ইসরাফিলের প্রস্থান (পর্ব-১)

:: খালিদ ইবনে মারুফ ::

চতূর্দিকে কালেমা শাহদতের পুনঃপুনঃ আবৃত্তির একটি ভয়ার্ত গীত ছড়িয়ে দিতে দিতে, পরিজন শববাহকদের কাঁধে রাখা খাটিয়ায় চড়ে, ইসরাফিল ভুঁইয়া  এগিয়ে যেতে থাকে, এগিয়ে যেতে থাকে তার পূর্বপুরুষের নির্ধারিত ও ব্যবহৃত  দ্বারহীন উদোম কবরস্থানটির দিকে। আর যেতে যেতে বাতাসের শরীরে মেখে দিয়ে যায় আগরবাতি, কর্পূর ও গোলাপজলের একটি মৃত্যুময় সুঘ্রাণ, যা মুলত ইসরাফিল ভুঁইয়ার মৃত্যুর খবরটা আরও একবার জানিয়ে দিয়ে যায় রাস্তার দুপাশের বাড়ি ও ঘরের ভেতর থাকা মানুষজনদের, যদিও তারা সকালে একবার মসজিদের মাইক থেকে বাতাস ফুড়ে ছুটে আসা বাজখাই ঘোষণায় জানতে পেরেছে যে, ‘সে আর নেই’ আর এই মুহূর্তে ইসরাফিল ভুঁইয়ার মৃত্যুর খবরের চেয়ে তাদেরকে যে বিষয়টা বেশি বিচলিত করে তা হল, যখন তীব্র সূর্যালোকে গাছের সবুজ পাতায় আগুন জ্বলে যাবার উপক্রম ঠিক তখনই অর্থাৎ এমন গনগনে দুপুরে কেনইবা তার আত্মীয় স্বজন ও রেখে যাওয়া শুভনুধ্যায়ীরা তাকে কবরস্থ করতে তৎপর হয়েছে, তৎপর হয়েছেই শুধু নয় বরং খাটিয়ায় তুলে নিয়ে চলেছে মৃত্তিকার বুকে নিয়মানুগ খোঁড়া গর্তে রেখে আসবে বলে। নাসারন্ধ্রে ঢুকে পড়া গন্ধ ও কর্ণ গহ্বরে প্রবেশ করা অনবসর মৃত্যুগীত রাস্তার দুপাশের মানুষদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় ইসরাফিল ভুঁইয়াকে, আর তাতে তাদের মধ্যে যে সকল প্রতিক্রিয়া হয় সেগুলো হল, বাড়িতে অবস্থান করা পুরুষ ও মহিলারা তাদের নির্ধারিত বসতীর সীমানা ছাড়িয়ে রাস্তার ‘কোলে’ এসে ‘কল্লা’ বাড়ায় ও মহিলারা নাক ও মুখে আঁচল চেপে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করে “আহারে”!

এছাড়া তাদের মধ্য থেকে শুধুমাত্র স্ত্রীলোকেরা ছাড়া পুরুষ ও বালক-যুবাদের কেউ কেউ খাটিয়ার পিছু পিছু শবযাত্রায় অংশগ্রহণ করে, হয়তো তারা ইসরাফিল ভুঁইয়ার কবরে মুঠো মুঠো এঁটেল মাটি ছুড়ে দেবার লোভ সংবরণ করতে পারে না বলেই অন্যান্য সকলের সাথে কবরস্থানের দিকে রওয়ানা হয়। শবযাত্রাটি যখন লোকালয় ছেড়ে ফসলি মাঠের  বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু রাস্তাটি অতিক্রম করছিল তখন, দু’পাশের মাঠে কর্মরত চাষাদের অনেকেই হাতের কোদাল ও কাস্তে ছেড়ে দিয়ে দু’হাত কোমরে ঠেকিয়ে সোজা হয়ে দাড়ায়, কিম্বা যাদের হাতে ছিল লাঙল তারা তা অল্প কিছুক্ষনের জন্য ছেড়ে দিয়ে উঠে আসতে থাকে মাঠের কিনারায় প্রাচীন বটগাছটার ছায়ার দিকে, যেখানে তাদের রেখে যাওয়া হুঁকোর আগুন ততোক্ষণে নিভু নিভু করছে, এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ যারা অতি প্রত্যুষে মাঠে চলে আসার দরুন ইসরাফিল ভুঁইয়ার মৃত্যু সংবাদ হতে বঞ্ছিত হয়েছে তাদের মধ্য হতে কেউ একজন চিৎকার করে জানতে চায়, “এ কিডা মরলো রে?” এবং প্রতিউত্তরে একটি শোকাহত কণ্ঠ তাকে জানিয়ে দেয় “দুলোভাই”, “ইসরাফিল দুলোভাই” যদিও উত্তরটা ঠিক কে দেয় তা সেই মুহূর্তে সনাক্ত করা যায় না। মুলত ইসরাফিল ভুঁইয়া তাঁর বিবাহের পরপরই নিজগ্রাম ছেড়ে দিয়ে শশুরবাড়ি সুত্রে প্রাপ্ত বাজারের পশ্চিম পার্শ্বের বৃহদাকার একখণ্ড জমির উপরে গজিয়ে ওঠা আগাছার জংগল পরিস্কার করে নিজ বসতবাড়ির গোঁড়াপত্তন করে। এবং মৃত্যু পূর্ববর্তী সময়টা সে এই বাড়িতেই অতিবাহিত করে এছাড়াও সে এই বাড়িতেই তাঁর বিভিন্ন ছুটির অবসরে যাওয়া ও আসার ফাঁকে তাঁর স্ত্রীর গর্ভে চার চারটি সন্তান উৎপাদন করে, যাদের মধ্যেকার দু’জন যারা তাঁর পুত্র সন্তান ছিল তারা নিশ্চয় আছে এই শবযাত্রায়, হয়তো তারা তাদের স্বীয় পিতার খাটিয়ায় কাঁধও লাগিয়ে থাকবে। যেহেতু এই গ্রামের পাশ্ববর্তী গ্রামটিতেই ছিল তাঁর শ্বশুরালায় তাই, তাঁর বাড়ির পেছন থেকে শুরু করে যেখানে লোকালয় শেষ হয়েছে অর্থাৎ যেখান থেকে বিলের হয়েছে শুরু সেই পর্যন্ত প্রায় সকল বাড়ির প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের নিকটই সে “ইসরাফিল দুলোভাই” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং সদ্য মরে যাওয়া ইসরাফিল ভুইয়ার সাথে তারা তাদের এই সম্বন্ধ এখনো ছিন্ন করে নাই।


এছাড়া তাঁর লাশ যখন কিছুক্ষন আগে বাজারের মধ্যেকার প্রধান রাস্তাটি অতিক্রম করছিলো তখন সেখানে একদল উঠতি বয়েসিকে দেখা যায় হাস্যজ্জ্বল, তারা কি ইসরাফিল ভুঁইয়ার মৃত্যুতে সন্তুষ্ট হয়ে হাসছিল নাকি হাসছিল এমনিতেই তা বোঝা না গেলেও এটা পরিস্কার বোঝা যায় যে ইসরাফিল ভুঁইয়ার মৃত্যু তাদের হৃদয়ে কোন প্রকার শোকাচ্ছন্নতার জন্ম দেয় নাই বা দিতে পারে নাই। তবে ইসরাফিল ভুঁইয়ার নিঃসাড় শরীরের নিচের মানুষেরা তাঁর মৃত্যুতে ঠিক কি কি ধরনের সংবেদনে ভুগছে সাদা কাফনে মোড়া বিবস্ত্র ইসরাফিল ভুঁইয়া হয়তো তাঁর কিছুই জানতে পারছে না বা তাদের ভাবনা ও তৎপরতায় তাঁর আর কিছুই আসে যায় না,  সে হয়তো ভাবছিল অতজোরে বিকট খিস্তিটা না করে উঠলেই তো পারা যেত। মৃত্যু পূর্ববর্তী কয়েক মাস ব্যাপি তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও ইতোপূর্বে সাক্ষাৎ হওয়া সকল চিকিৎসকেরা সহ প্রায় সকলেই তাকে যে সাধারণ পরামর্শগুলো দিয়ে যাচ্ছিল তা হল চিৎকার করে কথা না বলা, উত্তেজনা পরিহার করা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানো। তবে চির অবাধ্য ইসরাফিল ভুঁইয়া তাদের কারো কথাই রাখতে পারে নাই বা রাখে নাই, যদিও একটি সুপ্ত আরগ্যবাসনা তাঁর আন্তরে ছিল বলেই  প্রতীয়মান হয় কেননা প্রথমদিনের প্রচণ্ড বুক ব্যাথা ও যুগপৎ মাথাব্যাথায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবার পর সে যখন কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে তখন তাঁর স্ত্রীর নিকট থেকে সিন্ধুকের চাবি নেয়, এবং সিন্ধুক খুঁজে তাঁর সামরিক জীবনে পাওয়া ‘সাস্থ্য সেবা কার্ড’টি বের করে আর সে রাজধানীতে গিয়ে এই কার্ড দেখিয়ে সমর হাসপাতাল প্রদত্ত সেরা চিকিৎসাটি গ্রহণ করবে ও সুস্থ হয়ে উঠবে বলে সকলকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু চুরি হয়ে যাওয়া জীবনে তাঁর এই সাধটিও অপূর্ণ রয়ে যায় এবং এই বাসনা ও সকল বিধিনিষেধ ভেতরে চেপে রেখে তাকে নিয়মিতই দেখা যেতে থাকে তার পরিচিত স্বল্প মেদের নাদুস নুদুস ও আদুল শরীরে, কোমরে তার শখের গামছাটা পেঁচিয়ে রাতে ও দিনে যথারীতি হেঁটে ও চিৎকার করে বেড়াতে।


তবে তার এ চিৎকার যতক্ষণ অব্যহত থাকতো ততক্ষণ অপরপক্ষ থেকে উচ্চ অথবা অনুচ্চ হাসি কিম্বা অধঃউচ্চারিত কিছু শ্লেষ ছাড়া কোন হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নাই, তবে এটা শুধু তার সারাদিনের বাজার ভ্রমণ ও কালেভদ্রে অন্যত্র অর্থাৎ ফসলের মাঠে কৃষকদের কাজের তদারকি ও মসজিদ আঙ্গিনার নিয়মিত জমায়েতের ক্ষেত্রেই শুধু সত্য। তাকে অভিযোগ করতে শোনা যায় এমনকি একথা সত্যও যে, তার পরিবারের সকল সদস্যরা যারা ‘হিশেব মতে’ তারই পোষ্য হয়েও তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য মেনে নেয় নাই, উপরন্তু কখনো কখনো তারা তাদের পিতা কিম্বা স্বামী রূপী এই  ইসরাফিল ভুঁইয়ার সাথে মারাত্মক তর্কে লিপ্ত হয়েছে ও অবাধ্য হয়েছে। তবে এও সত্য যে, ইসরাফিল ভুঁইয়া কারণে অকারণে সকলের ওপরেই চড়াও হয়েছে এবং তার এই আক্রমণে ইসরাফিল ভুঁইয়া প্রতিপক্ষের গায়ে যা ছুড়ে অথবা মাখিয়ে দিত তা হল তার গর্বিত সৈনিক জীবনে শিখে আসা নানা অশ্রাব্য ও অপসম্বন্ধ নির্দেশক শব্দ ও বাক্যাবলী, যেহেতু সে ছিল অধিকাংশের নিকট একজন ‘দুলোভাই’ এবং  স্বল্প সংখ্যক অতিব্রদ্ধের নিকট জামাতা সুলভ আর অল্প বয়েসিদের নিকট দাদা নানা অথবা ভাই, তাই হয়তবা, কিম্বা হতে পারে, তার প্রতিআক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাবার প্রধানতম কারণ। এছাড়া ইসরাফিল ভুঁইয়ার উৎকট উত্তেজনা ও বিকট চিৎকারের পশ্চাতে আমরা অন্যতম কারণ হিশেবে যা জানতে পারি তা হল, তার এই সকল শ্যলক কিম্বা ভাই ও নাতিরাই তাকে ডেকে অনাবশ্যক ও তার অপছন্দের কোন প্রসঙ্গ তুলে তাকে বাধ্য করেছে ঐরূপ আচরণে, আর এটাও ছিল একটা কারণ যা তাকে একই সাথে আক্রমণে প্রলুব্ধ ও প্রতি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতো, এছাড়াও যেটা অনুমান করা যায় যে, এই নাপাক ভূমিতে জন্ম নেওয়া ইঁচড়ে পাকাদের দল তার সকল খিস্তি খেউড়ের মধ্যে কিছুটা আনন্দ ও নতুনত্ব খুজে পেত।


যাইহোক, সেটা সম্ভবত উনিশশো বাষট্টি কিম্বা পয়ষাট্টি সালও হতে পারে, যখন ইসরাফিল ভুঁইয়া ছিল তল্লাটের সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ও মনোহর যুবক, সুদর্শন বলতে তাই অর্থাৎ যে সব নান্দনিক দেহ সৌকর্যের অধিকারী হলে আমরা একজন ব্যক্তিকে সুদর্শন বলি ইসরাফিল ভুঁইয়া ছিল তাই, কখনো কখনো তার চেয়েও  কিছুটা বেশি যেমন সে এতটাই বলশালী ছিল যে, পুরো তল্লাট বলতে আশেপাশের উনিশটি গ্রামের তাবৎ নামকরা সকল কুস্তিগিরকে সে ইতোপূর্বে নুন্যতম একবার করে হলেও শীতের শুকনো ও বর্ষার আদ্র মাটিতে ছুড়ে ফেলেছে নির্বিকার। হয়তো এ জন্যই সে ক্রিড়া হিসেবে কুস্তিতে আর মজা পায় নাই, কুস্তির বদলে সে তখন হা-ডু-ডুকেই বেছে নেয় নিজের শক্তি ও ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে। হা-ডু-ডু খেলায় সে যখন তার দীর্ঘ্য দম গলায় আটকে রেখে বিপক্ষদলের কোর্টে আসতো কেউ একজন সক্রিয় খেলোয়াড়কে নিশ্চিত এক নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করার উদ্দেশ্যে তখন দু একটি বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় সবসময়েই সে সফল হত। এ কাজে কখনো কখনো এমন হত যে, বিপক্ষের প্রায় সকলেই একযোগে তাকে আটকে রাখার জন্য ঘিরে ধরতো ও তার ওপর ঝাপিয়ে পড়তো এবং তার পরমুহূর্তে যা দেখা যেত তা ছিল এরকম যে, প্রতিপক্ষের ঝাপিয়ে পড়া খেলোয়াড়দের মধ্য হতে দু’জন ছিটকে পড়তো সীমানার বাইরে, দু’জন গড়াগড়ি দিত নিজ সীমানার মধ্যে, অবশিষ্টরা তার ঘাড়ে চড়ে উরুতে লেপ্টে ও গোড়ালিতে ঝুলে থেকে ইসরাফিল ভুঁইয়ার সাথে নিজ সীমানা চাড়িয়ে বেরিয়ে আসতো ইসরাফিল ভুঁইয়ার সীমানায়, তারপর অনেকক্ষণ ধরে হাততালি চলতে থাকতো। সেই সময় তারই স্বীয় পিতা তার এই উদ্দাম, উপভোগ্য ও দুর্দান্ত জীবন থেকে তাকে উপড়ে নিয়ে সেনাবাহিনিতে ভর্তি করাতে তৎপর হয় অথবা তার পিতা এমন একটি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, এবং ইসরাফিল ভুঁইয়া স্পষ্ট ভাষায় তার অপরাগতা জানিয়ে দিয়ে যাপিত জীবনকে উপভোগ করতে থাকে, যদিও সেটা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না কেননা ইসরাফিল ভুঁইয়ার পিতা এতোটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, একদিন প্রত্যুষে সে ঘুম থাকতেই তারই আপন অন্য তিন চাচা সহযোগে তাকে বিছানায় পাকড়াও করে তবে তারা ইসরাফিল ভুঁইয়াকে আটকে রাখতে সক্ষম হয় না। এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন ছাড়িয়ে যখন ইসরাফিল ভুঁইয়া বাড়ীর চৌহদ্দিও ছাড়িয়ে যায়, তখন তার নাছোড়বান্দা ছোট চাচার হাতে কেবল পেঁচিয়ে থেকে যায় তার গায়ের বসনটারই একটি ছেড়া অংশ, অতঃপর তারা দুপুর পর্যন্ত ইসরাফিল ভুঁইয়ার পশ্চাৎধাবনে ক্ষান্ত দিয়ে সন্ধ্যায় যখন আরও বেশ কয়েকজনের সহায়তায় তাকে মাঠ থেকে ধরে নিয়ে আসে তখন ইসরাফিল ভুঁইয়ার ঠোট বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, যদিও তার সমগ্র মুখমণ্ডলে কোন গভীর দুঃখবোধ অথবা ভীষণ ক্ষুধা এমন কিছু পরিলক্ষিত হয় না। তারপর দিন সকালে যখন তাকে তাদের গোয়ালের পেছনে থাকা প্রাচীন আমগাছটার সাথে বেধেরাখা অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়া হয়, তখন সে গোসল করে, এবং কারও সাথে কোনরূপ বাক্যালাপ ছাড়াই তার মায়ের ভেজা চোখগুলোর দিকে একবারও না তাকিয়ে প্রাতরাশ শেষ করে বেরিয়ে যায় গ্রামের আরও কয়েক যুবকের সাথে, এবং সেদিন রাতে তার সাথে বেরিয়ে যাওয়া যুবকদের মধ্য হতে তিন জনই ফেরত আসে ও জানায় যে, ইসরাফিল ভুঁইয়া আর্মিতে যোগ দিয়েছে। যে খবরটা তার গোটা পরিবারকে এক সমুদ্র আনন্দ এনে দেয়।


এরপর বেশ ক’বছর তার আর কোন খোঁজ খবর পাওয়া না গেলে গ্রামে রেখে যাওয়া ইসরাফিল ভুঁইয়ার বন্ধু বান্ধব ও দূরাত্মীয়দের মাঝে যে অনুমান, এমনকি যে বিশ্বাস তৈরি হয় তা হল, ইসরাফিল ভুঁইয়া পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান সীমান্তে শিখসেনাদের সাথে গুলি বিনিময়ের সময় মৃত্যুবরণ করেছে কিম্বা তার প্রিয় কওমের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে স্বীয় জীবন উৎসর্গ পূর্বক শহীদ হয়েছে, তবে এ খবরের কোন সত্যতা পাওয়া যায় না কারণ কেউই এমনকি পুলিশ বা ঐরূপ কোন কত্রিপক্ষ তার মরদেহ পতাকায় মুড়ে ফেরত নিয়ে আসে না এবং তার পিতামাতা এই সব সরল অনুমানের তোয়াক্কা না করে তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে এবং তাদের এই অপেক্ষা শেষ না হতেই চলে আসে সেই “মহা গণ্ডগোলের” বছরটি, যখন সমগ্র তল্লাটের সাথে সাথে তারাও অর্থাৎ ইসরাফিল ভুঁইয়ার গ্রামের সবাই এতটাই অনিরাপদ ও বিচলিত হয়ে পড়ে যে, তারা সবাই হা-ডু-ডু ও কুস্তির কথা বেমালুম ভুলে যায়, এমনকি তারা ভুলে যায় ইসরাফিল ভুঁইয়াকেও, অথবা তারা ভুলে যেতে বাধ্য হয়, কেননা তাদের সকল পাকা ফসল সেবার জমিতেই নষ্ট হয়ে যায়, আর যে সব ফসল বর্ষার শুরুতেই রোপার কথা ছিল সে ক্ষেত্রেও তারা ভুমিকে দেয়া তাদের কথা রাখতে সক্ষম হয় না। সমগ্র গ্রামের সমর্থ সকল যুবা-পুরুষদের অনেকেই সেবার রাজাকার ও খানসেনাদের গুলি ও জবাইয়ের শিকার হয়ে মারা পড়ে, বাকিরা পাকসেনাদের হাত থেকে নিজেরা বাঁচতে ও হিন্দুদেরকে বাঁচাতে নদীর পাড়ে, যেখানে কামান ও মেশিনগানবাহী গানশিপ ভিড়তে পারে সেই জায়গায়, সুউচ্চ এক বাশের আগায় পাকিস্থানের নিশান উড়িয়ে তার নিচে বৃদ্ধ ও কিছু সুললিত কণ্ঠের বাচ্চাকে নিয়ে একটি নিরবিছিন্ন কোরআন পাঠের আসর তৈরি করে। আর যারা আরও বেশি শান্তিপ্রিয় তারা উদ্যোগ নিয়ে হিন্দুদের সকল সম্পদের দেখভালের কথা দিয়ে তাদেরকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেয়। এছাড়াও অনেক মায়েরা তাদের ছাত্র ও মজুর সন্তানদেরকে কোনভাবেই তাদের চেখের জল দিয়ে আটকে রাখতে পারে না, তাদের কেউ কেউ তাদের মায়ের চোখের জলের কানাকড়ি মূল্য না দিয়ে, অনেকে আবার মায়ের সাথে দেখাটাও না করে কোথায় যেন পালিয়ে যায় যদিও পরে জানা যায় তারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। যুদ্ধ শেষে তাদের অনেকেই যখন লম্বা লম্বা দাড়ি গোঁফে মুখ ঢেকে কাধে রাইফেল ঝুলিয়ে ফেরত আসে তখন যারা ফেরত আসেনা তাঁদের মায়েরা হতে পারে, ইসরাফিল ভুঁইয়ার মায়ের চেয়েও কিছুটা অধিক বিহ্বল হয়ে পড়ে। এই হারিয়ে যাওয়া দলটির কেউ আর কোনদিন ফেরত না এলেও ইসরাফিল ভুঁইয়া ফেরত আসে। তবে ইসরাফিল ভুঁইয়া যখন ফিরে আসে তখন সকল দেশত্যাগী হিন্দুরাও ফিরে আসতে থাকে আর ফিরে আসা এই সব হিন্দুর দল যখন তাঁদের গচ্ছিত রাখা সকল অস্থাবর সম্পত্তি ফেরত না পেয়ে ও রেখে জাওয়া ঘর বাড়ির পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া অবস্থা দেখতে পায় তখন তারা সেই সব ধ্বংস স্তূপের সামনে দাড়িয়ে এমন বিকট কান্নাকাটি শুরু করে যে, বাকিরাও তাঁদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে  বিধায় ইসরাফিল ভুঁইয়ার ফিরে আসার বিষয়টি তার পরিবার ও নিকটাত্মীয় ছাড়া বাইরের লোকদেরকে খুব বেশি আশ্চর্য করে না এমনকি বিষয়টা খানিকটা যেন চাপা পড়ে যায়। সুতরাং ইসরাফিল ভুঁইয়ার ফিরে আসার দিনগুলি কিছুটা নিরবেই কেটে যেতে থাকে এই সময়ে সে তার কয়েক জন বন্ধু-বান্ধবকে খুজতে গিয়ে না পেয়ে নিরাশ হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় “শালারপূতেরা মনেঅয় যুদ্ধে গিয়া মরছে”। যেহেতু তার পিতা মাতা এতটা লম্বা প্রতীক্ষা উপরন্তু একটি যুদ্ধ শেষে তাকে ফিরে পেয়েছে তাই তারা এসব কিছুর ভেতরেও খানিকটা সুখবোধ করে এবং তাকে পুনরায় হারিয়ে ফেলার ভয় হতে মুক্তি পেতে তারা ইসরাফিল ভুঁইয়ার বিবাহের উদ্যোগ গ্রহন করে ।


হতবুদ্ধি, আশাহত ও বিরক্ত ইসরাফিল ভুঁইয়া এই দিনগুলো একা একাই কোথাও শুয়ে অথবা বসে থেকে পার করার চেষ্টা করছিল এবং এই সময়, যখন এই মাত্র তার খাটিয়াবাহী স্বজনেরা তাকে বয়ে নিয়ে যে প্রাচীন বটগাছটা অতিক্রম করে সরু রাস্তায় প্রবেশ করেছে, সেদিন সে এই বটগাছটার নিচেই বসেছিল, তখন সূর্য ছিল ডুবন্ত মনে হচ্ছিলো মোটা মোটা সবুজ বটের পাতাগুলো সূর্যের মৃদু আলোর সাথে এক তাচ্ছিল্য পূর্ন খেলায় মেতে উঠেছে। ইসরাফিল ভুঁইয়া লক্ষ্য করে দূর থেকে মাঠ পেরিয়ে একটি ছায়ামূর্তি হেঁটে যেন তার দিকেই আসছে, ছায়ামূর্তিটা তার নিকটবর্তী হয়, সে দেখে একজন দূরবর্তী হাট ফেরত মানুষ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যার মাথায় বিশাল আকৃতির বাজারের ডালা যদিও তা আকৃতির সাথে মিলিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ ভারী নয় বলেই ইসরাফিল ভুঁইয়ার মনে হয়। হাট ফেরত ব্যক্তি যখন আরও নিকটবর্তী হয় তখন ইসরাফিল ভুঁইয়া তাকে চিনতে পারে, অত্যান্ত ভালভাবেই ইসরাফিল ভুঁইয়া তাকে চিনতে পারে, এই সেই অঘোর মাঝি যে ইসরাফিল ভুঁইয়ার স্মৃতিতে এইমাত্র দগদগ করে ফুটে ওঠে, সে ছিল শীর্ণকায় যদিও এখনো সে তাই আছে এবং এই শীর্ণকায় অঘোর মাঝির দ্বারাই একমাত্র সম্ভব হতো ইসরাফিল ভুঁইয়াকে বিপক্ষ দলের কোর্টের নিদ্রিস্ট সীমার মধ্যে আটকে ফেলা বা ‘ধরে রাখা’।

মনে পড়ে যায় ইসরাফিল ভুঁইয়ার এই অঘোর মাঝিই একবার এক মর্যাদাপূর্ণ লড়াইয়ে নিজ গ্রামের বিপেক্ষ অবস্থান নিয়ে তারই প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে নেমেছিল আর সেটাই ছিল ইসরাফিল ভুঁইয়ার সমগ্র জীবনের হারগুলির মধ্যে অন্যতম এমনকি একমাত্রও হতে পারে। এক রহস্যময় শক্তি ছিল অঘোর মাঝির দু’কব্জিতে, সেদিন যতবারই ইসরাফিল ভুঁইয়া প্রবেশ করেছে তার বিপক্ষ দলের কোর্টে ঠিক ততবারই মুহূর্তের অসতর্কতায় কিম্বা অতি সতর্কতার কোন এক মুহূর্তে অঘোর মাঝি এসে জড়িয়ে পড়েছে তার বা’পায়ের গোড়ালিতে, যেন এক কঠিন ধাতব শেকল হয়ে। আর সেদিনের পর থেকে হা-ডু-ডু প্রসঙ্গে ইসরাফিল ভুঁইয়ার পাশাপাশি অঘোর মাঝির নামটাও যেন সমভাবে উচ্চারিত হতে থাকে। যখন সে প্রথমবার ইসরাফিল ভুঁইয়ার বা’পায়ে জড়িয়ে পড়ে তখন মুহূর্তে সে খানিকটা  চমকে ওঠে কেননা, সে প্রতিপক্ষের দিকে ডান পা’টাই এগিয়ে দিয়েছিলো তাকে ধরার জন্য কিন্তু অঘোর মাঝি এসে জড়িয়ে যায় তার বা’পায়ে, ইসরাফিল ভুঁইয়া শুন্যে লাফিয়ে ওঠে সাথে সাথে অঘোরও ঝুলে থাকে তার পায়ে এবং যতক্ষণে তারা ভূমিতে ফিরে আসে ততক্ষণে অঘোরের দোহারেরা চেপে বসে ইসরাফিল ভুঁইয়ার বুক পেট ও ঊরুতে, সে ধরাশায়ি হয়ে কিছুক্ষণের জন্য দর্শকে পরিণত হয়। চারপাশে তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে দর্শকেরা যা সেই মুহূর্তে ইসরাফিল ভুঁইয়ার শরীরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বিষিয়ে তুলেছিল এবং তার পর অঘোর যেন এক রাক্ষুসে জোঁকে পরিণত হয়। ইসরাফিল ভুঁইয়া তার কোর্টে আসার ক্ষণকালের  মধ্যেই অঘোর তার লৌহ কঠিন কব্জির সাথে থাকা দুটি তালুতে পুরে নেয় ইসরাফিল ভুঁইয়ার শক্তিশালী পায়ের গোড়ালি যেন বা অবলীলায়, আর তারপর ইসরাফিল ভুঁইয়া নিজেকে মুক্ত করতে যখন দানবীয় লম্ফঝম্প শুরু করে ততক্ষণে অঘোরের  দোহারেরা ঝুলে পড়ে অঘোরেরই দু’পায়ে, নিজেকে মুক্ত করতে ইসরাফিল ভুঁইয়া যে লাফ গুলো দিতে বাধ্যহয় তাতে অঘোর একবার শুন্যে উঠে আসে, একবার ডানে আছড়ে পড়ে, আরেকবার বায়ে কিন্তু তাতে তার মুষ্ঠশৃঙ্খল শিথিল হয় না এতটুকুও। এবারের করতালিটা যেন ইসরাফিল ভুঁইয়ার মাথার ভেতরে বাজতে থাকে, যেন থামে না বাজতে থাকে। ইসরাফিল ভুঁইয়াকে উম্মাদ করে দেয় সে করতালি আর হর্ষধ্বনি। অঘোর এসে দাড়ায় তার সামনে, ইসরাফিল ভুঁইয়া দেখে অঘোরের ঠোট চিবুক ও দাঁতে খেলে যাচ্ছে এক শব্দহীন মৃদুহাসি যা ভীষণ প্রশান্তির, যেন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তার ফিরে আসা বন্ধুকে সে এক্ষুনি আলিঙ্গনাবব্ধ করবে। বসে থাকা ইসরাফিল ভুঁইয়ার সামনে অঘোর এসে দাড়ায় ও হাসি অক্ষুণ্ণ রেখেই জানতে চায়, “কেমন আছো ইসরাফিল ভাই?” এই জলের মতো সহজ ও পরিস্কার প্রশ্নটাই যেন ইসরাফিল ভুঁইয়ার মাথার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয় আর উত্তর আসে, “যেমনই থাকি তাতে তোর কি হারামির বাচ্চা মালাউন”! এবং শেষের শব্দটা একটু আস্তে ও কিছুটা বিড়বিড় করা কণ্ঠে বললেও অঘোরের সতর্ক কান তা শুনে ফেলে, একটুও দমে না গিয়ে ও হাসি অক্ষুণ্ণ রেখেই অঘোর বলে, “দ্যাহ ইসরাফিল ভাই দ্যাশ এহন স্বাধীন হইছে, কথায় কথায় মালাউন কবা না” “কি কইস শুয়োরের বাচ্চা চাড়াল” বিদ্যুৎ বেগে উঠে দাঁড়ায় ইসরাফিল ভুঁইয়া আর ততধিক দ্রুততায় একাধিক চড় সে বসিয়ে দেয় অঘোরের হাসি মেলে রাখা মুখে ও শীর্ণ কাঁধে, ছিটকে পড়ে অঘোর, ছিটকে পড়ে তার মাথায় রাখা বাজারের ঢালা সহ। বিরক্ত ইসরাফিল ভুঁইয়া অন্যত্র যাবার জন্য পা বাড়ায় ও কিছুদূর গিয়ে একবার পিছু ফিরে দ্যাখে ভূলুণ্ঠিত স্বাধীন অঘোর মাঝি তার চড় গুলিকে ইতোমধ্যেই  হজম করে নিয়েছে এবং ঘাসের ভেতর ছড়িয়ে পড়া আলু, পটল বা বেগুন একটা একটা করে খুজে বের করার চেষ্টা করছে। তারপর এই স্বাধীন দেশের কর্মহীন দিনগুলো তার কেটে যেতে থাকে একের পর এক আকস্মিকতায়, এই সময়েই ইসরাফিল ভুঁইয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। (চলবে....)


বাংলাদেশ স্থানীয় সময় : ১৬৩০ ঘন্টা ২ অক্টোবর ২০১৩
এএম-০৫

Bangla-Kotir
line seperator right bar ad
sunnati hazz
line seperator right bar ad
RiteCareFront
line seperator right bar ad
Adil Travel Winter Sale front
line seperator right bar ad
starling front
line seperator right bar ad

Prothom-alo Ittafaq Inkilab
amardesh Kaler-Kontho Amader-Somay
Bangladesh-Protidin Jaijaidin Noya-Diganto
somokal Manobjamin songram
dialy-star Daily-News new-york-times
Daily-Sun New-york-post news-paper

line seperator right bar ad

 

 Big

line seperator right bar ad
Rubya Front
line seperator right bar ad

Motin Ramadan front

line seperator right bar ad
 ফেসবুকে বিএনিউজ24
line seperator right bar ad
   আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...
line seperator right bar ad
banews ad templet
 
 
line seperator right bar ad
   ফটোগ্যালারি
  আরো ছবি দেখুন -->> 
line seperator right bar ad
 
    পুরাতন সংখ্যা
banews ad templet