ম্যারাডোনাকে ছোঁয়ার হাতছানি মেসির

জীবনের গল্প শুরু শরীরে হরমোনজনিত সমস্যা নিয়ে। সেই সমস্যাটাই শেষমেশ আশীর্বাদের ফুল হয়ে ফুটল। সপরিবারে পাড়ি জমালেন স্পেনে, বার্সেলোনার টাকায় চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা লিওনেল মেসি হয়ে গেলেন কাতালানদের সম্পদ। স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়া পরের গল্পটা তো রীতিমতো ইতিহাস। তাঁর ড্রয়িংরুমের শোকেসে থরে থরে 14vসাজানো ছয়টি স্প্যানিশ লা লীগা শিরোপা, তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি, দু’টো কোপা ডেল রে, ছয়টি স্প্যানিশ সুপার কাপ, দু’টো করে উয়েফা সুপার কাপ আর ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। প্রতিদান হিসেবে মেসির কাছ থেকে বার্সেলোনার আর চাওয়ার কিছু থাকার কথা নয়। চারবারের ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার জিতে ব্যক্তিগত অর্জনটাও ভরিয়ে তুলেছেন।
কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের ছায়া হয়ে থাকার অভিযোগ শুনতে শুনতে কান ঝালপালা হয়ে গেছে মেসির। আকাশী-সাদা গায়ে চাপিয়ে জিতেছেন ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের স্বর্ণ আর এরও তিন বছর আগে ২০০৫ ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। কিন্তু তখন তো মেসি আজকের মেসি হয়ে ওঠেননি। তাই আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকরকে সুযোগ পেলেই শূলে চড়িয়েছেন নিন্দুকেরা, অভিযোগের তীরে করেছেন ক্ষত-বিক্ষত। জবাবটা দিতে মেসি বেছে নিয়েছেন এবারের বিশ্বকাপ। হল্যান্ডের বাধা ডিঙিয়ে ২৪ বছর পর আর্জেন্টিনাকে তুলে নিয়েছেন ফুটবলের সর্ববৃহৎ আসরের ফাইনালে। স্বর্ণে মোড়ানো স্বপ্নের ট্রফিতে হাত রাখতে শুধু নয়, কিংবদন্তি ডিয়াগো ম্যারাডোনাকে স্পর্শ করা থেকেও আর মাত্র ৯০ মিনিট দূরে মেসি। রোববার মারাকানার ফাইনালেই কি তবে একবিন্দুতে মিশে যাবেন আর্জেন্টিনার দুই ফুটবল মহারথী? আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতলে নিশ্চিতভাবেই এটি হয়ে থাকবে মেসির বিশ্বকাপ। ‘চিরশত্রু’ ব্রাজিলের ফুটবল তীর্থে সেটি মঞ্চস্থ হওয়ায় স্বাদটাও হবে যুগের পর যুগ অমলিন থাকার মতো।
সাও পাওলোর অ্যারেনা করিন্থিয়ান্সে হল্যান্ডের রক্ষণ যে দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করে রাখে সেটিতে কোনভাবেই ফাটল ধরাতে পারছিলেন না মেসি। তাঁর শরীরে আঠার মতো লেগে থাকা নাইজেল ডি জং ম্যাচের প্রথম এক ঘণ্টা তো তাকে বোতলবন্দী করে রাখে। আর দুর্দান্ত ফ্রিকিকটা ঠেকিয়ে হতাশ করেন ডাচ গোলরক্ষক ইয়াস্পার সিলেসেন। ১২০ মিনিটের গোলশূন্য লড়াই শেষে টাইব্রেকারে দলের প্রথম শটে বোকা বানান সিলেসেনকে। রন ভøার আর ওয়েসলি ¯œাইডারের শট ঠেকিয়ে ৪-২ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে নায়ক হয়তো গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো, কিন্তু এই সাফল্যের স্বপ্ন সারথী যে মেসি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের পথে ডিয়াগো ম্যারাডোনা নিজে করেন পাঁচ গোল, সতীর্থদের দিয়ে করান আরো পাঁচটি। এই বিশ্বকাপও সাক্ষী হয়ে আছে উত্তরসূরি মেসির তেমন সাফল্যের। বসনিয়া, ইরান ও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচে করেছেন চার গোল। দ্বিতীয় রাউন্ডে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়ার একমাত্র গোলের উৎস তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে গঞ্জালো হিগুয়েইন যে বলে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়া গোলটি করেছেন সেটিও এসেছে মেসির পা ছুঁয়ে।
বাঁ পায়ের এই জাদুকর সেমিফাইনালে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। রন ভø্রারের নেতৃত্বে ডাচ রক্ষণ তাকে বক্সে ঢোকারই সুযোগ দেয়নি। ডি জংয়ের বদলি হিসেবে জর্ডি ক্লাসি মাঠে নামার পরও মেসি থেকেছেন নিজের ছায়া হয়ে। তবে টাইব্রেকারের আগে দলকে জাগিয়ে তোলার মন্ত্রটা তো তার কণ্ঠ দিয়েই বেরিয়েছে। আকাশ ছোঁয়া সাফল্য নিয়েও নিজেকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে রাখার সাহস পান না, শুধু এই বিশ্বকাপ অতৃপ্তির কারণে। গত দু’টি আসরে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়ায় ইয়োহান ক্রুইফ, ইউসেবিও, জাস্ট ফন্টেইনের মতো বিশ্বকাপ জিততে না পারা কিংবদন্তিতের পাশে মেসিকে কল্পনা করতে শুরু করেন অনেকে। ধারণা পাল্টে দেয়ার সুযোগ এসেছে ২৭ বছরের পরিণত মেসির সামনে। পেলে, ম্যারাডোনার থেকে আর যে মাত্র একটি জয় দূরে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে ২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দেখেছেন টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে দলের হার। এর চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই একই পর্যায়ে জার্মানদের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার স্মৃতি এখনো নিশ্চয় দগদগে হয়ে আছে। মারাকানার ফাইনালে প্রতিপক্ষ আবারও জার্মানি। যাদের হারিয়ে ৮৬-এর বিশ্বকাপে চুমু খান ম্যারাডোনা। আবার ১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালের বিজ্ঞাপন হয়ে আছে এই জার্মানির কাছে হেরে চোখের পানিতে ভেসে যাওয়া ম্যারাডোনা। রোববার মারাকানায় মেসিকে ৮৬ ম্যারাডোনা হিসেবে দেখার অপেক্ষায় আর্জেন্টাইনরা। নইলে যে মেসির কান্নাও হয়ে থাকবে এই বিশ্বকাপের মুখ। দু’জনের তুলনা শুরু আন্তর্জাতিক মঞ্চে মেসির আবির্ভাবের পর থেকেই। তার মাঝে ম্যারাডোনাও দেখেছেন নিজের ছায়া। কিন্তু ইতিহাস তো মনে রাখবে পরিসংখ্যান দিয়ে, মাঠে অসাধারণ কোন স্কিল বা ড্রিবলিং হারিয়ে যাবে স্মৃতির অতলে। তাই পূর্বসূরিকে ছোঁয়ার এই সুযোগ মেসি কোনভাবেই হারাতে চাইবেন না। তাকে ঘিরেই তো ম্যারাডোনা কীর্তির ২৮ বছর পর তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা। ডাচদের বিপক্ষে সেমিফাইনালেই অবশ্য ম্যারাডোনাকে (৯১) টপকে আর্জেন্টিনার সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলারের তালিকায় ছয়ে উঠে গেছেন মেসি (৯২)। গোলসংখ্যায় ম্যারাডোনাকে (৩৭) ছাড়িয়ে গেছেন আরো আগে (মেসি ৪২)। এখন শুধু আরাধ্য বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের পাতায় নামটা পাশাপাশি রাখার অপেক্ষা

Adil Travel Winter Sale 2ndPage

খেলা : সকল সংবাদ

আজকের এই দিনে
লোকে-যারে-বড়-বলে-বড়-সেই-হয়
আবদুল আউয়াল ঠাকুর : বাংলা প্রবচন হচ্ছে, আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যা বড় বলে বড় সেই হয়। সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি কেন্দ্র করে এমন কিছু...