কাতারের পতিতালয় থেকে পালিয়ে এসে করুণ কাহিনী জানালেন এক বাংলাদেশী নারী

a230বিএ নিউজ: হাসপাতালে চাকরির কথা বলে কাতারে নিয়ে বাংলাদেশের এক নারীকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল সেখানকার একটি পতিতালয়ে। আর সেই নারী পাচারকারীদের কাছ থেকে কৌশলে ফিরে এসেছেন আবার নিজের গ্রামে। গ্রামে ফিরে আট পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন । পুলিশ একজন পাচারকারীকে আটকও করেছে। কিন্তু সেই নারীর অভিযোগ বাকি পাচারকারীরা এখন তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে।

দক্ষিণের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানায় যে আট নারী পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তারা হলেন: মঠবাড়িয়ার মৃত: তুজাম্বর আলীর ছেলে হাকিম খান (৪২), মোঃ আলী হোসেন সহ তার দুই ছেলে শাহাদাৎ হোসেন (২৫),মোঃ হোচেন (৩২), স্ত্রী ফাতিমা (৫০),হালিম খানের স্ত্রী মমতাজ বেগম (৪০), লতিফ সরকারের ছেলে মনির হোসেন (২৬) ও সোহরাব জমাদ্দারের স্ত্রী খাদিজা বেগম (৪০)। হোচেন ও মমতাজ বেগম বর্তমানে কাতারে অবস্থান করছেন। মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা এস আই শাহানাজ জানান হালিম খানকে তারা গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছেন।

যেভাবে পাচার হলেন নারী: নিজের গ্রামে ফিরে বুধবার সেই নারী সাংবাদিকদের কাছে তাঁর হৃদয় বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি জানান,কয়েক বছর আগে তার স্বামীকে টাকা-পয়সা ধার দেনা করে বিদেশে পাঠান। কিন্তু তার স্বামী ভালো অর্থ উপার্জন করে তাকে ভুলে যান। এদিকে পাওনাদারদের টাকার চাপ। সবকিছু মিলিয়ে পুরো অতিষ্ঠ হয়ে যায় তার পরিবার। সেই সুযোগটি কাজে লাগায় নারী পাচারকারী চক্র। তাকে ও তার পরিবারকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখান। ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় হাসপাতালে আয়ার কাজ, বেতন মাসে ৩০ হাজার টাকা। এক পর্যায় সকলেই রাজি হন পাচারকারীদের কথায়। পুরো টাকাটাই ৫/৬ মাস আগে পরিশোধ করে দেন। এরপর অপেক্ষার পালা কখন ফ্লাইট হবে।

অনেক অপেক্ষার পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানেও তাকে আজ-কাল বলে ২০ দিন রাখা হয়। তারপর ১০ মার্চ বিমানে উঠেন তিনি কাতারে পৌঁছলে তাকে মমতাজ ও হোচেন বিমান বন্দর থেকে এসে নিয়ে যান। তাদের কাছে একদিন থাকার পর তাকে সুদানী এক নারীর কাছে হস্তান্তর করেন এবং জানান এই তোমার মালিক। এখন থেকে তোমার সকল দায়িত্ব তার । তাকে তুমি সুবিধা অসুবিধার কথা বলবা। হাসি মুখে নারী সুদানী নারীর সাথে চলে যান। ওই মহিলা তাকে তার বাসায় নিয়ে ভালো-ভালো খাবার পোষাক কিনে দেন।৩/৪ দিন পরে রুবী তার মা-বাবাকে ফোনে জানান সে খুব ভালো আছেন। সংবাদ শুনে বাড়ীর লোকজন খুশিতে দিশেহারা।

১০ দিনের মাথায় তিনি মালিকের কাছে জানতে চান আমাকে কাজ দেন না কেন? পরের দিন তাকে একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শুধু প্রতিটি রুমে একটি করে বেড। সে জানায়, কিন্তু কোথাও কোন ডাক্তার নেই। তাকে দিয়ে ওই বেডগুলোর চাঁদর, বালিশ গোছানো সহ প্রতিটি রুমে ঝাড়– মোছা দেওয়ানো হয়। বাসায় আসার পরে ওই সুদানী নারী তার কাছে জানতে চায় তোরে কি কাজ দেওয়ার কথা বলে নিয়ে আসছে। নারী জানান, হাসপাতালের আয়া। তারা কতো টাকা নিযেছে? নারী ভাষায় বুঝাতে না পেরে কাগজে লিখে দেন ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা।

‘তোকে তো টাকা দেওয়ার কথা ছিলো না। ওদেরকে আমি ২লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। তোকে আমি কিনে এনেছি। আগামীকাল তোকে আমার লোকেরা নিতে আসবে। এই বলে ওই নারী বাসা থেকে বেরিয়ে যান। সে জানায়, আমি আগে থেকেই ওই ভাষা কিছুটা শিখে ছিলাম। আমি তাদের কথা বুঝতে পারি কিন্তু বলতে পারি না।’

পতিতালয়ে বিক্রি করা হয় নারীকে: আমি তখন বুঝলাম আমাকে মনে হয় পতিতাবৃত্তি করতে হবে। আমি বাড়িতে জানালাম। মা বাবা খুব কাঁদতে ছিল। সেই সাথে এলাকার অনেকেই জেনে গেছে আমার পরিস্থিতি। কাতারে অবস্থান রত মমতাজ ও হোচেনকে আমার সকল আকুতি দিয়ে অনুরোধ করলাম আমাকে বাচাঁন। আমার টাকার দরকার নেই। আর তোমাদের কাছে কখনো দাবীও করবো না। আমার সকল অনুরোধ ও চোখের পানি বৃথা গেল। রাত গেল সকালে ৫ জন বড় পাঞ্জাবী পড়া লোকসহ ওই নারী একটি কালো গ্লাসের মাইক্রো গাড়ী নিয়ে হাজির। তারা ওয়েটিং রুমে বসে ড্রিংক করছিলো। আমি আমার গ্লাস লাগানো রুমের ভিতরে বসে সব দেখতে পাই। তারা আমাকে দেখতে পায় না। আমি গেট লক করে দিয়ে ছিলাম। নারী বাহির থেকে আমাকে ডাকে। আমি কোন সাড়া দেইনি। আমি জানতাম সে দেশে দরজা ভেঙে কাউকে ধরে নেওয়ার আইন নাই। দু’ঘণ্টা পরে সকলে চলে যায়।আবার আধা ঘণ্টার পরে ওই নারী ফেরৎ আসে এবং দরজা খুলতে বললে আমি দরজা খুলে দেই।

যেভাবে কৌশলে পতিতালয় থেতে মুক্ত হলেন তিনি: দরজা খুলার সাথে সাথে খুব জোড়ে আমার নাকে ঘুষি মারে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। এর পর মনে হয় আমাকে পা দিয়ে এলোপাথারী আঘাত করছে। এক দিন পর আমি জ্ঞান ফিরে পেলে দেখি আমার সমস্ত শরীর ফুলে গেছে ও রক্ত ঝড়ছে(রক্তমাখা কাপড় গুলো পুলিশ ও সাংবাদিকদের দেখান)। আমাকে ৪ দিন আটকে রেখে কিছু খেতে দেয়নি আমি বেসিন-এর ট্যাপের পানি খেয়েছি। ৪ দিনের মাথায় ওই নারী আমার কাছে জানতে চায় তুই দেশে যাবি? নারী জবাবে জানান আমি মিসকিন, দেশে যাবো না আমার টাকার দরকার। কথাটা মনে হয় ওই নারী বিশ্বাস করে ছিলো। যে কারণে ওই দিন সকল ঘরের সকল দরজা খোলা ছিল।

সে বাসা থেকে বেরিয়ে পরলে আমি ও বাসাথেকে মূল রাস্তায় বেরিয়ে আসি।এক ট্রাফিক পুলিশ আমাকে দেখে গাড়ি সিগন্যাল দিয়ে তার কাছে আসতে বলে এবং আমি কাছে গিয়ে তাকে সব ঘটনা খুলে বলি । সে আমাকে বাংলাদেশি এম্বাসিতে (দূতাবাস) যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। আমি তার কথা ভালো বুঝতে পারছিলাম না। পরে একটু সামনে হেটেই দেখি বড় একটি মার্কেট। আমি মার্কেটে ঢুকে পরি এবং দেখি বাঙালির অভাব নেই। কিন্তু কোন একটি লোক জানতে চাইলো না আমার কী হয়েছে। তখনো আমার শরীর, নাক থেকে রক্ত ও পানি ঝড়ছিলো। আমি শুধু কাঁদতে থাকি। হঠাৎ এক বয়স্ক লোক আমাকে মা সম্বোধন করে বলেন তোমার কি হয়েছে? বাড়ী কোথায়? আমি তাকে বিস্তারিত খুলে বললাম। সে আমাকে ট্রাফিক পুলিশের মতো বাংলাদেশি এম্বাসীতে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। আমি তার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে এম্বাসীতে ফোন করলে তারা আমাকে ট্যাক্সি যোগে অফিসে যেতে বলেন। ট্যাক্সিচালকের সাথে তারাই কথা বলছিলো । আমি ট্যাক্সিতে করে অফিসে পৌঁছে যাই।

এম্বাসীতে পৌঁছানোর পর সেখানে দেখি অনেক করুণ কাহিনী আমার মতো অসহায় কতো নারী পুরুষ। কারো হাত-পা কাটা, আগুনের ছ্যাকা দেওয়া সহ নানা রকম সমস্যায় কান্নাকাটি করছেন। ওখানের এক কর্মকর্তা আমার কাছে সবকিছু শুনে আমাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলো। আমার কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট বলতে ম্যান পাওয়ারের ফটোকপি ছাড়া কিছুই ছিলোনা। আমি ওই কাগজ তাদের কাছে দেই। পরে তারা আমাকে সিআইডি অফিসে পাঠান। সেখানে তারা আমার সব কথা শুনে আমাকে চিকিৎসা দেয় এবং আমার পাসপোর্ট উদ্ধার করে আনেন। ৪ দিন পরে আমি সুস্থ্য হলে বিমানের টিকেট কিনে দুই জন সিআইডি পুলিশ আমাকে বিমানে তুলে দিয়ে যান। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি বাড়ী পৌঁছে যাই।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা: বিদেশে আমার সমস্যার কথাশুনে আমার মা আগেই থানায় একটা জিডি করে রাখছিলেন। এরপর বাড়ি ফিরে আমি থানায় দেখা করতে গেলে সহকারি পুলিশ সুপার (মঠবাড়িয়া সার্কেল) মো. মোস্তফা কামাল আমার সব কথা শুনে মামলা নেন। পুলিশ এক জন আসামীকে গ্রেফতার করেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সহকারি পুলিশ সুপার স্যারের কথায় অনেক ভরসা পেয়েছিলাম কিন্তু এখন অজ্ঞাত কারনে আসামীদের গ্রেফতার করছেন না। মামলা তুলে নিতে কথিত রাজনৈতিক নেতারাসহ আসামিদের হুমকি অব্যাহত আছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। নারী পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

মঠবাড়িয়া থানার অফিসার ইনচার্জ খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘এক জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকী আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশি জোর তৎপরতা চলছে।