে মনে হয় না। 
জঙ্গী নিধনের খেসারত দিতে গিয়ে অর্থনীতি, বিশেষত গার্মেন্টস শিল্প কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে আলামত ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। তৈরি পোশাকের ক্রেতা  ভারতে চলে যাচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। বিনিয়োগ বলতে আমি কোনভাবেই ভারতীয় বিনিয়োগকে বুঝাই না। ভারতীদের বিনিয়োগ হচ্ছে বাংলাদেশকে জিম্মি করার, চূড়ান্ত পর্যায়ে দখল করার হাতিয়ার। ভারতীয়রা বিনিয়োগ করে, কারণ তারা মনে করে  বাংলাদেশে তাদেরই হয়ে যাবে। আর জঙ্গীরাও তাদেরই তৈরি। তাদের চর-জঙ্গীদের মারা হয় না, দেশপ্রেমিদেরকে মেরে জঙ্গী বলা হয়। এদেশ তাদের কব্জায় পুরাপুরি না যাওয়া পর্যন্ত এভাবে মুসলিম নিধন অব্যাহত থাকবে। দেশে অনিশ্চিয়তা অস্থিরতা বিরাজ করবে। ভারতের কিছু পুতুল দরকার Ñ যাদের কোন দেশপ্রেম নেই, ধর্মীয় অনুভূতি নেই, যারা তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য শঙ্কিতও নয়। তাদের কাছে ক্ষমতা এবং অর্থই মুখ্য।  তাদের দৃষ্টিতে এ ক্ষমতার পথের কাঁটারাই হলো দেশপ্রেমিক শক্তি Ñ যারা তাদের ভাষায় জঙ্গী। দেশপ্রেমিকদের বাঁচার অধিকার নেই।  তাই তাদেরকে জঙ্গী সাজিয়ে হত্যা করতে হবে। 
ক্ষমতাসীনরা তো মহাখুশী যে, তারা সাফল্যের সাথে জঙ্গীদমনের নামে তাদের পথের কাঁটা  দেশপ্রেমিক শক্তিকে সরিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে শেখ হাসিনা নিজের এবং তার ছেলের পথের কাঁটা সরাচ্ছেন না, বরং দেশের শরীরের শিরা-উপশিরায় তিনি কাঁটা ঢুকাচ্ছেন । তিনি কিংবা তার সন্তান কেউই পৃথিবীতে স্থায়ী নন, রাষ্ট্র বা দেশ একটা স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতকে তিনি ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছেন। এ ক্ষত কখনোই নিরাময় হবার মতো নয়। একটা জাতিকে শতধাবিভক্ত করে অকেজো করে তিনি যে স্বপ্ন দেখছেন তা মারাত্মক বিপদজনক। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে কেবল মানুষ হত্যা করে কোন শাসকই ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে পারে নি, তাদেরকে কেউই সম্মানের চোখে দেখে নি। ভেঙ্গে যাওয়া সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি এক পর্যায়ে (১৯৭০ সনের হিসেব মতে) সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৭%। দেশের মোট জনসংখ্যার সাত শতাংশ সদস্য/সমর্থকদেরকে  দিয়ে বাকি ৯৩% মানুষের উপর দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়েছিল সোভিয়েত কমিউনিস্টরা। কমিউনিজম ও কমিউনিষ্টরা ঝাড়–পেটা খেয়ে বিশ্ব থেকে বিদায়  নিলেও শেখ হাসিনার পাশে শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানোর ঘোষণা দানকারী জনৈকা  পতিত ভূয়া কমিউনিস্ট বসে আছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনিই শেখ হাসিনাকে গণতন্ত্রের আবরণে একদলীয় ধাঁচের শাসন চালানোর জন্য প্ররোচিত করছেন। আর শেখ হাসিনাও তার পরামর্শ অনুসরণ করে দেশের সিংহভাগ মানুষকে ভীতির মুখে রেখে আমাদের অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও হুমকির মধ্যে পড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে স্বৈরাচারীদের দুঃশাসনের কারণে কমিউনিজম, এমনকি সোভিয়ত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার সময় কোন মানুষই কমিউনিজিম কিংবা সোভিয়ত ইউনিয়নকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে নি। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন যেকোন শাসন ব্যবস্থার পরিণতি এমনই হয়  হয়। শেখ হাসিনারা এ বাস্তবতা অনুধাবন করে শক্তিকেন্দ্রিক শাসন পরিহার করে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা ও অধিকার সুনিশ্চিত করলে আমাদের সব কুলই  রক্ষা পাবে। তারাও বাঁচবেন, আমাদের দেশও বাঁচবে। দেশে হানাহানি কারোর জন্যই মঙ্গলজনক নয়। এমন বাস্তবতাকে স্বীকার করার সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।#
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক
Email: এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।
 
Adil Travel Winter Sale 2ndPage

বাংলাদেশ : সকল সংবাদ

আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...