পারিবারিক বাজেটে নারীর প্রাধান্য দরকার : মেলিন্ডা গেটস

::ডেস্ক ::

[মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস হলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী ব্যক্তি ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান  বিল গেটসের সহধর্মীনি। মেলিন্ডা ১৯৬৪ সালে টেক্সাসের ডালাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রেমন্ড জোসেফ ফ্রেঞ্চ, জুনিয়র পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী এবং মা এলেইন অ্যাগনেস অ্যামারল্যান্ড গৃহিণী ছিলেন।  ১৯৮২ সালে উরসুলিন অ্যাকাডেমি অব ডালাস থেকে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং অর্থনীতিতেও স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে এমবিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। মাইক্রোসফট বব, মাইক্রোসফট এনকার্টা এবং এক্সপিডিয়া প্রকল্পে কাজ করেছেন মেলিন্ডা।

১৯৯৪ সালে বিল গেটসকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে জেনিফার ক্যাথরিন গেটস, ররি জন গেটস এবং ফোবি অ্যাদেলে গেটস নামীয় তিন সন্তান রয়েছে। লেক ওয়াশিংটনে লার্জ ম্যানসনে তারা বসবাস করছেন। বর্তমানে মেলিন্ডা গেটস নারীর আর্থ সামাজিক উন্নয়নে  বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পক্ষ থেকে কাজ করছেন।

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে সম্প্রতি মেলিন্ডা গেটসের একটি লেখা সিএনএনে প্রকাশিত হয়। লেখাটির বাংলা ভাষান্তর নিচে দেওয়া হলো।]

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হলো ‘উইমেন ডেলিভার’ সম্মেলন। সেখানে প্রায় ৩ হাজার ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, যাদের প্রত্যেকে নিজ ক্যারিয়ারকে উত্সর্গ করেছেন নারী ক্ষমতায়নের জন্য।

নারীন ক্ষমতায়নের অনেক দিক ও শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তবে আমরা সেদিন একত্র হয়েছিলাম একটি একক ও শক্তিশালী আইডিয়া নিয়ে। আর তা হলো— ক্ষমতায়িত নারী জীবন বাঁচায়, পরিবারকে আরো সমৃদ্ধ করে এবং দরিদ্র দেশকে সহায়তা জোগায় তার অর্থনীতি মজবুতকরণে।

নারী ক্ষমতায়ন সংঘটনের নানা উপায়ের মধ্যে আমার বিশেষ পছন্দেরটি হলো— নারীকে বেছে নিতে দিন সন্তানধারণের উপযুক্ত সময়। এ মুহূর্তে বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি নারী রয়েছেন, যারা সন্তান নিতে চান না; আবার জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও ব্যবহার করতে পারেন না বিভিন্ন জটিলতায়। নিষ্ঠুর শোনালেও সত্য যে, এদের অনেকে মারা পড়বেন প্রসবজনিত জটিলতায়। কারো কারো সন্তান পৃথিবীর আলো-বাতাস উপভোগের আগেই মারা যাবে। কিছু শিশু বেঁচে থাকবে মৌলিক অধিকার অন্ন বা শিক্ষাবঞ্চিত হয়ে।

আফ্রিকার নাইজারের এমন এক নারীর কথা জানি আমি। দেশটিতে ৭৫ শতাংশ নারীর বিয়ে হয় ১৮তম জন্মদিনের আগেই। হয়তো বলবেন, নাইজারের উদাহরণ এখানে বেমানান। কেননা দেশটি ক্ষুদ্র এবং এর বাল্যবিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে নাইজার ছাড়াও বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, ভারত ও তাঞ্জানিয়ার মতো বড় দেশ রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা ১৫০ কোটির বেশি এবং গড়ে আনুমানিক ৪০ শতাংশ নারীর বিয়ে হয় কৈশোর উত্তীর্ণের আগে।

বাল্যবিয়ের পরিণতি মোটেই সুখকর নয়। ওসব দেশে অন্তঃসত্ত্বা অধিকাংশ কিশোরীকে ছেড়ে দিতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে অনেকেই সেখানে যেতে চান না। অনেকে যেতেও পারেন না। একের পর এক সন্তান নিতে থাকলে সেটি কঠিনই বৈকি।

এক নারী আমাকে বলেছিলেন, কোলে-পেটে নিয়ে সন্তান লালন-পালনই তার নিয়তি!

ভয়ঙ্কর কথা। তার মানে, জীবনের একটা দীর্ঘসময় এদের কেটে যায় সন্তানধারণের মধ্য দিয়ে। এতে তাদের স্বাস্থ্যের তো বারোটা বাজেই, যে সন্তানটি বেঁচে থাকে অমসৃণ হয় তার পথচলা। পরিবারের সব সদস্যের খাবারে ভাগ বসায় সে। এতে সে তো বটেই, অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় অন্যদেরও। একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করুন, যে শিশু সর্বদাই ক্ষুধার জ্বালায় ক্লান্ত, তার পক্ষে পাঠে মন দেয়া কি সম্ভব? তার ওপর এতে শিশুদের মনমানসিকতাও গড়ে ওঠে রুক্ষ হয়ে। এসব মিলে চালু হয়ে যাবে এক দুষ্টচক্র; যা থেকে পরিত্রাণ সহজ নয়।

ওই নারীই যদি অকাল গর্ভবতী না হতেন, স্কুলে যেতে পারতেন, তাহলে তার জীবন বদলে যেতে পারত চিরদিনের মতো। শিক্ষিত মায়েরা নিজ ও সন্তানের সুস্বাস্থ্যের প্রতি বেশি নজর দেন স্বভাবতই। এতে শিক্ষাগ্রহণ উপযোগী শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা-প্রেরণা তৈরি হয়। এসব শিশু বড় হয়ে উপার্জনও করে অন্যদের চেয়ে বেশি; যেটি পরোক্ষভাবে উন্নয়ন ঘটায় পরিবারের পুষ্টি পরিস্থিতির।

মা হিসেবে সর্বোতভাবে কামনা করি, আমার সন্তানরা আমার চেয়ে উন্নততর জীবনযাপন করুক। এ চাওয়া যেকোনো মায়ের বেলায়ই খাটবে। আর এটি অর্জনের পূর্বশর্ত হলো নারীর ক্ষমতায়ন; বিশেষত সন্তানধারণের সময় নির্ধারণে নারীর মতামতকে প্রাধান্য দেয়া।

আমি প্রায়ই বলি, নারী ক্ষমতায়নের সূচনা হলো যথাযথ পরিবার পরিকল্পনা। আর ক্ষমতায়িত নারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিন্তা করেন— সন্তানকে কী ও কতটুকু খাবার দেবেন, কখন টিকা নিতে হবে, কবে স্কুলে ভর্তি করতে হবে প্রভৃতি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এগুলো মানবজীবনকে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের দখলে রয়েছে নগণ্য পরিমাণ জমি। এ সামান্য অংশেই তাদের খাদ্যশস্য উত্পাদন করতে হয়— এক. নিজেদের আহার্য মেটাতে ও দুই. একাংশ বিক্রি করে অন্যান্য চাহিদা মেটাতে।

আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে যুক্ত এবং সময় হিসাবে সবচেয়ে বেশি শ্রম জোগান দেন তারাই। অথচ উত্পাদনে যুক্ত থেকেও এর সুফল তারা পান না সেভাবে। কারণ কৃষি-সংক্রান্ত তথ্যে পুরুষের মতো সমান প্রবেশাধিকার নেই তাদের। আবার কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও এদের সংযুক্তি শিথিল। তাই নারীরা যে জমিতে কাজ করেন, তার ফলন পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম। এ নারীরাই যদি বাল্যবিয়ের শিকার না হয়ে শিক্ষিত হতেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা যেমন বাড়ত, তেমনি পেতেন বর্ধিত আর্থিক সুবিধাদি।

এদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ, সেচ ও সার নিশ্চিত করা গেলে খাদ্যশস্য উত্পাদন হতো বেশি। এর উদ্বৃত্ত অংশ বিক্রি করে মুনাফাও অর্জন করতে পারতেন তারা। সম্পদের এ উত্সটিকে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারতেন নিজ ও পরিবারের কল্যাণে।

অনেক সময় কেবল একটি সংখ্যা অত্যন্ত সহজভাবে একটি জটিল সত্যকে প্রকাশ করে; যেমন— ২০ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, যে পরিবারের বাজেট মা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেখানে নবজাতকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ বেশি। কারণ মা জানেন, সন্তানের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক কোনটি।

সমস্যা হলো, উন্নয়নশীল দেশের সিংহভাগ নারীরই পারিবারিক বাজেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই। পরিহাসের বিষয়, যেটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, সেটি দ্বারাই তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

আমি বিশ্বাস করি, নারীর ক্ষমতায়ন ও এর মধ্য দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন বৃদ্ধির শুভ চক্রের সূচনা ঘটাতে বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। নারীকে গর্ভ ধারণ পরিকল্পনার স্বাধীনতা দিন; পেশায় তাকে বঞ্চনা করবেন না; বাকিটা তিনি নিজেই সামলে নিতে পারবেন। এ কয়েকটা মৌলিক বিষয় বদলানো গেলে নারী আপন ভবিষ্যত্ নির্মাণ করে নিতে পারবেন, একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন উপহার দিতে পারবেন মানবজাতিকে।
 

সূত্র : সিএনএন

বাংলাদেশ স্থানীয় সময় : ০২৫৫, জুলাই ১০, ২০১৩
আরএম