প্রচ্ছদবাংলাদেশ

কারাভোগ চেতনাকে আরো তেজোদীপ্ত করেছে, রিজভী

 ৪২ মাস কারাভোগ আমার চেতনাকে আরো তেজোদীপ্ত করেছে, এমন দাবি করেছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুদ  যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট প্রবাসী যুবক রিজভী আহমেদ। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তির দুর্নীতি সংক্রান্ত তথ্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে আমেরিকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই’এর সাবেক এজেন্ট/প্রতিনিধিকে সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করার অভিযোগে রিজভী আহমেদের ৪২ মাস কারাদ- হয়েছিল।
কিন্তু তিনি কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন কিংবা আদৌ কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন কিনা, তা আদালতে স্বীকার-অস্বীকার কিছুই করেন নি। তবে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি আমেরিকার আইন ভঙ্গ করেছেন  ।
২০১৩ সালে ৩০ আগস্ট তাকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। তিনি জামিনে ছাড়া পেলেও ২০১৫ সালে জানুয়ারী মাসে তাকে ৪২ মাস শাস্তির রায় দেয়া হয় । রায়ের পর তাকে ৪৫ দিন মুক্ত থেকে নিউজার্সির ফোর্ট ডিক্স ফেডারেল কারাগারে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেয়া হয়। তদানুযায়ী ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল ফোর্ট ডিক্স কারাগারে প্রবেশ করেন।  কারাদ-ের মেয়াদ শেষে চলতি বছর ১৫ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন।
উল্লেখ্য ফোর্ট ডিক্স মূলত আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনানিবাস বা দূর্গ। এ সেনানিবাসের অভ্যন্তরেই কারাগার। স্বাভাবিকভাবেই কারাগারটি অতীব সুরক্ষিত এবং সেনাবাহিনীর সার্বক্ষণিক নরজদারিতে থাকে । এখানে কেবল সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদেরকে রাখা হয়।
রিজভী জানান এ কারাগারে সাড়ে পাঁচ হাজার বন্দী রয়েছেন। নানা পেশার বন্দীদের মধ্যে খুনী, মাদক চোরচালানী, দাগী অপরাধী, নারী ও মানব পাচারকারী, শিশু-নির্যাতনকারী তথা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত বিলিনিয়র থেকে শুরু করে গৃহহীনরাও রয়েছেন।
তিনি বলেন, এ কারাগারের ১৪টি ভবন রয়েছে। সবগুলোতে সাড়ে পাঁচ হাজার বন্দী রাখা হয়। তাকে ত্রিতল ভবনের তৃতীয় তলায় রাখা হয়। এ ভবনে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে ৩৫০জন বন্দী থাকেন। এদের জন্য ছয়টি শোচাগার এবং আটটি গোসলখানা রয়েছে। সুতরাং প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়া, কিংবা গোসল করা ঘুমানোর সমস্যা কেমন ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিটি কক্ষ আনুমানিক ১৫ ফুট চওড়া এবং ২০ ফুট লম্বা। প্রতিটি কক্ষে ১২ জন বন্দী থাকেন।
সশ্রম কারাদ-ে দ-িত হয়ে কারাগারে কী ধরনের কাজ করতে হয়েছে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, এখানে প্রত্যেক বন্দীকেই কোন না কোন ধরনের কাজ করতে হয়। “আমি তৃতীয় তলার ঁিসড়ি ঝাড়– দিতাম এবং মুছতাম (মপ্)।”
আমেরিকার কারাজীবন সম্পর্কে রিজভী বলেন, এটা খুবই কঠিন ও কষ্টের। অতি সামান্য খাবার দেয়া হয়, যা অতীব নি¤œমানের। প্রয়োজনের তুলনায় খাবার এতোই অপ্রতুল ছিল যে, কারাগারে যাবার আগে আমার ওজন ছিল ২১০ পাউ- । কারাগারে আমার ওজন ৬০ পাউন্ড কমে যায়। কারাগার থেকে বের হবার দিন আমার ওজন ছিল ১৫৫ পাউন্ড ।
কি ধরনের খাবার দেয়া হয় জানতে চাইতে তিনি বলেন, প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন খাবার দেয়া হয়। সব খাবারই ‘আমেরিকা-স্টাইলের’। সামান্য দুধ, সিরিয়াল, কিছু ফল, ব্রেড, ভাত, রুটি, বার্গার, স্যান্ডউইছ, মাছ, চিকেন. গরু ও ভেড়ার গোশতসহ সব ধরনের খাবার দেয়া হয়। তবে খাবারের মান এতো নি¤œমানের এবং পরিমাণ সামান্য যা প্রয়োজনের তুলনায় একান্তভাবেই নগণ্য। তিনি তার পরিবার থেকে দেয়া টাকা দিয়ে কারাগারের ভিতরে বিদ্যমান দোকান থেকে কিছু খাবার কিনতেন। তথাপি তার ওজন কমে যায়। তার পরিবারের সদস্যরা প্রতি সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে তার সাথে দেখা করতেন । ঘর থেকে কোন ধরনের খাবার কারাগারের দর্শনার্থীদের কক্ষেও আনা যায় না।
তিনি জানান. মারাত্মক অসুখ হলে অসুস্থ রোগীকে কারাগারের বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । তবে সাধারণ অসুখের জন্য কারাগরের ভিতরেই চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
কারাগারের পরিবেশ সম্পর্কে রিজভী বলেন, এটা খুবই ভয়ঙ্কর। ছোট একটি কক্ষে ১২জন থাকায় ঘুমাতে বেশ কষ্ট হতে। কেউ তাস খেলে, গান গায়, তর্কাতর্কি করে। এমন পরিবেশে ঘুমানো যায় না। মাদকদ্রব্য সেবন, জুয়াখেলা, চুরি, জোরপূর্বক আত্মস্বাৎ, ব্যক্তি জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি অবৈধ কাজ অতি সাধারণ ব্যাপার।
তিনি বলেন, তাই প্রতিদিনই হট্টগোল, ঝগড়া-বিবাদ থেকে মারামারি হয়। তিনি বলেন, তিনি কারাগারে থাকাকালীন হিংসাত্মক আক্রমণে ১০জনকে আহত এবং দুইজনকে নিহত হতে দেখেছেন। 
কি দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয় জানতে চাইলে রিজভী বলেন, টুথব্রাশের মাথা ভেঙ্গে সেটা চোখা করা হয় এবং তা দিয়েই হামলা চালানো হয়। এজন্য আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে সাবধানে থাকতাম।  কারো সাথে তেমন মেলামেশা কিংবা গল্প করতাম না। কেবলমাত্র হেজ্পয়েন্টের ম্যানেজার জনৈক বিলিনিয়রের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে এবং তার সাথে কথাবার্তা হতো।
রিজভী জানান কারাগারেও বর্ণগত সাদাকালো, জাতিগত, ধর্মীয়  রেষারেষি বিদ্বেষ-বিবাদ বৈষম্য রয়েছে। খাবারের টেবিলে বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণগত বিদ্বেষ বেশি করে প্রকাশ পায়। অধিকাংশ বন্দীই তাদের নিজ নিজ বর্ণ, ধর্ম কিংবা জাতির অন্তর্ভূক্ত বন্দীদের জন্য অঘোষিতভাবে টেবিলকে সংরক্ষিত করে রাখেন। এগুলো অন্যকেউ ব্যবহার করলে বিবাদ শুরু হয়।
কারাগারের কিছু সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,  ব্যায়াম করা, টিভি দেখা এবং বই পড়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও সুযোগ রয়েছে। সকাল সকাল ৯টা থেকে ৩টা ৫০ মিনিট এবং বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিক্ষাভবনের অবস্থিত গ্রন্থাগারে বই পড়া কিংবা লেখালেখি করা যায়। লেখালেখির জন্য কোন কম্পিউটার দেয়া হয় না। অন্যদিকে সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এবং ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করা যায়। এছাড়া ভলিবল বাস্কেট বল খেলারও ব্যবস্থা রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কারাগারের ভিতরে ঘোরাফিরা করা যায় না।
কারাগারে কোন বিষয়টি খুবই কষ্টের ছিল জানতে চাইলে এখনো অবিবাহিত এ যুবক জানান, অন্যসব সমস্যার চেয়ে পিতামাতা, ভাই-বোনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাই ছিল সর্বাধিক কষ্টের।
সংশ্লিষ্ট  সূত্র জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে রিজভীকে কারাগারে না গিয়ে মাত্র এক বছর প্রবেশনে (সংশোধনে) থাকার বিনিময়ে তার কাছ থেকে স্বীকোরক্তি আদায়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। এ প্রস্তাবে আমেরিকার কোন কোন বিভাগ  ও সংস্থা থেকে  কোন কোন ধরনের গোপনীয় নথিপত্র (ডকুমেন্ট) সংগ্রহ করেছেন, কোন কোন ব্যক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন এবং কাকে কাকে এসব তথ্য দিয়েছেন তাদের নাম-ঠিকানা লিখিতভাবে দিতে বলা হয়। রিজভী এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই অন্যকোন অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় আমেরিকার তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা আমেরিকার আইনে অপরাধের শামিল হওয়ায় তাকে ৪২ মাসের শাস্তি দেয়া হয়।  তবে রিজভী জানান কিছু লোককে টাকা দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু এ অর্থ তিনি নিজের জমানোর টাকা থেকেই দিয়েছে। অন্য কারো একাউন্ট থেকে সে টাকা দেয়া হয় বাদীপক্ষের এমন অভিযোগ আদালতে তা প্রমাণ করা যায় নি । এমনকি আমি কোন্ সূত্র থেকে টাকা নিয়েছি বাদীপক্ষ সে অভিযোগও প্রমাণ করতে পারে নি।
রিজভী আদালতকে বলেন, আমি টাকার বিনিময়ে এ কাজে হাত দেই নি। আমি কোন অপরাধ করেন নি। দেশপ্রেম থেকে আমি এ কাজে নেমেছি। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, যেখানে আমার দাদা-দাদি, নানা-নানী, আত্মীয়-স্বজনের কবর রয়েছে। আমি আমার দেশের জন্য, আমাদের জনগণের জন্য কিছু দুর্নীনিবাজের মুখোশ খোলার চেষ্টা করেছি।
রিজভী জানান, রায় প্রকাশ করার পর বিচারক ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাকে বলেন, তোমার উদ্দেশ্য ভালো। তুমি তোমার দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চেয়েছিলে। কিন্তু তোমার পদক্ষেপ আমেরিকার আইন লঙ্ঘন করায় তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
সূত্র মতে রিজভী আহমেদ অনেক স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এসব প্রমাণপত্র তার কাছে থাকার কথা। এসব তথ্য ও কাগজপত্রে যাদের নাম উল্লেখ আছে, তিনি তাদের সবাইকে জানেন ও চিনেন।
রিজভী জানান যে চেতনা নিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেমেছেন কারাদ-ের পর তা আরো বেগবান হয়েছে। এ চেতনাবোধ সব সময়ই থাকবে। দেশের জন্য যেকোন ধরনের ত্যাগ-তিতীক্ষায় আমি অগ্রণী অবস্থানে থাকবো।
রাজনীতিতে জড়ানোর ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে রিজভী বলেন, দেশের জন্য সৎ মানুষদের এগিয়ে আসা দরকার । জনগণের সেবা করার জন্য আমি সব সময় প্রস্তুত রয়েছেন।
রিজভী আহমদের অনুকূলে আইনী লড়াই করার জন্য তার পরিবার নিজস্ব এর্টনী নিয়োগ করে। তাকে মোট ৯০ হাজারের মতো দিতে হয়। এর্টনী বাদীপক্ষের অধিকাংশ অভিযোগই অসত্য হিসেবে প্রতিপন্ন করেন। কিন্তু রিজভী যুক্তরাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করেছেন, এ বাস্তবতাকে নাকচ করার কোন সুযোগই এর্টনীর থাকার কথা নয়। এ কারণে তার ন্যুনতম সাজা হয়।
রিজভী আহমেদের ৪২ মাস কারাদ- হওয়া তার পিতামাতা এবং পরিবারের সদস্যবর্গ চরম মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির সংকটের মুখে পড়েন। এতদসত্বেও তার পিতামাতা খুশী যে, তাদের সন্তান সৎ উদ্ঘাটনে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। উল্লেখ্য রিজভী আহমেদ প্রবাসী বিএনপি নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনের বড় ছেলে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রিজভী আহমেদের কাছে এমন কী ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য রয়েছে যে কারণে আমেরিকান সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং বাংলাদেশ সরকারও সে মামলায় আইনজীবী নিয়োগ করে তাকে আরো দীর্ঘমেয়াদী কারাদ-ে দন্ডিত করার জোর চেষ্টা চালানো হয়। সেসব তথ্য জানা গেলে অনেক কৌতুহলের অবসান হবে।*

Adil Travel Winter Sale 2ndPage

বাংলাদেশ : সকল সংবাদ

আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...