সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার ও হিন্দু নারীর প্রাপ্য

:: ডেস্ক::

পারিবারিক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর উত্তরাধিকার প্রসঙ্গ বারবার আলোচনায় এলেও হিন্দু নারীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার বিষয়ে আমাদের সমাজে তেমন আলোচনা হয় না।

বাংলাদেশে হিন্দু নারীর বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক শোচনীয় অবস্থার কারণ ও প্রেক্ষাপট খুঁজতে হলে দেশে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা জরুরী।

যেহেতু বাংলাদেশে দায়ভাগা আইন প্রচলিত, তাই উত্তরাধিকার অংশটি দায়ভাগা আইনের অধীনে আলোচনা করা হলো :

উত্তরাধিকারীদের শ্রেণীবিভাগ- দায়ভাগা মতে, উত্তরাধিকারীদের প্রধানত তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায় :
১. সপিণ্ড ২. সকুল্য ৩. সমানোদক।

  • সপিণ্ড তত্ত্ব : সপিণ্ড মতবাদ হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের মূল ভিত্তি। হিন্দু আইনের প্রধান উৎস স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ আছে, যারা মৃত ব্যক্তির সপিণ্ড, তারা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে। এই ‘সপিণ্ড’ শব্দটির অর্থ নিয়ে পরবর্তীকালে মিতা রক্ষা মতবাদের ভাষ্যকার বিজনেশ্বর ও দায়ভাগা মতবাদের ভাষ্যকার জীমূতবাহনের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। বিজনেশ্বরের মতে, ‘সপিণ্ড’ অর্থ যারা মৃত ব্যক্তির শরীর তথা রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত, তারাই মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ অথবা উত্তরাধিকারী হবেন। পক্ষান্তরে, জীমূতবাহনের মতে, সপিণ্ডের অর্থ মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধে যারা শাস্ত্রমতে পিণ্ডদানের অধিকারী, তারাই মৃত ব্যক্তির সপিণ্ড। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য।

হিন্দুদের কেউ মারা গেলে শ্রাদ্ধ করতে হয়। শ্রাদ্ধের সময় মৃত ব্যক্তিসহ পিতৃকূলের উর্ধতন তিন পুরুষ ও মাতৃকুলের ঊর্ধ্বতন তিন পুরুষের আত্মাদের উদ্দেশে আতপ চাল, দুধ, কলা, মিষ্টি ইত্যাদি এক সঙ্গে মণ্ডের মতো প্রস্তুত করে নিবেদন করা হয়। একেই পিণ্ডদান করা বলে। মৃতের পিণ্ডদানের অধিকারী ব্যক্তিগণই ‘সপিণ্ড’ নামে অভিহিত।

সপিণ্ড

১. জীবিত অবস্থায় কোন ব্যক্তি যাদের পিণ্ডদান করতে বাধ্য তারা জীবিত ব্যক্তির সপিণ্ড। এই দলে তার নিকটতম তিনজন পিতৃপূর্বপুরুষ- পিতা, পিতামহ এবং প্রপিতামহ এবং তার নিকটতম তিনজন মাতৃপূর্বপুরুষ- মাতামহ, প্রমাতামহ এবং প্রপ্রমাতামহ অন্তর্ভুক্ত।
২. কোন ব্যক্তি মারা গেলে তিনি যাদের কাছ থেকে পিণ্ড পাওয়ার অধিকারী তারা সবাই ঐ মৃত ব্যক্তির সপিণ্ড। এই দলে তার পুত্রের দিক থেকে নিম্নতম তিন পুরুষ- পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র এবং কন্যার দিক থেকে নিম্নতম তিন পুরুষ-কন্যার পুত্র, পুত্রের কন্যার পুত্র, প্রপৌত্র এবং কন্যার দিক থেকে নিম্নতম তিন পুরুষ- কন্যার পুত্র, পুত্রের কন্যার পুত্র, প্রপৌত্র এবং কন্যার দিক থেকে নিম্নতম তিন পুরুষ-কন্যার পুত্র, পুত্রের কন্যার পুত্র, পৌত্রের কন্যার পুত্র অন্তর্ভুক্ত।
৩. পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি মিলিয়ে উপরোক্ত মোট ১২ জন সপিণ্ড ব্যতীত তিন পুরুষের মণ্ডলী বা বৃত্তের মধ্যে যেসব পুরুষ পিণ্ডদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তারা সবাই একে অপরের সপিণ্ড। এ নিয়মে সপিণ্ডের সংখ্যা ৩৬ জন। এছাড়াও বিশেষ পাঁচজন মহিলা সপিণ্ড আছেন। যথাথ বিধবা, কন্যা, মাতা, পিতামহী ও প্রিপিতামহী। সুতরাং মোট সপিণ্ডের সংখ্যা : ১২+৩৬+৫=৫৩ জন।

  • ৫৩ জন সপিণ্ডের মধ্যে উত্তরাধিকারিত্ব নির্ণয়

উত্তরাধিকারিত্বে অগ্রাধিকার নির্ণয়ের জন্য এক্ষেত্রে চারটি সূত্র বা নিয়ম আছে। সে নিয়মানুযায়ী প্রাচীন পণ্ডিত ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারিত্বে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সপিণ্ডদের ক্রমিকানুসারে একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন:
১. পুত্র ২. পৌত্র ৩. প্রপৌত্র
উপরোক্ত তিনজন সর্বাগ্রে এবং একসাথে উত্তরাধিকারিত্বের দাবীদার।
৪. বিধবা।
৫. কন্যা : কন্যাদের মধ্যে অবিবাহিত কন্যার দাবী প্রথম। অতঃপর পুত্রবর্তী অর্থাৎ ছেলেসন্তান আছে এমন কন্যাদের দাবী। নিঃসন্তান কন্যা, পুত্র সন্তানহীনা বিধবা কন্যা এবং যেসব কন্যার শুধু কন্যাসন্তান আছে তারা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
৬. দৌহিত্র ৭. বাবা ৮. মা ৯. ভাই-
ক. প্রথমে পূর্ণ ভাই অর্থাৎ বাবা-মা দু’জনেই যেখানে এক।
খ. বৈমাত্রেয় ভাই।
১০. ভাইয়ের ছেলে-
ক. প্রথমে সহোদর বা পূর্ণ ভাইয়ের ছেলে।
খ. বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলে।
১১. ভাইয়ের ছেলের ছেলে :
ক. প্রথমে সহোদর বা পূর্ণ ভাইয়ের ছেলের ছেলে।
খ. বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলের ছেলে।
১২. ভাগ্নে বা বোনের ছেলে।
১৩. পিতামহ।
১৪. পিতামহী।
১৫. বাবার ছোট ভাই বেং বড় ভাই।
১৬. বাবার ভাইয়ের ছেলে।
১৭. বাবার ভাইদের ছেলেদের ছেলে।
১৮. পিসতুতো ভাই অর্থাৎ বাবার বোনের ছেলে।
১৯. প্রপিতামহ বা বাবার বাবার বাবা।
২০. প্রপিতামহী বা বাবার বাবার মা।

  • নারী উত্তরাধিকারী

এই তালিকায় আমরা দেখলাম যে, উত্তরাধিকারী হিসেবে কেবল পাঁচজন নারী সম্পত্তি পায়-
১. বিধবা ২. কন্যা ৩. মাতা ৪. পিতামহী ৫. প্রপিতামহী।
তবে ১৯২৯ সালের হিন্দু আইনের উত্তরাধিকার (সংশোধনী) আইন অনুসারে উপরোক্ত তালিকার সাথে আরও তিনজন নারীর নাম যুক্ত হবে-
১. পুত্রের কন্যা ২. কন্যার কন্যা এবং ৩ . বোন।

  • সকুল্য

প্রপিতামহের উর্ধতন তিন পুরুষ সকুল্য নামে অভিহিত। শ্রাদ্ধের সময় সপিণ্ডদের পিণ্ডদানের পর যা অবশিষ্ট থাকে সেই পিণ্ডলেপ সকুল্যদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়।
দায়ভাগা আইনে দুই শ্রেণীর উত্তরাধিকার সকুল্যের অন্তর্ভুক্ত। যথাথ
১. ঐ ব্যক্তির চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ পুরুষসারির অধস্তন পুরুষ হলো প্রথম দলের সকুল্য।
২. পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ এবং পুরুষসারির চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ পিতৃপূর্বপুরুষ এবং ঐ সব পূর্বপুরুষদের পুরুষসারির ছয়জন করে অধঃস্তন পুরুষ দ্বিতীয় দলের সকুল্য। উল্লেখ্য, সকুল্য শ্রেণীতে কোন নারী নেই, সকলেই পুরুষ।

  • সমানোদক

সকুল্যের উর্ধতন পুরুষ সমানোদক নামে অভিহিত। শ্রাদ্ধের সময় তাদের উদ্দেশ্যে শুধু জল নিবেদন করা হয়। সংস্কৃতে উদক শব্দের অর্থ জল।
সকুল্যদের মতো সমানোদকরাও সকলেই পুরুষ। সগোত্রীয় সম্পর্কের ৮ স্তর থেকে ১৪ স্তর পর্যন্ত সমানোদক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। সমানোদকদের সংখ্যা ১৪৭ জন।
সপিণ্ড, সকুল্য ও সমানোদকদের মধ্যে উত্তরাধিকারীক্রম

উত্তরাধিকারিত্বে সপিণ্ডদের দাবী অগ্রগণ্য অর্থাৎ তারা প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারী। সপিণ্ডদের পর সকুল্যদের দাবী এবং সবশেষে সমানোদকদের দাবী। আমরা দেখেছি, সপিণ্ডের সংখ্যা ৫৩ জন। এদের কেউ বেঁচে থাকলে কোন সকুল্য উত্তরাধিকারিত্ব দাবী করতে পারে না। সুতরাং সকুল্যরা অনেক দূরবর্তী উত্তরাধিকারী এবং সমানোদকদের স্থান আরও দূরে।

১৯৩৭ সালের হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইনে হিন্দু নারীর অধিকারের কথা তুলে ধরা হলো-

সনাতনী হিন্দু আইনে নারীদের সম্পত্তির অধিকারকে আরও সম্প্রসারিত করার জন্য এই আইনটি পাস হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সম্পত্তি বণ্টনের যেসব নিয়ম-কানুন এখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে তা এতই সীমাবদ্ধ যে তার ফলে আরও নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। যাই হোক, তারপরও নারীর উত্তরাধিকারিত্বের ক্ষেত্রে এই আইনটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে-
১. বিধবা এক পুত্রের সমান অংশ পাওয়ার অধিকারী। তবে বিধবা যদি একের অধিক হয় তাহলে সকলে একত্রে এক পুত্রের সমান অংশ জীবনস্বত্বে পাবেন।
২. একজন পূর্বমত পুত্রের বিধবা স্ত্রী, যদি এরূপ পূর্বমৃত পুত্রের কোনো জীবিতপুত্র না থাকে তাহলে পুত্রের মতো সম্পত্তি অর্জন করে এবং এরূপ পূর্বমৃত পুত্রের যদি কোন পুত্র অথবা পুত্রের পুত্র জীবিত থাকে তাহলে বিধবা পুত্রবধূ মতো সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারী।

অর্থাৎ এই আইন মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার বিধবা স্ত্রী, পূর্বে মৃত পুত্রের বিধবা স্ত্রী এবং পূর্বে মৃত নাতির বিধবা স্ত্রীকে অধিকার দিয়েছে।

হিন্দু রীতিনীতির সনাতনী চিন্তাধারার কারণে দিন দিন হিন্দু নারীদের দুর্দশার পরিমাণ বেড়েই চলেছে।

 

বাংলাদেশ স্থানীয় সময় : ১২২৫ ঘন্টা, জুন ১৪, ২০১৩

লেখা : ফারহানা জিয়াসমিন, বিভাগীয় সম্পাদক, নারী