প্রচ্ছদবাংলাদেশ

কোন অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পাবেন শেখ হাসিনা

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: মায়ারমার লাগোয়া বাংলাদেশের পানিসীমায় জাহাজ মোতায়েনের ছবি দেখে আর্জেন্টিনার সামরিক একনায়ক গ্যালতিয়ারি (লিওপল্ডো ফরটুনটো গ্যালতিয়ারি ক্যাটিলি /খবড়ঢ়ড়ষফড় ঋড়ৎঃঁহধঃড় এধষঃরবৎর ঈধংঃবষষর)’র কা- মনে পড়ে। বিদেশে প্রভুর সহায়তায় ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল  পর্যন্ত আর্জেন্টিনা সামরিক জান্তার শাসনে পিষ্ঠ হয় । এ সময় সামরিক শাসকরা ট্রেড ইউনিয়ন স্থগিত করে, রাজনৈতিক দল ও প্রাদেশিক সরকার বাতিল করে। নয়হাজার থেকে ৩০ হাজারের মতো প্রতিবাদী মানুষ দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। Hasina 22bজনগণকে ভয় পাইয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে বিরুদ্ধবাদীদেরকে জনসমাগমস্থলে প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। 
তথাপি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন থেমে থাকে নি। গ্যালতিয়ারির পতন একেবারেই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের হৃদয়ের নরম অনুভূতিকে নাড়া দিতে  সামরিক জান্তা গ্যালতিয়ারি বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে ১৯৮২ সনের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনার মূল ভূখন্ড হতে ২৯০ মাইল (৪৬০কি.মি.) দূরবর্তী দক্ষিণ আটলান্ট্রিক মহাসাগরে  অবস্থিত ব্রিটিশ-শাসিত  ফক্ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ হঠাৎ আক্রমণ করে দখল করেন। এ দ্বীপের প্রতি আর্জেন্টিনার জনগণের রয়েছে গভীর ভালোবাসা।  এ দ্বীপকে তারা তাদের দেশের অংশ বলে মনে করেন। জনতার দুষমণ গ্যালতিয়ারি  রাতারাতি জাতীয় বীরে পরিণত হন। লাখ লাখ মানুষ গ্যালতিয়ারির সব অপকর্ম ভুলে তার ফক্ল্যা- দখল সমর্থন করে রাস্তায় নেমে আসেন। অবশ্য ব্রিটিশ বাহিনীর পাল্টা হামলা চালিয়ে ফকল্যান্ড পুর্নদখল করেন। ফক্ল্যান্ড আজো ব্রিটিশদের দখলে। ফক্ল্যান্ড আর কোনদিন আর্জেন্টিনার দখলে আসবে কিনা তা কারো জানা নেই।  স্বৈরশাসকরা নিজেদের দুঃশাসন দীর্ঘায়িত করার জন্য একেক সময় একেক ধরনের ভেল্কি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করেন। গ্যালতিয়ারি  তা-ই করেছেন।
 
স্বৈরশাসক গলতিয়ারি রাতারাতি হয়ে যান জাতীয় বীর:  আর্জেন্টিনার রাজপথে গ্যালতিয়ারি পক্ষে জনতার মিছিল (১০ এপ্রিল, ১৯৮২)
মায়ানমার সরকারের রোহিঙ্গাবিরোধী গণহত্যা ও পাশবিক নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানবতাবাদী জনগণ রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ গণহত্যা শুরু হবার পর থেকেই আরাকান (রাখাইন প্রদেশ) হতে অসহায় রোহিঙ্গারা জীবন রক্ষার জন্য বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ পায় নি। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আমেরিকাসহ সারা বিশ্ব রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েও শেখ হাসিনার মন গলাতে পারে নি। কারণ রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দেয়ার প্রশ্নে রোহিঙ্গা-বিরোধী গণহত্যার অন্যতম রূপকার ভারতের সায় ছিল না । মূলত  এ কারণেই শেখ হাসিনা সরকার সে আহ্বানে সাড়া দেয় নি। ফলে অসংখ্য রোহিঙ্গা তাদের স্বদেশে নিহত হন অথবা সমুদ্রে ডুবে মারা যান। শেখ হাসিনা সব সময়ে বলেছেন মায়ানমারের সমস্যার সাথে বাংলাদেশ জড়াবে না। এমনকি রোহিঙ্গাদের সমর্থনে বাংলাদেশে মানবন্ধনে দলীয় ক্যাডারে ভর্তি পুলিশ দিয়ে বেদড়ক লাঠিপেটা করতেও  শেখ হাসিনা দ্বিধা করেন নি। এটা ছিল শেখ হাসিনার নির্মম নিরপেক্ষতার বহির্প্রকাশ। 
কিন্তু হঠাৎ তিনি বোল পাল্টলেন। তিনি মায়ানমানের পানি সীমানার কাছে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করলেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা প্রশ্নে তার এ ডিগবাজি তলানীতে  থাকা তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের চাল । কারণ দেশের জনগণ রোহিঙ্গাদের  প্রতি সহানুভূতিশীল। ভারতীয় মুরুব্বিদের সংকেতেই জণগনকে কাছে টানতে শেখ হাসিনার ডিগবাজি। মানবতা কিংবা রোহিঙ্গা-প্রেম নয় । শেখ হাসিনা এবং তার মুরুব্বিরা মনে করেন জঙ্গী দমনের নামে বাংলাদেশে যে চলমান নীরব হত্যাযজ্ঞ চলছে রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়ালে তা জনগণ যাবেন, শেখ হাসিনাকে বুকে টেনে নিবেন। 
কিন্তু মানুষ কোনভাবেই গোল্ডফিস নয় যে তারা তাদের অতীতে দেখা কিংবা শোনা সবকিছু একেবারেই ভুলে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে গোল্ডফিস কোন কিছু তিন সেকেন্ডের বেশি স্মৃতিতে রাখতে পারে না। কেউ কেউ হয়তো বাংলাদেশীদেরকে গোল্ড ফিসতুল্য মনে করেন। তাদের ধারণা হয়তো সত্যি। কারণ ফরমালিন মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ করে । অতিরিক্ত ফরমালিন মিশ্রিত ফল, মাছ, গোশ্ত, শাক-সব্জি খেয়ে বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি হয়তো হ্রাস পেয়ে গোল্ডফিসের  স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। আর ভীত-সন্ত্রস্ত হলে মানুষের স্মৃতিশক্তি এমনিতেই লোপ পায় । হয়তো এসব বিবেচনা করেই জাতীয় সংসদে একটি একটি ঐতিাহসিক (?) প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে । এ প্রস্তাবে নানা ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করে প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির যোগ্য বলে দেখানো হয়েছে। এর পাশাপাশি  ক’জন অধ্যাপক রোহিঙ্গা প্রশ্নে মানবিকতা প্রদর্শন ও শান্তির জন্য অনন্য নজির স্থাপনের জন্য শেখ হাসিনাকে নোবেল শান্তি প্রদানের প্রস্তাব করেছেন। এসব করতে পর্দার আড়ালে বাংলাদেশের কী পরিমাণ অর্থ ঢালা হচ্ছে তা কারো জানা নেই।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার মনে নোবেল প্রাপ্তির ভুয়া আশা জাগিয়েছিলেন পশ্চিম বঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু। তার প্ররোচণায় শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের লেলিয়ে দেয়া চাকমা বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের সাথে সংবিধান পরিপন্থী চুক্তি করেন। এর নাম দেয়া হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি যার আবরণে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ অবিচ্ছেদ্য এলাকা সময়ের ব্যবধানে বিচ্ছিন্ন হবার ক্ষেত্র হয়। শেখ হাসিনা সেনাবাহিনী এবং দেশপ্রেমিক শক্তির বিরোধিতা উপেক্ষা করে ভারতের ইচ্ছায় এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। অনির্বাচিত এবং হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ হত্যাকারী সন্তু লারমাকে রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। কিন্তু তথাকথিত শান্তি চুক্তি পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার শান্তিচুক্তি মূলত চিরন্তন অশান্তির বীজই বপন করেছে। 
আর রোহিঙ্গাদের প্রথম থেকেই আশ্রয় না দিয়ে হঠাৎ ২৫ আগস্ট থেকে মার-খাওয়া কিছু রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আসতে দিয়ে শেখ হাসিনা কীভাবে শান্তি স্থাপন করলেন  এবং সে অজুহাতে শেখ হাসিনাকে নোবেল পুরস্কার দিতে হবে এমন বালখিল্য চিন্তা কিভাবে মাথায় আসলো তাও অনুধাবনের বাইরেই থেকে যায়। কবে আরাকানে সত্যিকার শান্তি আসবে কবে রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে পারবেন, তা কেউ বলতে পারছেন না।  অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে নোবেল শান্তি পুস্কার প্রদানের যেসব যুক্তি এর প্রবক্তারা সামনে এনেছেন তা কোনটাই সাবেক পুরস্কার প্রাপ্তদের সমপক্তীয় নয়। 
অনেকেই মনে করেন শেখ হাসিনা বিভিন্ন কারণে এ পুরস্কার নাও পেতে পারেন । তাদের মতে ২০১৪ সনের ভোটারবিহীন নির্বাচন, গণতন্ত্রকে দলীয় তথা একটি বিশেষ দেশের প্রতি অনুগতদের মধ্যে সীমিত করে শেখ হাসিনা দলীয় তথা ব্যক্তিতান্ত্রিক শাসন চালাচ্ছেন, যা গণতন্ত্রের সংজ্ঞাকে পদদলিত ও অস্বীকার করছে। ২০০৯ সন থেকে বাংলাদেশে প্রকাশ্য ও গুপ্ত হত্যা, গুম, ক্রসফারায়ে হত্যা, পুলিশ হেফাজতে কিংবা কারাবন্দী অবস্থায় হত্যা, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গ্রেফতার, বিচার বিভাগসহ সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ ইত্যাদি বিষয়ে সোচ্চার পাশ্চাত্য আর যা-ই হোক অন্তত গোল্ডফিস নয়। তারা শেখ হাসিনার গণতন্ত্র ও মানবতাবিরোধী অপকর্মকে মোটেই বিবেচনায় আনবে না, এমনটিও ভাবা যায় না। পর্যবেক্ষকদের মতে ২০০৯ সন হতে বাংলাদেশে মানুষ ও মানুষের জীবন কীভাবে পদদলিত ও অস্বীকৃত হচ্ছে তা বিবেচনা এনে নোবেল কমিটির সংশ্লিষ্টরা শেখ হাসিনাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিবেন কোন বিবেচনায়?
তাছাড়া নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ডঃ ইউনুসকে নাজেহাল ও বিতর্কিত করতে শেখ হাসিনার খোদ নোবেল কমিটি’র সিদ্ধান্তকে অমানিত করার প্রচারণায় বিস্মিত নোবেল কমিটি শেখ হাসিনাকে একই পুরস্কার প্রদান করবে এমন প্রত্যাশা দুরাশা বিশেষ। সর্বোপরি, তাদের মতে, শেখ হাসিনার মতো জনবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে নোবেল পুরস্কারের মান-ইজ্জত ও গুরুত্বকে ধুলায় মিশিয়ে দিবেন, নোবেল পুরস্কার কমিটি তেমন কাঁচামাছ খায় না। 
কিন্তু কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, শেখ হাসিনা সরাসরি পাশ্চাত্যের সহযোগিতা ও সমর্থনেই ক্ষমতা এসেছেন এবং ক্ষমতা রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ভারতকে স্বাক্ষী-গোপাল হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে। মূলশক্তি পাশ্চাত্য। সুতরাং পাশ্চাত্য শেখ হাসিনাকে নোবেল পুরস্কার দিতে বিরোধিতা নয়, বরং সুপারিশ করবে। এ মহল মনে করেন শেখ হাসিনা কেবল ভারতের নয়, পাশ্চাত্যের এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করেছেন। যাকে যেভাবে খুশি করা যায়, শেখ হাসিনা তা-ই করেছেন এবং করবেন।  
এ মহল মনে করেন, শেখ হাসিনাকে দিয়ে পাশ্চাত্যের আরো বহু এজেন্ডা বাস্তবায়ন বাকি আছে। সেগুলো বাস্তবায়িত করার জন্য তারা শেখ হাসিনাকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দিবেন। যতি তা-ই হয়, তবে ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা আরো মারমুখি ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন, বাংলাদেশের দুর্বিসহ দিন আরো দীর্ঘায়িত হবে, আরো বহু দেশপ্রেমিক দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাবারও সম্ভাবনা থেকে যাবে। শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অন চঙ্ সুকির উদাহরণ টেনে এ মহল মনে করেন, এটা তাদেরকে দেয়া হয় যারা পাশ্চাত্যের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করেন। শেখ হাসিনা হয়তো তাদেরই একজন। তাই তাকে শান্তি পুরস্কার দিলে বিস্মিত হবার কিছুই থাকবে না।*
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক
Adil Travel Winter Sale 2ndPage

বাংলাদেশ : সকল সংবাদ

আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...