প্রচ্ছদ আমেরিকা

নির্বাচন ৫ জানুয়ারি ২০১৪ : ফিরে দেখা

জিবলু রহমান : দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করতে নিয়মিত ব্যবধানে নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের অধীনে অবাধ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন বিকল্প থাকতে পারে না। নির্বাচনে জনগণের স্বাধীন রায় প্রকাশের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এ জন্য অপরিহার্য। সংবিধান হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন।
1431190781 boxআওয়ামী লীগ-বিএনপির সমঝোতার রাস্তা বড় কঠিন। স্যার নিনিয়ান স্টিফেনের উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর স্পিকারের কক্ষে সম্মিলিত বিরোধী দলের সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়। আলোচনায় সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের কাছে কোনরূপ সরকার বিরোধী সভা-সমাবেশ, মিছিল না করার লিখিত গ্যারান্টি দাবি করা হয়। তখন বিরোধী দলের অন্যতম নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘মুচলেকা’ দিয়ে রাজনীতি হয় না। এ কথার পর পরই আলোচনা ভেঙে যায়। সরকার পক্ষের আলোচক কর্নেল (অবঃ) অলি অন্য তিন সহকর্মীকে নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করেন। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। এনডিপি’র সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আলাদাভাবে পদত্যাগপত্র পেশ করেন। বিরোধী দলগুলো পদত্যাগের আগে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেয়। এর মধ্যে ছিল-প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, সংসদ বাতিল, ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি বা অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োগ, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না ও কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন, অবাধ ও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব।
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সারা দেশে যেভাবে মানুষ খুন হয়েছে তা মানুষ এখনো ভুলে যায়নি। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৪ সালে সারা দেশে খুন হয় ২২২২ জন, ১৯৯৫ সালে ২৫৪৮ জন আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৬ সালে ৩১৩১ জন, ১৯৯৭ সালে ৩৩৮৪ জন, ১৯৯৮ সালে ৩৫৩১ জন, ১৯৯৯ সালে ৩৮১০ জন, ২০০০ সালের ৬ মাসে খুন হয় ১৮শ’ জন। আওয়ামী লীগে আমলে এসিড নিক্ষেপ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৫৪০টি। ১৯৯১ সাল থেকে পাঁচ বছর বিএনপি সময় দেশে নারী ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ১৭২৩টি আর আওয়ামী লীগের পাঁচ বছরে নারী ধর্ষণের শিকার হয় ৮১৩৭টি।  ডাঃ এইচবিএম ইকবাল যিনি ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারিতে মালিবাগে মির্জা আব্বাসের মিছিলে গুলী করে মানুষ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইকবাল বাহিনীর গুলীতে ঐদিন ৪ জন বিএনপি ও যুবদল কর্মী নিহত এবং অর্ধ শতাধিক আহত হয়।
২৭ অক্টোবর ২০০৬ ঢাকায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করার দৃশ্য আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। এ ধরনের নারকীয় তান্ডব আওয়ামী লীগের পক্ষেই সম্ভব, কারণ তারা’ স্বৈরাচারী ও একদলীয় চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। যারা গণতন্ত্রকে সহ্য করতে পারে না, তারাই অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে মেনে নিতে পারে না। রাজনৈতিক কর্মসূচি বলতে আওয়ামী লীগ নৃশংসতাকেই বুঝে থাকে। তাদের এ চরিত্রের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন, এবিসি, এনবিসি, সিবিএসসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে পিটিয়ে হত্যার এই দৃশ্যটি বার বার প্রদর্শিত হয়েছে। ড. ইউনুসের নোবেল শান্তি পুরস্কার যখন বিশ্বে এক নতুন ইমেজে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছে ঠিক তখনই জীবন্ত মানুষকে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্যটি সেই ইমেজকে ম্লান করেছে সর্বত্র। নিউইয়র্ক সিটির টাইমস স্কোয়ারে রয়টার হেড কোয়াটারের ওপরে স্থাপিত বিশাল টেলিভিশন স্ক্রিনে ওয়ার্ল্ড নিউজের শিরোনামে বাংলাদেশের ঘটনাবলির মধ্যে সেই দৃশ্যটি প্রদর্শিত হয়েছে বারবার। আমেরিকানদের অনেকেই সেই ঘটনার বীভৎসতা দেখে চোখ ঢেকেছেন। বাংলাদেশী কমিউনিটিতেও ঘটনাটি ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়। নিউইয়র্কে বাংলাদেশী অনেকেই তাদের সন্তান-সন্ততিরা যাতে জীবন্ত মানুষ হত্যার সেই দৃশ্য না দেখে সেজন্য টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
এ লোমহর্ষক হত্যা-সন্ত্রাস মানুষ আর কতো দেখবে। মাত্র তিনদিনে যেন ক্ষমতায় না এসেও যে হত্যা নৈরাজ্য করেছে, ক্ষমতায় এলে কি করবে এটা এখন বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে হবে। আওয়ামী লীগের এরূপ রাজনৈতিক সহিংসতা ও অবরোধ কর্মসূচি বিপুল প্রাণহানি ছাড়াও অর্থনীতিতে সৃষ্টি করেছে বড় ধরনের ক্ষতের। ঈদের ছুটির পর এই টানা সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে দেশের প্রায় সব উৎপাদনযন্ত্রই অচল হয়ে পড়ে। ফলে এর পুরো আর্থিক ক্ষতির হিসাব কষা সম্ভব নয়। তবে হরতালের মতো তুলনামূলক শিথিল কর্মসূচিতেও দৈনিক কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এই রক্ষণশীল হিসাবটিকে আমলে নিলেও আওয়ামী লীগের ৩ দফা পালিত টানা অবরোধে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
এই অবরোধে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের বৃহত্তম রফতানি আয়ের খাত পোশাক শিল্প। রফতানির প্রায় ৭৬ শতাংশ আসা পোশাক খাতেই কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অবরোধের আর্থিক ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ৩০ অক্টোবর ২০০৬ দৈনিক আমার দেশকে বলেন, হরতাল বা অবরোধে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। সরাসরি ক্ষতি ছাড়াও এক্ষেত্রে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিটাই বড়। এরকম কর্মসূচির ফলে বিদেশি ক্রেতাদের মনে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তিনি বলেন, টাকার অংকে পুরো ক্ষতি হিসাব করা সম্ভব না হলেও ক্ষতি যে শত শত কোটি টাকার হয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হরতাল বা অবরোধের ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
২৮ অক্টোবর ২০০৬ বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপেদেষ্টা হতে না দেয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সংবিধান ভঙ্গের শুরু। সেই থেকে নদীর বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো সংবিধান ভঙ্গ হয়েই চলেছে। এসব কিছুর প্রধান কারণ আমাদের অসুস্থ রাজনীতি।
বাংলাদেশে সংসদ রেখে নির্বাচন করা খুব কঠিন। নবম সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট রাজপথে লাগাতার সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে জনজীবনকে দিনের পর দিন জিম্মি করে রাখলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মরহুম প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ওই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী দেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং পরদিন ১২ জানুয়ারী প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতির কারণেই তখন ক্ষমতার পালাবদলের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে যায়। সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল না সেই সরকারের। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো তাড়াহুড়াও ছিল অনুপস্থিত।
প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারে প্রেসিডেন্ট সংসদের কাছে জবাবদিহি না করে বরং সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন। কিন্তু সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভাসহ যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপিদের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী যতোক্ষণ সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপিদের আস্থাভাজন থাকবেন, ততোক্ষণই তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন। যখনই তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপিদের আস্থা হারাবেন তখনই সরকারের পতন হবে।
সংসদীয় পদ্ধতির সরকার এমপিদের আস্থা হারাতে পারে-এ ভয়ের মধ্যেই সরকার পরিচালনা করে। কিন্তু যখন ৩০০ আসনের মধ্যে ২৪০ আসনের উপরে একটি দলের থাকে, ভোট গণণার জন্য সংবিধানে মেজরিটিরই এমন ব্যবস্থা থাকে যে, প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থা হারানোর কোনো ভয় নেই তখন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের জবাবদিহিতাহীন, একনায়কসুলভ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। একজন এমপি এদেশের নাগরিক এবং একই সঙ্গে নাগরিকদের প্রতিনিধি, যিনি নাগরিকদের পক্ষে সংসদে কথা বলেন। স্বাধীন চিন্তা থেকে বা বিবেকের তাড়নায় নাগরিক হিসেবে বা নাগরিকদের প্রতিনিধি হিসেবে একজন এমপির অধিকার আছে তার দলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার বা ভোটদানে বিরত থাকার কিংবা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মতামত দেয়ার। মহাজোট-এর বর্তমান ২য় মেয়াদ শাসনকালে সংসদে গণতন্ত্র চর্চা হবে বলে মনে হয় না।
এ কথা সর্বজন প্রচলিত যে, সংসদ নির্বাচন-সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে। জনমনে প্রত্যাশা ছিল, যত জটিলতার মধ্য দিয়ে হোক নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে উৎসাহের মধ্য দিয়ে হয়েছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও সে রকমই একটা পরিবেশে হবে। কিন্তু যখন উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী হলো, তখনই সমস্যা দানা বাধতে থাকল।
২০ নবেম্বর ২০১৩ বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠনের প্রক্রিয়াগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রপতির অনুমতি পেয়েছেন তিনি। ২০ নবেম্বর ২০১৩ রাতে এই অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির কথা জানান অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী দেশের প্রথম নারী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এই সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনান তিনি; কেননা সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন আহ্বান ও সমাপ্তি ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি। তার আগে সমাপনী বক্তব্যে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এ অধিবেশনই শেষ। ইমার্জেন্সি বা যুদ্ধাবস্থা না হলে অধিবেশন বসবে না। নবনির্বাচিতরা আগামী সংসদে আসবে।
নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনরত বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদের শেষ অধিবেশনের সমাপ্তি হয়, যা নিয়ে হতাশার সুরও ছিল প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছি নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে। উনি ব্যবস্থা নেবেন। বিরোধী দলের ভোট বয়কট ও প্রতিহত করার হুমকির মধ্যে নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন বাংলার মাটিতে হবেই, বানচাল করার ক্ষমতা কারো থাকবে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগে বলেছিলেন, ২৫ অক্টোবর নির্বাচনের দিনগণনা শুরুর পর সংসদ অধিবেশন আর বসবে না। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে মতানৈক্যের মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ শুরু হওয়া ১৯তম অধিবেশনের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হয়। ২৫ অক্টোবর দুই পক্ষ রাজপথে অবস্থানের ঘোষণা দিলে দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়, যদিও পরে সংঘাতের কোনো পরিস্থিতি ঘটেনি।
মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বিরোধী দলকে তাদের প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য সময় দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য।
তার আগে ১৭ নবেম্বর ২০১৩ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির আবদুল হামিদের সঙ্গে দেখা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেন। পরদিন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন আটজন নতুন সদস্য, যার মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী গঠিত হয় সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা। নির্বাচনের সময় এই সরকারই ক্ষমতায় থাকে। আর শেখ হাসিনাই থাকেন সেই সরকারে প্রধান।
১৮ অক্টোবর ২০১৩ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন এই ‘সর্বদলীয়’ মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তব দেন এবং বিরোধী দলকে তাতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরু হয় ভাঙাগড়ার রাজনীতি। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ শুরু হয়। মহাজোট ছেড়ে নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। ১৩ নবেম্বর ২০১৩ রাতে এরশাদ, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ডাঃ একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ.স.ম আবদুর রব নতুন জোট গঠনের লক্ষ্যে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে নতুন একটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন তারা। যদিও একদিন পরই কাদের সিদ্দিকী সখীপুরের জনসভায় এরশাদ সম্পর্কে কটূক্তিমূলক কিছু বক্তব্য রাখেন। তার ভূমিকা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। এছাড়া নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গেও যোগাযোগ করেন নতুন জোটের উদ্যোক্তারা। ড. কামাল হোসেনের গণফোরামও এ জোটে যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে গণফোরামের এক নেতা সংবাদপত্রকে জানিয়েছিলেন। তবে এরই মধ্যে গণফোরাম থেকে পঙ্কজ ভট্টাচার্য বের হয়ে এসে ঐক্যন্যাপ গঠন করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাত্ম হন।
১৮ দলীয় শরিক এলডিপি প্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদকে সর্বদলীয় সরকারে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়। ভেতরে ভেতরে জোটের আরও কিছু দলের সঙ্গে চলে আলোচনা।
১৮ নবেম্বর জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। ওই সময় জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। জিএম কাদের মহাজোট সরকারের শুরু থেকেই মন্ত্রী হিসেবে কর্মরত আছেন। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী পদে মুজিবুল হক চুন্নু ও সালমা ইসলাম শপথ নেন। জিয়াউদ্দিন বাবলু মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হন।
২৬ নবেম্বর ২০১৩ নির্বাচনের আগে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়ে এরশাদ বলেন, আমরা আর মহাজোটে নেই। আমাদের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের, যিনি মহাজোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তিনি পদত্যাগ করেছেন।
জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা তৃতীয় জোট সম্পর্কে বলেন, এ জোট গঠন এরশাদ ও শেখ হাসিনার একটি পাতানো খেলা। (সূত্রঃ দৈনিক আমাদের সময় ১৭ নবেম্বর ২০১৩)
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ফাঁদে আটকে যান জাতীয় পার্টির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। ভয়ে মন্ত্রণালয়ের ফাইলে সই করেন নি। দেন নি কোন সিদ্ধান্ত। সরকারের বাইরে গিয়ে খুব একটা কথাও বলেন নি। যারা বলেছেন তারাও বলেছেন ভয়ে ভয়ে। সরকার জাপার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করার কারণে ভীতি বাড়ে। কোন উপায় না পেয়ে জাপার কয়েক ডজন নেতা রওশন এরশাদমুখী হয়ে সংসদ সদস্য (এমপি) পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। দলটির ২১ জন বিনা প্রতিদ্বদ্ধিতায় এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত ১০ জন আছেন একেবারেই অখ্যাত। তাদের অনেককেই এলাকার মানুষ খুব একটা চেনেন না। অনেকের ধারণা, সত্যিকার নির্বাচন হলে এদের জামানত রক্ষা করা কঠিন হতো।
[চলবে]

Adil Travel Winter Sale 2ndPage

আমেরিকা : সকল সংবাদ

আজকের এই দিনে
স্মরণ-অবিস্মরণীয়-শহীদ-জিয়া
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন: একেবারেই অপরিচিত ব্যক্তি শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল অসীম দেশপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অকুতোভয় মানসিকতা, উদারহণযোগ্য  সততা, সর্বোপরি বাংলাদেশের...