সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে আছে বিএনপির সব উদ্যোগ

bnp kahaচেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তহীনতা আজকাল বিএনপিতে অন্যতম আলোচিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই রসিকতা করে বিএনপির নেতাদেরই এখন বলতে শোনা যায়- সিদ্ধান্তহীনতাই নাকি বিএনপির ‘সৌন্দর্য’! কারণ এভাবেই নাকি বিএনপি প্রায় ৪০ বছর যাবৎ টিকে আছে।

সূত্রমতে, সাম্প্রতিককালে কতগুলো করণীয় ইস্যুতে দলটির সিদ্ধান্তহীনতার বিষয়টি আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। এগুলো হচ্ছে, দলের পুনর্গঠন, জাতীয় কাউন্সিল এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের প্রশ্নে। এছাড়া প্রধান শরিক জামায়াতকে নিয়ে শেষপর্যন্ত কী করা হবে? এ প্রশ্নেও দোদুল্যমান রয়েছে বিএনপি। বলা হচ্ছে; এসব ইস্যু নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা থাকলেও শেষপর্যন্ত সম্পন্ন হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ বিষয়গুলো নির্ভর করছে শুধু দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একক ইচ্ছা বা সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু তিনি নেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করলেও চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না। বলছেন, ‘দেখেন কী করা যায়’!

জানতে চাইলে বিএনপি নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও নজরুল ইসলাম খান জানান, কাউন্সিল নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে এ কথা ঠিক। কিন্তু কখন কোথায় এবং কীভাবে সম্পন্ন হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। মাহবুবুর রহমানের মতে, শেষপর্যন্ত চেয়ারপারসনের ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। বিএনপির মতো বড় একটি দলে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলে অনেক ইস্যু নিষ্পত্তি হতে দেরি হয়; তবে এটিকে সিদ্ধান্তহীনতা বলা ঠিক হবে না। জাতীয়তাবাদীদের ঐক্য প্রশ্নে দলের মধ্যে ভিন্নমত আছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, দল পুনর্গঠন করতে হলে কাউন্সিল করতে হবে। কিন্তু সরকার যেভাবে বিএনপিকে তোপের মুখে রেখেছে তাতে সুস্থভাবে সবকিছু সম্পন্ন করা কঠিন। তিনি জানান, এর আগে ২০১৪ সালের কাউন্সিলের হল ভাড়া নিয়েও নানা কারণে কাউন্সিল করা যায়নি। তবে এবার দেখা যাক, চেষ্টা হচ্ছে।

দলের কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং যুগ্ম মহাসচিব মোহম্মদ শাজাহানও স্বীকার করেন, কাউন্সিল ও দলের পুনর্গঠন নিয়ে আলাপ-আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নোমান বলেন, কাউন্সিলের দাবি থাকলেও এ নিয়ে দলীয় ফোরামের কোনও পর্যায়ে বৈঠক হয়নি। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, কাউন্সিলের জন্য উপযুক্ত সময় নভেম্বর-ডিসেম্বর। প্রস্তুতির জন্য কিছু কিছু কাজও চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, চেয়ারপাসনের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

দোদুল্যমানতা বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য বিএনপিতে সবচে বড় উদাহরণ হয়ে আছে অষ্টম সংসংদে সরকারি দলে এবং নবম সংসদে বিরোধী দলীয় একজন উপনেতা নির্বাচন করতে না পারা। অষ্টম সংসদে উপনেতা ও পদ নিয়ে বিরোধ হয়েছিলো প্রয়াত এম. সাইফুর রহমান, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মধ্যে। তারা তিনজনই উপনেতা হতে চেয়েছিলেন। অবশ্য ওই সময় সিনিয়র নেতাদের মধ্য থেকে একজনকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করার কথাও আলোচনা হয়েছিলো। পরে নেতাদের প্রতিযোগিতার কারণে শেষপর্যন্ত কিছুই হয়নি। নবম সংসদে বিরোধী দলে গিয়েও স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মধ্যে লবিং পাল্টা-লবিংয়ের কারণে পুরো পাঁচ বছর উপনেতা ছাড়াই পার করে বিএনপি।

একইভাবে ওয়ান-ইলেভেনের পর শুরু থেকেই দলের বিপক্ষে তৎপরতা শুরু করেন তৎকালীন বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। কিন্তু মহাসচিব পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয় অনেকদিন পরে। ততদিনে মান্নান ভূঁইয়া দল ভাঙার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেন। পরে মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় এক বছর নিষ্ক্রিয় থাকলেও মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তাকে ওই পদে বহাল রাখেন খালেদা জিয়া। একইভাবে আজ প্রায় সাড়ে তিন বছর হলো ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুধু দলে বিরোধ আর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তাকে ভারমুক্ত করা হচ্ছে না।

পুনর্গঠন ও কাউন্সিল

দল পুনর্গঠন করতে হলে জাতীয় কাউন্সিল করা প্রয়োজন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্রতি তার এক বক্তৃতায় দল পুনর্গঠনের কথা বলেছেন। সে অনুযায়ী এটিকে কেউ কেউ নীতিগত সিদ্ধান্ত বলেও মনে করেন। পাশাপাশি দলকে ঢেলে সাজাতে জাতীয় কাউন্সিল করা প্রয়োজন বলে দলের সবার দাবি উঠেছে। কারণ বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিলো প্রায় ছয় বছর আগে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। সূত্রমতে, খালেদা জিয়ার ইঙ্গিতে কিছু কিছু প্রস্তুতির কাজ শুরুও হয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত হবে বলে কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না। কারণ দলের একাংশের মধ্য থেকে এর বিরোধিতাও রয়েছে। ওই অংশটি চাইছে না বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণ মহাসচিব হোক।

এর আগে গত বছরও শুধু মির্জা ফখরুলকে ঠেকানোর জন্য তার বিরোধী অংশ ওই কাউন্সিল ভণ্ডল করে দিয়েছিলো বলে জানা যায়।

সূত্রমতে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরেই কাউন্সিল করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিলো। এরপর ওই বছরের মার্চ মাসে এজন্য কমিটি পর্যন্ত গঠিত হয়। শুধু তাই নয়; কাউন্সিল অনুষ্ঠানের জন্য বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করা হয়েছিলো। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফখরুলবিরোধী নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ, রিজভী আহমেদসহ কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়াকে রাজি করিয়ে কাউন্সিল বাদ দিয়ে জেলা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। ফখরুলকে অদক্ষ প্রমাণিত করে মহাসচিব পদ থেকে তাকে বাদ দেওয়াই ছিলো ওই অংশের উদ্দেশ্য। আর মহাসচিব হতে আগ্রহী ছিলেন দুই নেতা সালাউদ্দিন ও রিজভী। যদিও এই দুই নেতার গোপন ইচ্ছার কথা জানতে পেরে পরে ওই উদ্যোগ থেকে আব্বাস ও গয়েশ্বর সরে যান বলে সূত্রের দাবি। জানা যায়, দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হলে জেলা পুনর্গঠনের ওই উদ্যোগও থেমে যায়।

এদিকে কাউন্সিল সম্পন্ন করার মতো দক্ষ, করিৎকর্মা ও সাংগঠনিক নেতারও এ মুহূর্তে বিএনপিতে অভাব রয়েছে। রয়েছে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবও। দলটির অন্যতম সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দীর্ঘদিন কারাগারে। দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে সারাদেশে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিলো রিজভী আহমেদের; তিনিও কারাগারে। এদিকে, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গেছেন। অনেকের মতে, ফখরুল সুস্থ হয়ে না ফিরলে এবং রিজভী জামিনে মুক্ত না হলে কাউন্সিল করা কঠিন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বরের কাউন্সিলে সাড়ে ১২ হাজার কাউন্সিলরসহ ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মী অংশ নিয়েছিলেন। পুরো ১০ হাজার ওই লোকের দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তৎকালীন মহানগরী বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা। যিনি গত এক বছর যাবৎ চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। বিগত কাউন্সিলে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী আ স ম হান্নান শাহ আগের চেয়ে কিছুটা অসুস্থ। মির্জা আব্বাস এখনও আত্মগোপনে। আর কয়েক বছর যাবৎ গুম হওয়া ইলিয়াস আলীর এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মামলায় ঢাকা মহানগরী ছাড়াও সারাদেশের তৃণমূলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। আবার অসংখ্য মামলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী।

সিদ্ধান্তহীনতা ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়েও...

জামায়াতসহ ডানপন্থী কয়েকটি দলকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন হয়েছিলো ১৯৯৯ সালে। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারলেও আজ আট বছর ক্ষমতার বাইরে আছে বিএনপি। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতকে নিয়ে এক ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বিএনপি। এ দলটিকে নিয়ে আর সামনের দিকে এগুনো যাবে কি না- এ নিয়ে বিএনপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। ফলে উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সর্ম্পক উন্নয়নের পাশাপাশি এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলো এমন দল ও নেতাদের এক পতাকাতলে আনার এক ধরনের আকাঙ্খা বিএনপির মধ্যে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দলটির মধ্যে জামায়াতবিরোধী ও প্রগতিশীল অংশ এজন্য বেশি আগ্রহী। বিশ্ব বাস্তবতার কথা তুলে ধরে এবং খালেদা জিয়াকে রাজি করিয়ে এজন্য তারা তৎপরতাও শুরু করেছেন। অনানুষ্ঠানিকভাবে তারা আলাপ-আলোচনাও শুরু করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা, অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টিসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে। পাশাপাশি দলে ফিরিয়ে আনতে তারা বিএনপির সংস্কারপন্থীদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন।

সূত্রমতে, দলের বৃহত্তর স্বার্থে মির্জা ফখরুল, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অনেকেই এখন ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষে। কিন্তু এদের বিরোধী একটি অংশ আবার মনে করছেন বি. চৌধুরী-অলি আহমদরা বিএনপিতে ফিরলে দলে তাদের গুরুত্ব কমে যাবে। বিশেষ করে ফখরুল-খোকারা আবার দলের প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেন বলে তাদের আশঙ্কা। ফলে এ অংশের বিরোধীদের পাশাপাশি জামায়াতও জাতীয়তাবাদী ঐক্যের ঘোরতর বিরোধী। ফলে শেষপর্যন্ত ঐক্য বাস্তবে রূপ লাভ করবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এর আগে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরেও বি. চৌধুরী- অলি আহমেদের পাশাপাশি সংস্কারপন্থীদের দলের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আলোচনা করে অনেক দূর এগিয়ে এনেছিলেন মির্জা ফখরুল। কিন্তু নেতাদের বিরোধ ও সিদ্ধান্তহীনতায় শেষপর্যন্ত তা বাস্তবে রূপ লাভ করেনি।