প্রচ্ছদবাংলাদেশ

কানাডীয় আদালত আওয়ামী লীগ-বিএনপি’কে একই পাল্লায় মেপেছে

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন:যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র একটি গ্রুপ ২৪ ফেব্রুয়ারী নিউইয়র্কে সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেছে যে, মোহাম্মদ জুয়েল হোসেন গাজী নামক জনৈক বাংলাদেশী dddddiiiiকানাডায় শরণার্থী হিসেবে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন নাকচ করার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য-সম্বলিত যেসব মন্তব্য করেছে আওয়ামী লীগ সরকার তার অপব্যাখ্যা করে তাকে বিএনপি-বিরোধী প্রচারণায় ব্যবহার করছে। 
এ রায়ের পুরো কপি আমার সংগ্রহে রয়েছে। মোহাম্মদ জুয়েল হোসেন গাজী  আদৌ বিএনপি’র একেবারে প্রাথমিক স্তরের সদস্য কিনা আদালতের কাছে কেবল আবেদনপত্রে তার নিজের বয়ান ছাড়া আর কোন প্রমাণ নেই। তাছাড়া বিএনপি’র কোন পর্যায়ের নেতার বা নেতৃবৃন্দের প্যাডে কোন স্বীকৃতিপত্র আদালতে জমা দেন নি যাতে প্রমাণ হয়েছে যে, তিনি বিএনপি’র সদস্য । সুতরাং জুয়েল হোসেন গাজী বিএনপি’র সদস্য তার এমন দাবি সত্য নাও হতে পারে।
আবেদনকারীর মতে হরতালের সময় বিএনপি “যুদ্ধের মতো অস্ত্র ব্যবহার করে। তারা হাতবোমা, পিস্তল ও বড় আকারের তরবারি ব্যবহার করে। ----- মানুষকে আঘাত করার জন্য লাঠি ব্যবহার করে এবং পিস্তল থেকে গুলি ছোঁড়ে এবং হাতবোমা নিক্ষেপ করে। তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেয়।” 
আবেদনকারী যদি বিএনপি’র সদস্যই হয়ে থাকেন, তবে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি’র বিরুদ্ধে এ ধরনের অতিরঞ্জিত অভিযোগ করার কথা নয়। এতে প্রমাণিত হয় তিনি আদৌ বিএনপি’র সদস্য নন। 
অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি হলো বিএনপি’র ডাকা হরতাল মানেই হলো বিএনপি’র নেতাকর্মীদের কারাগারে অথবা পালিয়ে থাকা কিংবা কোথাও আত্মগোপন করা, একেবারে সাহসী হলে ঘরে বসে টিভি দেখা, আরাম করা কিংবা ঘুমিয়ে থাকা। রাস্তা পুলিশ কিংবা পুলিশের পোশাকপরা কিছু অজানা মানুষ এবং ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের দখলে থাকে, সেখানে বিএনপি’র ছায়াও থাকে না। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ভীরুতা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতারা মোটেই কার্পণ্য করেন না। প্রতিটি হরতালের পরে বেশ ক’দিন এ ধরনের প্রচারণা চলে যে, হরতালের দিন বিএনপি’কে রাস্তায় খুঁজে পাওয়া যায় নি, কিংবা বিএনপি আন্দোলন করার মতো দল নয়। যারা রাস্তায় আসতেই পারে না কিংবা যাদেরকে রাস্তায় দেখা যায় না তারা “যুদ্ধের মতো অস্ত্র ব্যবহার করে” কীভাবে?  আর কানাডীয় আদালতে বিএনপি’র এ কথিত সদস্য তেমন আজগুবী তথ্যই পরিবেশন করেছেন। 
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সম্পর্কে যে ধরনের প্রচারণা চালায়,  আবেদনকারী আদালতকে মূলতঃ সেগুলোই শুনিয়েছে। রায়ে তার যে বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে তা পড়লে মনে হয় আবেদনকারী আওয়ামী লীগের মুখপাত্রের কার্বনকপি। আবেদনকারীকে কে বা কারা শরণার্থী সাজিয়েছে, কারা তাকে মালয়েশিয়া ও জাপানে যাবার এবং আবার কানাডায় আসার পয়সা যুগিয়েছে, কারা তাকে বিএনপি সদস্য সাজিয়ে বিএনপি’র বিরুদ্ধে কথা বলতে প্ররোচিত করেছে সেগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার।  
আবেদনকারী পিস্তল, বোমা, তরবারিসহ যেসব অস্ত্রের নাম উল্লেখ করেছেন সেগুলো তো আওয়ামী ক্যাডার হাতে দেশবাসী প্রতিনিয়তই দেখে থাকেন। এগুলো তারা তাদের আধিপত্য বিস্তারে দলীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে  হর-হামেশা ব্যবহার করেন। তারাই বাইরের মানুষ তো বটেই তাদের দলের লোকদেরকেও এসব অস্ত্র দিয়ে খুন করেন। এসব ব্যবহার করেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়–য়া মেয়েদের আহত-নিহত কিংবা অপহরণ করেন। এসব তথ্য না দিয়ে জুয়েল হোসেন কেন বিএনপি’র নাম উল্লেখ করলেন তা রহস্যময় নয় কী?
অন্যদিকে বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হাতবোমা কিংবা পেট্টল বোমা কারা নিক্ষেপ করে তা বের করার জন্য বার বার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছিলেন। কিন্তু সরকার অজ্ঞাত কারণে তদন্তের পথে হাঁটেনি, কেবল বিএনপিকেই দায়ী করেছে আর জঙ্গী বলে প্রচারণা চালিয়েছে যা এখনো অব্যাহত আছে। পুলিশ ও সরকারী ক্যাডারদের উপস্থিতিতেই বোমা হামলাকারীরা বোমা মেরে নির্বিঘেœ চলে যায়। পুলিশ বা দলীয় ক্যাডাররা তাকে ধরার কোন উদ্যোগই নেয় না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঐ হামলার দায় বিএনপি-জামায়াতের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। পালিয়ে থাকা কিংবা ঘরে থাকা বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীদের কোন প্রমাণ ছাড়াই আসামী করা হয়, ধরা হয়, রিমা-ে নেয়া হয়। কোন তদন্ত ছাড়াই বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের কিংবা গ্রেফতার, রিমা-ে নির্যাতন ও কারারুদ্ধ করায় বেগম জিয়া পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, সরকারই এ ধরনের হামলা চালিয়ে বিএনপি তথা বিরোধীদল’কে উচ্ছেদ করার অজুহাত সৃষ্টি করছে। 
এ রায়কে কেন্দ্র করে সরকার ও সরকারী দল বিএনপি-বিরোধী যে প্রচারণা চালাচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয়। ৩২ পৃষ্ঠার এ রায়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয়ের কথাই বলা হয়েছে ।  কানাডার আইনে  যেসব কর্মকা-কে সহিংস বা সন্ত্রাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো আওয়ামী লীগও যে করেছে রায়ে তারও উল্লেখ রয়েছে। ১৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে: ‘উভয় দলই একই ধরনের সহিংস কৌশলের আশ্রয় নেয়। এ ধরনের একটি কৌশল হলো সাধারণ ধর্মঘট। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য  সাধারণ ধর্মঘটের  অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করা’। 
২০১৫ সনের ২ ফেব্রুয়ারীর ‘দ্য’ ইকনোমিস্ট’এর একটি প্রতিবেদনের একটি অংশও এ রায়ে স্থান পায় যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে: “বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে তার গুলশান অফিসে আটকে রাখা হয়েছে”। (পৃষ্ঠা ১৭)
রায়ে বাংলাদেশ-আমেরিকার সম্পর্কের পটভূমির উপর কংগ্রেসের একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনের কিছু অংশ তুলে ধরা হয় যেখানে বলা হয়েছে: আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে তখন ক্ষমতাসীন দলকে  ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সংসদ বর্জন, বিক্ষোভ ধর্মঘটের প্রচেষ্টা চালায়। (পৃষ্ঠা ১৮)
ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এবং সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক’এর প্রতিবেদন উদ্ধৃতিও এ  রায়ে স্থান পায় যেখানে বলা হয়েছে: “বিরোধী দলে থাকলে উভয় দলই বিক্ষোভ, শ্রমিক আন্দোলন (ধর্মঘট), যানবাহন অবরোধের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় যেতে চায়।” (পৃষ্ঠা ১৮) 
একই প্রতিবেদনের অন্যত্র মন্তব্য করা হয়েছে: বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তাদের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদার জিয়া মধ্যে তিক্ত লড়াই হিসেবে চিহ্নিত । উভয় দলই সংসদ বর্জন, বিক্ষোভ, হরতাল, ধর্মঘট করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সর্বশক্তি ব্যবহার করে। (পৃষ্ঠা ১৯)
‘ইমিগ্রেশন এ- রিফিউজি বোর্ড’এর একটি প্রতিবেদনের অংশ বিশেষও রায়ে উল্লেখ করা হয় যেখানে বলা হয়েছে: ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদল উভয়ে সহিংসতা ও ভীতির আশ্রয় নিয়ে হরতাল সফল ও প-/ব্যর্থ করে থাকে। (পৃষ্ঠা ২০)
একই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে: ১৯৯৭ সনের ৩১ আগস্ট আওয়ামী লীগ দলীয় ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ সড়কে মিছিল করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। (পৃষ্ঠা ২০) । রায়ে বিএনপি-নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেফতার এবং কারারুদ্ধ করার কথাও উল্লেখ আছে। উল্লেখ আছে ২০১৪ সনের নির্বাচন এবং তা বর্জন এবং অবরোধও রায়ে স্থান পেয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ আমলে গুম করা, উধাও করে ফেলা, কথায় কথায় রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, ক্রসফায়ারে কিংবা  পুলিশ হেফাজতে হত্যা,  প্রকাশ্য কিংবা গুপ্ত হত্যা সম্পর্কে কোন তথ্য রায়ে স্থান পায় নি। এসব বিষয়গুলো রায়ে স্থান না পাওয়ায় মনে হয় আদালত অজান্তে আওয়ামী লীগের প্রতি অনিচ্ছাকৃত আনুকল্য দেখিয়েছে।
আংশিক হলেও রায়ে আওয়ামী লীগকে পুরাপুরি ছাড় দেয় নি। রায়ের ভাষ্যে আওয়ামী লীগ যা Ñ বিএনপিও তা। অনেকটা মুদ্রার এপিট আর ওপিটের মতো। সুতরাং রায়কে বিএনপি-বিরোধী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা অনৈতিকতার শামিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে যেসব বাংলাদেশী রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা শরণার্থী হিসেবে নাগরিক মর্যাদার জন্য আবেদন করেছেন তাদের শতভাগই নিজেদেরকে বিএনপি’র নেতাকর্মী হিসেবে দাবি করেছেন এবং তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে উল্লেখ তারা যে সন্ত্রাসের শিকার তা প্রমান করেই আবেদন করেছেন। বাংলাদেশে অবস্থান করা বিপদজনক এমন দাবির সপক্ষে তারা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করেই রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। 
তাই চালনি সুইকে তার একটি ছিদ্রের বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। কারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে উগ্রতা ও সন্ত্রাসের জনক-জননী কানাডার আদালত তা না জানলেও, বাংলাদেশের মানুষ তা জানেন। তথাপি আদালতের ঐ সার্টিফিকেট আওয়ামী লীগকেও রেহাই দেয় নি। রায়ের কোথাও বিএনপিকে এককভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন বলা হয় নি। আদালত বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে একই পাল্লায় মেপেছে, কোন হেরফের করেনি। সুতরাং কানাডার আদালতের সার্টিফিকেট বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কোন সুযোগ নেই।
আদালত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর নানা সূত্র হতে তথ্য সংগ্রহ করেছে, যদিও তা আংশিক ও অপূর্ণাঙ্গ, তথাপি তা কেবল আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র জন্যই নয়,  আমাদের সবার জন্যই লজ্জার ব্যাপার। এ রায় আমাদের চোখের উপর আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে জাতি হিসেবে আমরা কোথায় নেমে গেছি। এ রায়ের ভাষা এবং মাহাত্য অনুধাবন করলে এ রায়কে কোন দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে আমরা কেউই আমাদের কুৎসিত দিকগুলো ঢাকতে পারবো না । বিদেশীরা আমাদেরকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন, তা আমাদের অনুধাবন  করে সে মোতাবেক আমাদেরকে সুধরে নেয়ার এ রায় একটা শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে।* 
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Email: এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।

 
Adil Travel Winter Sale 2ndPage

বাংলাদেশ : সকল সংবাদ

আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...